ওঁর ইংরেজিটা যে আমি জৰ্মনে অনুবাদ করব সেটা তো ধরেই নেওয়া হয়েছিল। তারই অছিলা নিয়ে আমি সমস্তটা ঢেলে সেজে লিখলুম। পাছে তাঁর আত্মসম্মানে লাগে তাই বললুম, তুমি এ-কাঠামোর উপর আরও ফ্যাটের কাদামাটি চাপাও, রঙ বোলাও।
ইতোমধ্যে আমার বইয়ের দোকান আমাকে পাঠাল লন্ডন, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজে আমাদের বইয়ের বাজার প্রসার করতে। তিনিও তার প্রফেসরের কাছ থেকে ছুটি নিলেন ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ও ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে মাল-মশলার সন্ধানে যাবার জন্য।
সে সুযোগের অবহেলা আমি না করে আমাদের প্রকাশিত আর বিরল আউট অব প্রিন্ট কিছু কিছু বই নিয়ে দেখা করতে গেলুম লন্ডন স্কুল অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের ইন্ডলজি-অধ্যাপকদের সঙ্গে। তাঁরা আমায় ভারি খাতির করলেন, কেউ কেউ চা-য় ডিনারে নিমন্ত্রণও করলেন। আমি ঘুরেফিরে শুধু গুপ্ত যুগের কালচারাল লাইফের দিকে কথার মোড় ফেরাই। ওঁরা অকৃপণ হৃদয়ে আপন আপন গবেষণার ফল বলে যেতে লাগলেন। একদিন এক অধ্যাপকের বাড়িতে নিমন্ত্রণে ছিলেন আরও দুজন ইন্ডলজির অধ্যাপক। আমি গুপ্ত যুগ টুইয়ে দিতেই লেগে গেল তিন পণ্ডিতে লড়াই। ঘণ্টাখানেকের ভিতরই পরিষ্কার হয়ে গেল তিনজনার তিন থিসিস। একজন বললেন : গুপ্ত কেন, তার পরবর্তী যুগেরও সব নাট্যের কাঠামো গ্রিক নাট্য থেকে নেওয়া। দ্বিতীয়জনের বক্তব্য : গুপ্ত যুগের চোদ্দ আনা কৃষ্টির মূলে দ্রাবিড়। বেদ উপনিষদ রামায়ণ মহাভারতের চোরাবালির ভিতর দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে গুপ্ত যুগে এসে নির্মল তৃষাহরা হ্রদে পরিণত হয়েছে। আর তৃতীয়জনের মতে গুপ্ত যুগের বেশিরভাগ পরবর্তী যুগের– গুপ্ত যুগের নামে পাচার হচ্ছে। যেরকম ওমর খৈয়ামের দু-শ বছর পরের রচনা বিস্তর চতুষ্পদী তাঁর সঙ্কলনে ঢুকে গেছে।
ভোরের প্রথম বাস্ ধরে আমরা যে-যার বাসায় ফিরেছিলুম।
তার পূর্বে আমি সবিনয়ে শুধিয়েছিলুম, আমি তাঁদের বক্তব্যের কিছু কিছু ব্যবহার করতে পারি কি না। তিনজন একবাক্যে বলেছিলেন, আলবত, নিশ্চয়, অতি অবশ্যই। এসব তো কমন নলেজ। তাই দয়া করে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো না। আমাদের বদনাম হবে যে আমরা কমন নলেজ গবেষণা বলে পাচার করি। একেই বলে প্রকৃত বিনয়!
