রিসিভার রাখার এক মিনিট যেতে না যেতে টেলিফোন বাজল। রিসিভার তুললুম। অপর প্রান্ত থেকে অনুরোধ এল বামাকণ্ঠে, আমি কি ডক্টর সায়েডের সঙ্গে কথা বলতে পারি?
কথা বলছি।
আমি ট্রাঙ্ককল দফতর থেকে কথা বলছি। খানিকক্ষণ আগে আপনি ডুসলডর্ফে ট্রাঙ্ককল করেছিলেন না?
সর্বনাশ! পাউলের ভয় তা হলে অমূলক নয়। নিশ্চয়ই নাৎসি স্পাই। আমাদের কথাবার্তা ট্যাপ করেছে। ক্ষীণকণ্ঠে বললুম, হ্যাঁ।
আপনি ইন্ডিয়ান?
কী করে—
না, না, মাফ করবেন আপনার জর্মন উচ্চারণ খুবই খাঁটি, কিন্তু কি জানেন, আমি ট্রাঙ্ককল একচেঞ্জে কাজ করি বলে নানান দেশের নানান ভাষা নানান উচ্চারণের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয়। শুধু কণ্ঠস্বর নিয়ে সবকিছু বুঝতে হয় বলে অল্প দিনের ভিতরেই এ জিনিসটা আমাদের আয়ত্ত হয়ে যায়।
আশ্চর্য নয়। মানুষ তার মাতৃভাষার বৈশিষ্ট্য বিদেশি ভাষা বলার সময় আপন অজান্তে প্রকাশ করে ফেলে আর ওকিবহাল ব্যক্তি সেটা ধরে ফেলতে পারেন। শুনেছি লন্ডনের কোন এক আর্ট একাডেমির অধ্যক্ষ যে কোনও ছবি দেখেই বলে দিতে পারতেন, কোন দেশের লোক এটা একেছে। একই মডেল দেখে দেড়শোটি ছেলে স্কেচ করেছে; তিনি দিব্য বলতে পারতেন, কোনটা ইংরেজের, কোনটা চীনার, আর কোনটা ভারতীয়ের। এবং যদিও মডেলের মেয়েটি ইংরেজ তবু সবচাইতে ভালো এঁকেছে ইন্ডিয়ান। মনকে এরই স্মরণে সান্তনা দিলুম, তবে বোধহয় আমার জর্মন উচ্চারণ জর্মনদের চেয়েও ভালো।
অনেক ইতিউতি করে নারীকণ্ঠ বলল, আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আমি বার বার ক্ষমা চাইছি, আমি কি পাঁচ মিনিটের জন্য আপনার দর্শন পেতে পারি? আমার একটু দরকার আছে। সেটা কিন্তু জরুরি নয়; আপনার যেদিন যখন সুবিধে হয়।
তাড়াতাড়ি বললুম, পাঁচ মিনিট কেন– পাঁচ ঘণ্টা নিন। আমি এখানে ছুটিতে। দিন ক্ষণ আপনিই ঠিক করুন।
কাল হবে? আমার ডিউটি বিকেল পাঁচটা অবধি। আপনার হোটেলের পাশেই তো কাফে হুশ্লাগ। সেখানে সাড়ে পাঁচটায়? আমি আপনাকে ঠিক চিনে নেব। বন্ শহরে আপনিই হয়তো একমাত্র ইন্ডিয়ান।
পরদিন কাফের মুখেই একটি মহিলা এগিয়ে এসে বললেন, গুটটাখ! হের সায়েড!
