তখনও আমার বয়েস ছিল কম, জানতুম না, আমার কপালে ভাগ্যবিধাতা লিখে রেখেছেন এমনই দুর্দৈব যে তখন আমার অন্ধ কারাগারে না বইবে চেনা দিনের ভোলা দিনের বাতাস, না বইবে সুসানের গ্রামের নদী– স্মৃতির আবর্জনা উড়িয়ে নিতে ভাসিয়ে দিতে।
গাড়ি-ভাড়াটা দেবার পর্যন্ত মোকা পেলুম না।
গেট খুলে বাড়িতে ঢোকার সময় শুনি, কোচম্যান বলছে, চ বারুবা রসূসা, দেখলি তো, তখনি তো তোকে বলিনি অন্য সোয়ারি নিনি। আজ আর না। চ, বাড়ি যাই। আমার দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, রেতে-বেরাতে যখন খুশি ওই সামনের গলিতে ঢুকে পয়লা বাড়ির সামনে বলবেন, ডার্লিং বাবা রসা! সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি পাবেন তৈরি। সম্রাট বারবা রসার মতো আপনার বাবা রসাও দেখবেন ক্রুসেড লড়তে হোলি ল্যান্ডে যেতে তৈরি।
জর্মন কেন, প্রায় সব জাতের লোকই কোনও বিশেষ দেশ ভ্রমণ করে এলে বা সে দেশ নিয়ে চর্চা করলে আপন বাড়ি ভর্তি করে ফেলে সে দেশের ভালোমন্দ মাঝারি রাবিশ-জাঙ্ক-বিলজ কিচ দিয়ে। এর বাড়িতে পরিপূর্ণ ব্যত্যয় না হলেও একথা কেউ বলতে পারবে না যে ইনি সারাজীবন শুধু ইন্ডিয়া ইন্ডিয়াই করেছেন। মাত্র একখানি ছবি– অজন্তার। রাহুল-জননী পুত্রকে তথাগতের (তিনি ছবিতে নেই) সামনে। আর লেখা-পড়ার টেবিলের উপর সাংখ্যকার মহর্ষি কপিলের একটি মূর্তি। ইনি এটি জোগাড় করলেন কোথা থেকে? ওটা মূলে মূর্তি কি না জানি নে হয়তো-বা রিলিফ। আমি দেখেছি ছবিতে– বহু বৎসর হল।
কিন্তু অত বড় বড় ঘরওলা ফ্ল্যাট তিনি পোষেন কী করে?
আমার অনুমান ভুল নয়। ফ্ল্যাটে ঢুকে আমাকে আসন নিতে অনুরোধ করে তিনি সোফায় শুয়ে পড়লেন। একটু মাফ-চাওয়ার সুরে বললেন, আপনাদের দার্শনিক সর্বপল্লী মহাশয় নাকি লেখাপড়া পর্যন্ত খাটে শুয়ে শুয়ে করেন।
ফটোগ্রাফে মহারানি ভিক্টোরিয়ার বৃদ্ধ বয়সের যে ছবি দেখি হুবহু ঠিক সেই পোশাক পরে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যখণ্ড যেন ঘরে এসে ঢুকলেন। মহিলা আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, আমার আইমা। ঠাকুরমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বাড়িতে আসেন। তার ছেলে-নাতিরা ভালো ভালো ব্যবসা করেন। আইমা কিন্তু আমার সঙ্গেই থাকতে ভালোবাসেন।
আমি বার বার বললুম, আমি নিরামিষাশী নই, আমার আহারাদির জন্য তুলকালাম করে রাইনের জলে আগুন লাগাতে হবে না, আমি সব খাই, টিনের খাদ্যেও অরুচি নেই।
মহিলা বললেন, জানেন কি, হিটলার কড়া নিরামিষাশী?
আমি বললুম, তা হলে নিরামিষ ভোজনের বিপক্ষে আরেকটা কড়া যুক্তি পেলুম। আর আপনি?
ক্লান্তির সুরে বলল, আইমা যা দেয়, তাই খাই।
আমি বললুম, আপনি তা হলে বৌদ্ধ ভিক্ষুণী!
