আমাদের অর্ডার না দেওয়া সত্ত্বেও ভালো ভালো কেক, স্যানউইজ, টার্ট উপস্থিত হল। বুঝলুম, এগুলো পূর্বের থেকেই অর্ডার দেওয়া ছিল।
কিছুক্ষণ পরে জিগ্যেস করলেন, আপনাদের দেশের খুব বেশি ছাত্র জর্মনিতে পড়তে আসে না– কী বলেন?
আমি বললুম, অতি অল্পই। তা-ও বেশিরভাগ শিখতে আসে সায়ান্স আর টেকনিকাল বিদ্যা।
একটু হেসে বললেন, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, আপনি হিউম্যানিটিজের। আর বন তো তারই জন্য বিখ্যাত। তবে এখানে এসেছেন অল্প ভারতীয়ই। আপনারা যারা এসেছিলেন, ভারতে তাদের কোনও সংঘ আছে কি, যার মাধ্যমে একে অন্যের সঙ্গে আপনারা যুক্ত থাকতে পারেন?
আমি বললুম, না। এমনকি আমি এদের মাত্র দু একজনকে চিনি। ভারতবর্ষ বিরাট দেশ বলে আমি চায়ে চুমুক দিলুম। তিনি বললেন, ডিব্ৰুগড় থেকে দ্বারকা, কুলু থেকে কন্যাকুমারী। আমি তো অবাক! আশ্চর্য হয়ে বললুম, আপনি অত ডিটেল জানলেন কোথা থেকে? এখানকার শিক্ষিত লোককে পর্যন্ত ইভার (ভারতীয়) আর ইন্ডিয়ানার (রেড ইন্ডিয়ান) এ দুয়ের পার্থক্য বুঝিয়ে বলতে হয়।
এবং তার পরও কেউ কেউ আপনাকে শুধোয়, আপনি সেটাল আফ্রিকানার (সেন্ট্রাল আফ্রিকান) না জুড় ইটালিয়েনার (সাউৎ ইটালিয়ান)?
আমি আরও আশ্চর্য হয়ে বললুম আপনি অতশত জানলেন কী করে?
পরে বলব। কিন্তু আপনি ভারতে বন-এর ছাত্রদের সম্বন্ধে কী যেন বলছিলেন?
ভারতের বুদ্ধিজীবীর প্রধান অংশ থাকেন কলকাতায়। সেখানে থাকলেও খানিকটা যোগসূত্র থাকে। আমি থাকি ছোট্ট বরোদায়–
অস্ফুট শব্দ শুনে আমি ওঁর মুখের দিকে তাকালুম। দেখি, তার পাংশু মুখে যে দু-ফোঁটা রক্ত ছিল তা-ও অন্তর্ধান করেছে। ভয় পেয়ে শুধালুম, কী হল আপনার?
ঢোঁক গিলে খানিকটা সামলে নিয়ে বললেন, ও কিছু না। আমি অনিদ্রায় ভুগে ভুগে দুর্বল হয়ে পড়েছি। এখানে বড় লোকের ভিড়। সব বন্ধ। আমি আমার অফিস-ঘরের জানালা শীত-গ্রীষ্ম সবসময় খোলা রাখি।
আমি বললুম, তা হলে খোলায় চলুন। তার পর শুধালুম, আপনার সহকর্মী অন্য মেয়েরা কিছু বলে না?
প্রথমটায় ঠিক বুঝতে পারেননি। পরে বললেন, ও। আমি এককালে টেলিফোন গার্লই ছিলুম। এখন তারই বড় অফিসে কাজ করি। অ্যাডমিনিসট্রেটিভ কাজ। কিন্তু আগেরটাই ছিল ভালো।
বাইরে বেরিয়ে আসতেই আমি বললুম, আমার মনে হচ্ছে আপনি বেশি হাঁটাহাঁটি করতে পারবেন না। তার চেয়ে চলুন, ওই যে প্রাচীন যুগের একখানা ঘোড়ার গাড়ি এখনও অবশিষ্ট আছে, তাই চড়ে রাইনের পাড়ে গিয়ে বসি।
মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
আস্তে আস্তে শুধোলেন, গেলটুনার যে ঋগ্বেদের জর্মন অনুবাদ করেন সেইটের ওপর নির্ভর করে যে একটি ইংরেজি অনুবাদ ভারতবর্ষ থেকে বেরোবার কথা ছিল, তার কী হল?