আমি বললুম, গুটনটাখ, ফ্রলাইন–
এস্থলে প্রথম পরিচয়ে আপন নাম বলা হয়। ফ্রলাইন (কুমারী, মিস) কী একটা অস্পষ্ট কণ্ঠে বললেন, আমি ঠিক ধরতে পারলুম না। কিন্তু নিতান্ত জরুরি প্রয়োজন না হলে এস্থলে দুবার প্রশ্ন করা– বিশেষ করে মহিলাকে আদব-দুরস্ত নয়।
দেহের গঠনটি ভারি সুন্দর, আঁটসাঁট, দোহারা। প্রলম্বিত বাহু দুখানি এমনি সুডৌল যে, মনে হয় যেন দু গুচ্ছ রজনীগন্ধা। রাস্তার উজ্জ্বল আলোতে দেখছিলুম বলে লক্ষ করলুম কনুইয়ের কাছে মণি-খনির মতো দুটি টোল। গোটা দেহটি যেন রসে রসে ভরা। শুধু দেহটি দেখলে যে কেউ বলবে, মধুভরা পূর্ণ যুবতী।
কিন্তু মুখটির দিকে তাকানো মাত্র যে কোনও মানুষের মনের ভাব সম্পূর্ণ বদলে যাবে। ব্লাউজের গলার বোতাম থেকে আরম্ভ করে মাথার চুল পর্যন্ত–মনে হল এ যেন অন্য বয়সের ভিন্ন নারী। মুখের চামড়ায় এক কণা লাবণ্য এক কাচ্চা মসৃণতার তেল নেই। গলার চামড়া পর্যন্ত বেশ কিছুটা ঝুলে পড়েছে। সিকি পরিমাণ চুলে পাক ধরেছে। আর চোখ দুটি– সেগুলোর যেন দর্শনশক্তিও হারিয়ে গিয়েছে– জ্যোতিহীন, প্রাণহীন। এর বয়স কত হবে?– শুধু যদি মুখ থেকেই বিচার করতে হয়? আর সে কী বিষণ্ণ মুখ! বয়স বিচারের সময় সেই বিষণ্ণতাই তো হবে প্রধান সাক্ষী– জ্যোতিভ্রষ্ট চক্ষুতারকার চেয়েও কণ্ঠদেশের লোলচর্মের চেয়েও।
ইতোমধ্যে আমরা কাফেতে ঢুকে আসন নিয়েছি। মহিলাটি– না যুবতীটি, কী বলব? (সেই যে কালিদাসের গল্পে বুড়ো স্বামীর ধড়ের সঙ্গে জোয়ান ভাইয়ের কাটা মুণ্ড জুড়ে দিয়েছিল এক নারী)– ইতোমধ্যে দস্তানা খুলে নিয়েছেন। মুখের সঙ্গে মিলিয়ে বেরুল হাত দুখানা রসে ফাটো-ফাটো দেহের সঙ্গে মিলিয়ে নয়– নির্জীব, কোঁকড়ানো চামড়া, ইংরেজিতে বলে ক্রোজ ফিট, কাকের পা! অতি কষ্টে নিজেকে সামলেছিলুম!
বললেন, আপনাকে আমি নিমন্ত্রণ করেছি। অর্থাৎ তিনি বিল শোধ করবেন। অন্য সময় হলে এ বারতা আমার কর্ণকুহরে নন্দন-কাননের স্বর্ণোজ্জ্বল মধুসিঞ্চন করত। কিন্তু এই বিষণ্ণ মুখের সামনে আমার গলা দিয়ে যে কিছুই নামবে না। বললুম, আমি যখন এখানে পড়তুম–
বাধা দিয়ে শুধোলেন, আপনিও পড়েছেন নাকি?
এই ও-টার অর্থ কী?
আমি বললুম, তখন তো কোনও অবিবাহিত রমণীর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা আমাদের মধ্যে রেওয়াজ ছিল না।
তার কণ্ঠটি ছিল এমনিতেই ক্ষীণ— এখন শোনাল মুমূর্ষ প্রায়। যেন মাফ চেয়ে বললেন, ব্যত্যয় সবসময়ই দুটো একটা থাকে। কিন্তু দয়া করে আপনি এসব গায়ে মাখবেন না। আমি আপনার অপ্রিয় কোনও কাজ করতে চাইনে।
কাফেতে এ সময়ে জর্মনদের ইয়া ইয়া লাশ ভামিনীদের ভিড়। ওয়েট্রেস এক কোণে একটি খালি টেবিল দিল। বুঝলুম, মহিলাটি পূর্বাহেই টেবিলটি রিজার্ভ করে রেখেছিলেন। ব্যাগ খুলতে খুলতে বললেন, আপনি কী খেতে ভালোবাসেন? চা নিশ্চয়ই। কিন্তু এদেশে যে চা বিক্রি হয় সে তো অখাদ্য। তবে আমার কাছে ভালো চা আছে। আমি লন্ডন থেকে সেটা আনাই। ব্যাগ থেকে বের করে একটি ছোট্ট পুলিন্দা তিনি ওয়েট্রেসের হাতে তুলে দিলেন। সে কিছু বলল না বলে বুঝলুম, এ ব্যবস্থায় সে অভ্যস্ত।