অন্তত হিটলারের মতো জৈন গৃহীও নই।
ইনি সব জানেন।
আমাকে চেয়ারটা কাছে টেনে আনবার অনুরোধ করে বললেন, আচ্ছা, আপনি নিওরসিস, সাইকসিস, মনমেনিয়া ইদে ফিস– এসব কথাগুলোর অর্থ জানেন?
আমি বললুম, যারা এসব নিয়ে কারবার করেন, তাঁরাই কি জানেন? এই যে আমরা নিত্য নিত্য ধর্ম, নীতি, মর্যালটি, রিয়ালিজম, আইডিয়ালিজম শব্দ ব্যবহার করি, এগুলোর ঠিক ঠিক অর্থ জানি? তবে আপনি যেগুলো বললেন, তার ভিতর একটা জিনিস সব কটারই আছে : কোনও একটা চিন্তা সর্বচৈতন্যকে এমনই গ্রাস করে ফেলে যে মানুষ তার থেকে অহোরাত্র চেষ্টা করেও নিষ্কৃতি পায় না।
দুষ্মন্ত যেরকম বলেছিলেন, তিনি শকুন্তলার চিন্তা মন থেকে কিছুতেই সরাতে পারছেন না, অপমানিত জন যেরকম আপ্রাণ চেষ্টা করেও অপমানের স্মৃতি মন থেকে তাড়াতে পারে না– বার বার সেটা ফিরে আসে। তার পর বললেন, কিন্তু আশ্চর্য, কালিদাস অপমানের সঙ্গে বিরহবেদনার তুলনা দিলেন কেন? শকুন্তলা তো দুষ্মন্তকে কোনও পীড়া দেননি– অপমান দূরে থাক!
আমি বললুম শত্রু কাছে এসে দহন করে; মিত্র দূরে গিয়ে দহন করে। দুজনেই দুঃখ দেয় শত্রু-মিত্রে কী প্রভেদঃ
শহতি সংযোগে বিয়োগে মিত্রমপ্যহো।
উভয়য়োর্দুঃখ দায়িত্ব কো ভেদঃ শত্ৰুমিত্রয়োঃ?
দুশমন দুষ্মন্তকে অপমানিত করলে তার যে বেদনা-বোধ হত, শকুন্তলার বিরহও তাকে সেই পীড়াই দিচ্ছিল। তাই বোধহয় কালিদাস উভয়কে পাশাপাশি বসিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথও কিছুদিন পূর্বে বলেছেন, তার জন্মদিন ও মৃত্যুদিন কাছাকাছি এসে গেছে। একই মন্ত্রে দুজনকে আহ্বান জানাবেন।
ঘরের আলো যদিও সূক্ষ্ম মলমলের ভিতর দিয়ে রক্তাঙ্গীণ গোলাপি আভার মতো মোলায়েম, তবু শ্ৰীমতী দু হাত দিয়ে চোখ ঢেকে রেখেছিলেন।
এবারে উঠে বসে আমাকে বললেন, আপনাকে সর্বক্ষণ আমার আপন কথা বলে উৎপীড়িত করার ইচ্ছা আমার নেই– বিশেষ করে বাড়িতে টেনে এনে।
আর এখন বার বার মনে হচ্ছে কী লাভ? নিউরটিক ইত্যাদি যে শব্দগুলো বললুম, তার ক-টা আমার বেলা প্রযোজ্য আমি জানিনে। কিন্তু এ-কথা দৃঢ়নিশ্চয় জানি, আমি নর্মাল নই। কখনও মনে হয়, আমার এই অনুভূতিটা সত্যের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত, আবার হঠাৎ মাঝরাতে জেগে উঠে দেখি, সেটা সম্পূর্ণ মতিভ্রম। একটা ইদে ফি– ফিট আইডিয়া থেকে কিছুতেই নিষ্কৃতি পাইনে, এবং নিজের কোনও সিদ্ধান্তকে আর অবিচল চিত্তে গ্রহণ করতে পারিনে। তাই দয়া করে আপনি এই নিউটিক, মনমেনিয়াকের কোনও কথা গায়ে মাখবেন না।
আমি বললুম, তথাস্তু (এবং সংস্কৃতেই বলেছিলুম)। কিন্তু আপনি কী যেন জানবার জন্য আমাকে ফোন করেছিলেন?
