মহিলা জিগ্যেস করলেন, আচ্ছা বলুন তো, দময়ন্তী নিদ্রাভঙ্গের পর দেখলেন নলরাজ নেই; তার পর তাঁর ইহজীবনে যদি নলের সঙ্গে আদৌ সাক্ষাৎ না হত তবে তিনি নল সম্বন্ধে বা আপন অদৃষ্ট সম্বন্ধে কী ভাবতেন?
নলোপাখ্যানের উল্লেখে আমি আশ্চর্য হলুম না। যে রমণী গেলটুনারের বেদানুবাদের সঙ্গে সুপরিচিতা, নলরাজ তো তাঁর নিত্যালাপী আত্মীয়!
আমি একটু ভেবে বললুম, রসরাজও তো বৃন্দাবনে শ্ৰীমতীর কাছে ফিরে যাননি। তবু তো তিনি তাঁর প্রতি প্রত্যয় ত্যাগ করেননি। মহাত্মা উদ্ধব যখন বৃন্দাবন দর্শন করে মথুরা ফিরে এলেন তখন রসরাজ সব শুনে বলেছিলেন, বিরহাগ্নি যদি তার এতই প্রবল হয় তবে তিনি জ্বলেপুড়ে ভস্ম হয়ে যাননি কেন? কী বেদরদী প্রশ্ন! কিন্তু শ্রীরাধা সেটা জানতেন বলে উদ্ধবকে বলতে বলে দিয়েছিলেন, তার অবিরাম অশ্রুধারা সেই অগ্নি বার বার নির্বাপিত করছে– তনু জরি জাত জো ন অপুঁয়া ঢর উপো –যুদুপতি শেষ প্রশ্ন শুধান, আমার বিরহে তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়নি কেন? এর উত্তরও উদ্ধব শিখে নিয়েছিলেন, আপনি একদিন না একদিন বৃন্দাবনে ফিরবেন এই প্রত্যয়ই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
দময়ন্তী নিশ্চয়ই প্রত্যয় ছাড়েননি।
মহিলা বললেন, তুলনাটা কি ঠিক হল? শ্রীরাধা তো মাঝে মাঝে শ্রীকৃষ্ণের সংবাদ পেতেন, তিনি কংস বধ করেছেন, তিনি কুরু-পাণ্ডবের মধ্যে শান্তি স্থাপনার্থ দৌত্য করেছেন, জনসমাজের বৃহত্তর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন এই ভেবে মনে সান্ত্বনা পেতেন–
আমি বাধা দিয়ে বললুম, এবং রুক্মিণীকে– সে কুমারী আবার শিশুপালের বাগদত্তা বধূ– বিয়ে করেছেন, তার পর সত্যভামাকে, সর্বশেষ ভালুকী–
আমি নিজের থেকে থেমে গেলে পর মহিলাটি বললেন, শ্রীকৃষ্ণের উদাহরণ আপনিই তুলেছিলেন; আমি তুলিনি।
আমি বললুম, আপনি দময়ন্তীর কথা তুলেছিলেন- ভগবান করুন, আপনার নল যেন
তিনি মাথা নাড়তে আমি চুপ করে গেলুম।
বললেন, আপনি গোডেসবের্গ চেনেন?
আমি বললুম, বা রে, সেখানে তো আমি এক বছর বাস করেছি।
প্রফেসর কিফেল সেখানে বাস করতেন। আমরা ছিলাম তার প্রতিবেশী। আমি প্রতিদিন বন শহরে আসতুম চাকরি করতে। হঠাৎ একদিন দেখি তার পরের স্টপেজ হোঋ-ক্রয়েৎসে একজন বিদেশি উঠলেন। মুখোনা বিষণ্ণ। সেদিন আর কিছু লক্ষ করিনি। কাইজার প্লাসের স্টপেজে উনিও নামলেন। আমি বইয়ের দোকান র্যোরশাইটে কাজ করতুম। আপন অজান্তেই লক্ষ করলুম বিদেশি ইউনিভার্সিতে ঢুকলেন।
তিন-চার মাস প্রায় রোজই একই ট্রামে যেতুম, ভদ্রলোকের প্রতি আমার কোনও কৌতূহল ছিল না কিন্তু লক্ষ করলুম, বিদেশির বিষণ্ণ ভাব আর কাটল না।
তার পর একদিন তিনি আমাদের দোকানে এসে ঢুকলেন। আমি এগিয়ে গিয়ে অভ্যর্থনা জানাতে তিনি একেবারে থতমত খেয়ে গেলেন। ভাবলুম এ আবার কোন দেশের লোক? এত লাজুক কেন?