আমি এবারে সত্যই অবাক হলুম। গেলটুনারের অনুবাদ অনবদ্য। গত একশো বছরে ঋগ্বেদ সম্বন্ধে ইউরোপ তথা ভারতে যত গবেষণা হয়েছে গেলটুনারের কাছে তার একটিও অজানা ছিল না, এবং অনুবাদ করার সময় যেখানে যেটি দরকার হয়েছে সেখানে সেইটে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এ মহিলাটি যে অতিশয় সমীচীন ও সময়োপযোগী প্রস্তাবটির কথা বললেন সে সম্বন্ধে আমি কিছুই জানতুম না। বিস্ময় প্রকাশ করে বললুম, কিন্তু আপনি এসবের খবর পেলেন কোথায়?
তিনি চুপ করে রইলেন। গাড়ি মন্থর গতিতে বেটোফেনের প্রতিমূর্তির পাশ দিয়ে মনসটার গির্জে পেরিয়ে, ইউনিভার্সিটি হয়ে রাইনের পাশে এসে দাঁড়াল।
গাড়ি থেকে নেমে তাকিয়ে দেখি, মহিলার মুখ তখনও ফ্যাকাসে। প্রস্তাব করলুম, ওই কাফেটার খোলা বারান্দায় গিয়ে বসি, আর আপনি কিছু একটা কড়া খান। ওয়েটরকে বললুম কন্যাক নিয়ে আসতে।
দুই ঢোঁক কন্যাক্ খেয়ে যেন বল পেলেন। বললেন, আমি এখনও অবসরমতো কিছু কিছু ইভলজির চর্চা করি। বছর বারো পূর্বে যখন আরম্ভ করি তখন পূর্ণোদ্যমেই করেছিলুম।
তার পর আবার অনেকক্ষণ ধরে চিন্তা করলেন। রাইনের জলের উপর তখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। দু একখানা মোটর বোট আসা-যাওয়া করছে মাত্র। বাতাস নিস্তব্ধ। এমনিতেই রাইনের সন্ধ্যা আমাকে বিষণ্ণ করে তোলে, আজ যেন রাইনের জলে চোখের জল ছলছল করছে।
মহিলাটি বললেন, কাল থেকে ভাবছি, কী করে কথাটি পাড়ি।
যে কোনও কারণেই হোক মহিলাটি যে বেদনাতুর হয়ে আছেন সে কথা আমি ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি। বললুম, আপনি দয়া করে কোনও সঙ্কোচ করবেন না। আমাদ্বারা যদি কোনও কিছু করা সম্ভব হয়, কিংবা সুদ্ধমাত্র আমাকে কিছু বলতে পেরে আপনার মন হালকা হয়–
মানুষকে ক্রমাগত সান্ত্বনার বাক্য দিয়ে প্রত্যয় দিতে থাকলেই যে সে মনস্থির করতে পারে তা নয়; বরঞ্চ কথা বন্ধ করে দিলে সে আপন মনে ভাববার এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছবার সুযোগ পায়। আমি বন্-বয়েল শহরের মাঝখানে রাইনের উপরের পাথরের মোটা মোটা থামের তুলে-ধরা বিস্তীর্ণ স্পানওলা সুন্দর সেতুটির দিকে তাকিয়ে রইলুম। লোহার পুল কেমন যেন নদীর সঙ্গে খাপ খায় না– পাথর যেন জলের সঙ্গে মিশে এক হয়ে যায়, উভয়েরই রঙ এক।
দুনিয়াতে হেন তালা আবিষ্কৃত হয়নি যেটা কলেকৌশলে, কখনও-বা পশুবল প্রয়োগ করে, কখনও-বা মোলায়েম আদরসোহাগ করে খোলা যায় না; ওদিকে আবার গেস্তাপো, ওগপু এ সবকটা পদ্ধতি এবং আরও মেলা নয়া নয়া কৌশল খাঁটিয়েও বহু মানুষের মনের তালা খুলতে পারেনি। এবং হঠাৎ অকারণে কেন যে সেটা খুলে যায় তার হদিস কনফেশনের পাদ্রিসায়েব থেকে আরম্ভ করে আমাদের যৌবনকালের টেগার্ট পাষণ্ডও সন্ধান পায়নি।
