আমার মনে সর্বক্ষণ নানা প্রশ্নের উদয় হচ্ছিল, কিন্তু মহিলাকে বাধা দিলুম না।
ততক্ষণে কাফেতে উল্লাস, হৈ চৈ পড়ে গিয়েছে। জর্মন জনগণের বহুদিনের মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে। ঘড়ি ঘড়ি খবর আসছে, নাৎসি বিজয়-সেনানী কীভাবে অস্ট্রিয়ার শহরের পর শহর দখল করে যাচ্ছে, তারা কীভাবে সর্বত্র উদ্বাহু অভিনন্দিত হচ্ছে।
আমি একটু মুচকি হেসে বললুম, ভালুকও মানুষকে আলিঙ্গন করে শুনেছি, কিন্তু সে আলিঙ্গন– যা গে।
মহিলাটি একটু চমকে উঠলেন। বললেন, এসব মন্তব্য আপনি সাবধানে করবেন। কী করে জানলেন, আমি নাৎসি নই?
আমি হেসে বললুম, জলবত্তরল– আপনি তো সংস্কৃত জানেন। তার মানে যে-জন বেদ পড়েছে, সে-ই জানে বেদের আর্যধর্মের সঙ্গে নাৎসিদের এই আর্যামির বড়ফাটাইয়ের সূচ্যগ্র পরিমাণ সম্বন্ধ নেই। কিন্তু আপনি চিত্তবিক্ষেপ হতে দেবেন না। তার পরের কথা বলুন।
একটু চিন্তা করে বললেন, প্রথমে সাহচর্য, তার পর বন্ধুত্ব, সর্বশেষে প্রণয় হল আমাদের দুজনাতে।
এবারে অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, তিন বছরের প্রণয়– তার পর দশ বছর ধরে আমি তার কোনও খবর পাইনি। এই দশ বছর আমার একা একা কেটেছে। এই দীর্ঘ তেরো বছরের কথা আপনাকে বলতে গেলে ক মাস ক বছর লাগবার কথা তার সামান্যতম অনুমান আমার নেই।
এই শেষের দশ বৎসর কী করে কেটেছে, এখন কী করে কাটছে সেটা বোঝাবার চেষ্টাও আমি করব না। আর সেটা শোনাবার জন্যও আমি আপনার দর্শন কামনা করিনি। এই যে বন্ বিশ্ববিদ্যালয় আমরা পেরিয়ে এলুম, এখানে পড়বার সময় ঠিক একশো বছর আগে, আমাদের সবচেয়ে সেরা লিরিক কবি হাইনে একটি চার লাইনের কবিতা লেখেন :
প্রথমে আশাহত হয়েছিনু
ভেবেছিনু সবে না বেদনা;
তবু তো কোনো মতে সয়েছি।
কী করে যে সে কথা শুধিয়ো না।
তীব্র বেদনার তীক্ষ্ণ প্রকাশ দেবার চেষ্টা করেছেন হাইনে বার বার, কিন্তু হার মেনে উপরের চতুষ্পদীটি রচেন। একশো বছর ধরে দেশ-বিদেশে লক্ষ লক্ষ নরনারী সেগুলো পড়ছে
এবারে আমি বাধা দিয়ে বললুম, আমাদের পোয়েট টেগোর তার প্রথম যৌবনে এক জর্মন মহিলার কাছ থেকে অল্প জর্মন শেখার পরেই তাঁর শুটিদশেক কবিতা বাঙলায় অনুবাদ করেন। আপনি যেটি বললেন সেই চতুষ্পদীটিও তাতে আছে।
প্রথম যৌবনে তিনি কি শোক পেয়েছিলেন?