ভাঙা ভাঙা জর্মন ভাষায় এক জর্মন ইলজিস্টের বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ চাইলেন। আমি একটু আশ্চর্য হলুম : জর্মনিতে বসে জর্মনের লেখা বই পড়লেই হয়। বললুম, এটা লন্ডন থেকে আনাতে হবে। তার পর কিন্তু কিন্তু করে বললুম, মূল জর্মনটা পড়লেই তো ভালো হয়।
তিনি বললেন, আমার আছে, কিন্তু বুঝতে বড় অসুবিধা হয়। সঙ্গে সঙ্গে বইখানা পোর্টফোলিও থেকে বের করে কাউন্টারের উপর রাখলেন।
আমি তখনও ইন্ডলজির কিছুই জানতুম না– নামটাম টুকে নিয়ে তাঁকে দু-চারখানা ভালো অভিধান, সরল জর্মন বই, ব্যাকরণ দেখালুম। আমি ইংরেজি জানতুম বলে তার ঠিক কোন কোনটা কাজে লাগবে সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞের মতো সৎপরামর্শ দিলুম। আমি যেটা দেখাই সেটাই তিনি কিনে ফেলেন। শেষটায় আমিই হেসে বললুম, এগুলো শেষ করুন। এর পরের ধাপের বই আমি বেছে রাখব। টাকা দিয়ে বইগুলো নিয়ে যখন চলে গেলেন তখন দেখি তার ইভলজির বইখানা কাউন্টারে ফেলে গেছেন। তা যান, কাল ট্রামে দিয়ে দিলেই হবে।
ইন্ডিয়া সম্বন্ধে এই আমার প্রথম পাঠ। এবং এখনও সে বইখানা মাঝে মাঝে পড়ি। ভিন্টারনিৎসের ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাস। এ বই দিয়ে আরম্ভ না করলে হয়তো ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি আমার কৌতূহল অঙ্কুরেই মারা যেত।
ভিন্টারনিৎস লেখেন অতি সরল জর্মন; তাই আশ্চর্য হলুম যে বইয়ের মালিক এতদিনেও এতখানি জর্মন শিখে উঠতে পারেননি কেন?
আমি চেপে গেলুম যে, ঠিক এই বইখানাই ভিন্টারনিৎস শান্তিনিকেতনে আমাদের পাঠিয়েছিলেন।
আর পাঁচজন জর্মনের তুলনায় বিদেশিদের সম্বন্ধে আমার কৌতূহল কম। বইয়ের দোকানে কাজ করলে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় জাত-বেজাতের বই পড়া হয়ে যায়। আমার কৌতূহল নিবৃত্তি হয়ে গিয়েছিল অনেকখানি– ওই করে।
কিন্তু এই লোকটির প্রতি কেমন যেন আমার একটু দয়া হল। তবু এটা ঠিক, আমি নিশ্চয়ই গায়ে-পড়ে তাকে সাহায্য করতে যেতুম না। তবে একথাও ঠিক, ভিন্টারনিৎসের বেদ অনুচ্ছেদে উষস্ আবাহন এবং জুয়াড়ির মনস্তাপ দুটোই আমার কল্পনাকে এক অপূর্ব উত্তেজনায় আলোড়িত করেছিল। ঊষামন্ত্র লিরিক, রহস্যময়, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, আর অবিশ্বাস্য বলে মনে হল যে, ওই একই সময়ে অতিশয় নিদারুণ বাস্তব জুয়াখেলা ও জুয়োড়ি-জীবনের নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা একই সঞ্চয়নে স্থান পেয়েছে। আমার বাবা ছিলেন গ্রিক ভাষার অধ্যাপক। স্কুলে আর পাঁচটা ছেলেমেয়ে যা গ্রিক শেখে সেটা ম্যাট্রিক পাসের পরই ভুলে যায়। আমার পিতা সেটা হতে দেননি। এখন আমার ইচ্ছে হল সংস্কৃত শেখার। তাই তার সঙ্গে ভালো করে আলাপ করলুম। আমি তাঁর জন্য ভিন্টারনিৎসের জর্মন থেকে ইংরেজি অনুবাদ করে দিতুম, আর তিনি আমাকে সংস্কৃত পড়াতেন।