বাসে বাসেই আমি যতখানি স্মরণে আনতে পারি শর্টহ্যান্ড টুকতে আরম্ভ করি। বাড়ি ফিরে বিছানা না নিয়ে যখন কাজ প্রায় শেষ করে এনেছি তখন বন্ধু বিছানায় বসে চোখ কচলাতে কচলাতে বেড়-টির জন্য ঘণ্টা বাজালেন।
অক্সফোর্ড-কেমব্রিজেও অধ্যাপকদের সাহায্য পেলুম।
তার পর বনে ফিরে এসে সেইসব বস্তু গুছিয়ে, খসড়া বানিয়ে ফেয়ার কপি টাইপ করে, তাঁর প্রোফেসরের মেরামতির পর সে অনুযায়ী আবার টাইপ করে পরিপূর্ণ থিসিস তৈরি হল।
আমি বললুম, অর্থাৎ–
তিনি ব্যাকুল হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, না, না, না। আপনি ভুল ইনফারেন্স্ করছেন। সংস্কৃত ভাষাটি ছিল তার সম্পূর্ণ করায়ত্ত। হেন ব্যাকরণ নেই যার প্রত্যেকটি সূত্র, নিপাতন, আর্যপ্রয়োগ তার কণ্ঠস্থ ছিল না। কঠিন কঠিন টেস্ট দু-বার না পড়েই তিনি অর্থ বের করে দিতে পারতেন। বললে বিশ্বাস করবেন না, তিনি তাঁর অধ্যাপককে এই দুরূহ ব্যাপারে সাহায্য করতেন। তাঁর থিসিসে যে অসংখ্য বস্তু মূল সংস্কৃত থেকে নেওয়া হয়েছে তার অনুবাদে তো কোনও ভুল পাবেনই না, আর সেগুলোই করেছে তার বইখানাকে রিচ ইন টেকচারসমৃদ্ধশালী। তাঁর কৃতিত্ব অনন্যসাধারণ–
আমি বাধা দিয়ে বললুম, আমি আপনার প্রত্যেকটি কথা মেনে নিচ্ছি।
রমণীটি বড়ই সরলা। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, বাঁচালেন। এসব কথা আমি এ জীবনে কাউকে বলিনি। এবং আরেকটা কথা, ওঁকে তো ভাইভাও দিতে হয়েছিল।
আমি বললুম, নিশ্চয়ই। ভাইভাতে কোন ক্লাস, আর রিটনে (অর্থাৎ) থিসিসে কোন ক্লাস পেয়েছিলেন সেটা আর শুধালুম না। তা হলে সর্বনাশ হয়ে যেত।
হঠাৎ মহিলাটি চমকে উঠে বললেন, ছি ছি! অনেক রাত হয়ে গিয়েছে; ওদিকে আপনার ডিনারের কথা আমি একবারও তুলিনি। কোথায় খাবেন বলুন?
আমি কিন্তু কিন্তু করছি দেখে বললেন, আমার ফ্ল্যাটে যাবেন? এখানেই, বেশি দূরে না। গোডেসবের্গের সে বাড়িতে আমি আর যাই না।
আমি ইতোমধ্যে একাধিকবার লক্ষ করেছি যে, মহিলাটি এখনও তার ক্লান্তি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাঁকে বাড়িতে শুইয়ে দেওয়াই ভালো।
মোড় নিতেই দেখি সেই প্রাচীন দিনের শেষ ঘোড়ার গাড়িখানা যেন আমাদের জন্যই দাঁড়িয়ে। মহিলাটি যে আমলের কথা বলছিলেন তখন এরও ছিল ভরা যৌবন। আমি বললুম, কি হে যাবে নাকি?
টপ্ হ্যাট তুলে বাও করে বলল, নিশ্চয়ই, স্যার। ঘোড়াকে বলল, চল্ বারবা রসসা গোডেসবের্গ।
আমি চেঁচিয়ে বললুম, না হে না–
বলল, সরি, স্যর! এই বছর পাঁচেক পূর্বেও তো আপনাকে ফ্যান্সি ডান্স থেকে ভোরবেলা হোথায় নিয়ে গিয়েছিলুম! হা হহা, হা হহা, আপনি তখন ভারি জলি ছিলেন, স্যর, নামবার সময় ঝপ করে আমার হ্যাঁটটি কেড়ে নিয়ে হাওয়া। হাহহা– পরে আমার ওল্ড উম্যান বলে কি না আমি হ্যাঁট বন্ধক দিয়ে বিয়ার খেয়েছি। হাহা হাহা! চল, বারবা রসা।
মহিলাটি হেসে উঠলেন। তাঁর চেনা দিনের ভোলা দিনের দমকা বাতাস যেন হঠাৎ গলিটাকে ভরে দিয়ে সব শুকনো পাতা উড়িয়ে নিয়ে চলে গেল রাইন বাগে। শহরের গলির ভিতর নির্বাসিত সুসান্ দিবাস্বপ্নে যেরকম তার গাঁয়ের নদীটিকে শহরের গলি দিয়ে বয়ে যেতে দেখেছিল।*[* সরু গলির মোড়ে যখন দিনের আলো ঝরে
ময়না দাড়ে গাহে এমন গাইছে বছর ধরে।–ওয়ার্ডসওয়ার্থ, অনুবাদক সত্যেন দত্ত।]