তাঁর প্রাণাধিকা ভ্রাতৃবধূ আত্মহত্যা করেন। কিন্তু সে কথা আরেকদিন হবে। আমি নিজে কাপুরুষতম এসকেপিস্ট; তাই দুঃখের কথা এড়িয়ে চলি। তার চেয়ে আপনাদের সেই তিন বছরের আনন্দের কথা বলুন।
প্রথম বছর কেটেছে স্বপ্নের মতো। স্বপ্ন যেমন চেনা-অচেনায় মিশে যায়, হঠাৎ চেনা জিনিস, চেনা মানুষ মনে হয় অচেনা, আবার অচেনা জন চেনা, এ যেন তাই। তাঁকে যখন মনে হয়েছে এর সবকিছু আমার চেনা হয়ে গিয়েছে তখন হঠাৎ মনে হয়েছে যেন ইনি আমার সম্পূর্ণ অজানা জন। আবার কেমন যেন এক প্রহেলিকার সামনে অন্ধকারে ব্যাকুল হয়ে হাতড়াচ্ছি– মধ্যরাত্রে হঠাৎ তার ঘুমন্ত হাত পড়ল আমার গাঁয়ের উপর আর সঙ্গে সঙ্গে আমার সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে গেল। আমার চৈতন্যে তখন বিশ্বব্যাপী মাত্র একটি অনুভূতি– এই লোকটির মাঝেই আমার অস্তিত্ব, আমার অন্য কোনও সত্তা নেই। গোডেসবের্গের পিছনে নির্জনে গভীর পাইন বনে সকাল থেকে পরের দিন ভোর অবধি কাটিয়েছি একটানা, রাইনের ওপারে বরফ ভেঙে ভেঙে উঠেছি মারগারেটেন হ্যোহ অবধি, ফ্যান্সি বলে শ্যাম্পেনের পর শ্যাম্পেন খেয়ে আমি অবশ হয়ে শুয়ে পড়েছি ডান্স-হলের সামনের ঘাসের উপর তিনি পৌঁছে দিয়েছেন বাড়িতে।
কেন জানিনে, হঠাৎ জিগ্যেস করে বসলুম, উনি কখনও বে-এতেয়ার হতেন না?
বললেন, আশ্চর্য, আপনি যে এ-প্রশ্ন জিগ্যেস করলেন! না, কখনো না। এখানকার পড়দের সঙ্গে সমানে পাল্লা দিয়ে তাকে খেতে দেখেছি বহুবার, চোখের পাতাটি পর্যন্ত নড়ত না। অথচ তিনি একাধিকবার আমাকে বলেছেন, তার জানামতে তার সাত পুরুষের কেউ কখনও মদ খায়নি।
কিন্তু প্রথম বছরের চেয়েও অন্তত আমার পক্ষে মধুরতর আর গৌরবময় শেষের দুই বছর।
এক বৎসর ক্লাস আর সেমিনার করার পর অধ্যাপকের আদেশে তিনি আরম্ভ করলেন তাঁর ডক্টরেট থিসিসের প্রথম খসড়া–অবশ্য ইংরেজিতে। মোটামুটি তিনি কী লিখলেন সে সম্বন্ধে তিনি আমার সঙ্গে আলোচনাও করেছিলেন।
থেমে গিয়ে তিনি অত্যন্ত করুণ নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার কাছে আমার একটা ভিক্ষা আছে–
আমি বাধা দিয়ে বললুম, ছি ছি। আপনি আমাকে এখনও চিনলেন না!
চিনেছি বলেই চাইছি। এখন যা বলব, আপনি প্রতিজ্ঞা করুন, কাউকে বলবেন না।
আমি তাঁর হাতে সেই শুষ্ক, জরাজীর্ণ হাতে চাপ দিলুম।
প্রথম পরিচ্ছেদের কাঁচা খসড়া পড়ে আমি অবাক। একেবারে কিছুই হয়নি বললে অত্যুক্তি হয়, কিন্তু এতে যে কোনও বাধই নেই, বক্তব্য কোন্ দিকে যাচ্ছে তার কোনও নির্দেশ নেই আছে গাদা গাদা ফ্যাক্টস, এবং তার মধ্যেও কোনও সিসটেম্ নেই।
কারণ ইতোমধ্যে আমি যে খুব বেশি সংস্কৃত শিখেছি তা নয়, তবে আপনি তো জানেন, জর্মন, ফরাসি এবং ইংরেজি, মাত্র এই তিনটি ভাষাতেই ইন্ডিয়া সম্বন্ধে এত বই লেখা হয়ে গিয়েছে যে সেগুলো মন দিয়ে বার বার পড়লে, নোট টুকে মুখস্থ করলে কার সাধ্য বলে আপনি সংস্কৃত জানেন না! যেদিন তিনি আমায় প্রথম তার থিসিসের সাবজেক্ট গুপ্তযুগের কালচারাল লাইফ- বলেন সেদিন থেকেই আমি ওই বিষয়ের ওপর যা পাওয়া যায় তাই পড়তে আরম্ভ করেছি, নোট টুকেছি, মুখস্থ না করেও যতখানি সম্ভব মনে রাখবার চেষ্টা করেছি। আর সংস্কৃত তো সঙ্গে সঙ্গে চলছেই। আপনি তো আমাদের সিস্টেম জানেন। তাই তিন মাস যেতে না যেতেই আমি র্যাপিড় রিডিং সিসটেমে খানিকটা বুঝে কিছুটা না বুঝে কালিদাসের সব লেখা এমনকি কালিদাসের নামে প্রচলিত অন্য জিনিসও পড়ে ফেলেছি। তবে আমার ব্যাকরণজ্ঞান এখনও কাঁচা, যদিও গ্রিকের সাহায্যে শব্দতত্ত্বে আমার কিছুটা দখল আছে।
