কিন্তু এ তো গেল আর্যে আর্যে সংমিশ্রণ। কিন্তু ইভোচায়নায় ফ্রেঞ্চ আর্য রক্ত ও চীনা মঙ্গোলিয়ান রক্তে সংমিশ্রণ। এ জিনিস আমার কাছে অপূর্ব বলে মনে হয়েছিল। শুধু আমার কাছে নয়, অন্য অনেকেরই কাছে। কিন্তু হলে কী হয়, পানির দেবতা বদর পীর আমার প্রতি বড্ডই মেহেরবানি ধরেন– সপত্নদের কেউই একবর্ণ ফরাসি বলতে পারেন না। আমি যে অত্যুত্তম ফরাসি বলতে পারি তা-ও নয়। কিন্তু কথায় আছে, শয়তানও বিপদে পড়লে মাছি ধরে ধরে খায়। তরুণী যাবেন কোথায়! জাহাজে অবশ্য দু-একটি পাড় টুরিস্ট ছিলেন যারা ফরাসি জানেন, কিন্তু পাড় টুরিস্ট হতে সময় লাগে– বয়সটা ততদিন কিছু চুপ করে দাঁড়িয়ে যাত্রাগান দেখে না– পাঁড় টুরিস্ট হয় বুড়ো-হাবড়া। ওদিকে সুভাষিত আছে, বৃদ্ধার আলিঙ্গন অপেক্ষা তরুণীর পদাঘাত শ্রেয়।
প্রবাদটা উল্টো দিক থেকেও আকছারই খাটে। আমার তখন তরুণ বয়স, তদুপরি আমি বাঙলা দেশের লোক গায়ে বেশ কিছুটা চীনা-মঙ্গোল রক্ত আছে। তরুণীর সেটা ভারি পছন্দ হয়েছে– বলতেও কসুর করলেন না।
আমার তখন এমনই অবস্থা যে ওঁর সঙ্গে পৃথিবীর অন্য প্রান্ত অবধি যেতে পারি। অবশ্য জানি, পৃথিবীটা গোল আবার মোকামে ফিরে আসব নিশ্চয়ই, এই যা ভরসা।
ভেনিস পৌঁছে জানা গেল, এ জাহাজ পৃথিবীর অন্য প্রান্ত অবধি যায় না। ইনি শুধু মাকু মারেন ইতালি ও বোম্বাইয়ের মধ্যিখানে। আমাদের মধ্যে প্রেম হয়েছিল গভীর, কিন্তু ব্যাডমিন্টনের শাটল কক্ হতে যতখানি প্রেমের প্রয়োজন ততখানি তখনও হয়ে ওঠেনি। আসলে সবকিছু ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছিল সফরটা তেরো দিনের ছিল বলে। তেরো সংখ্যাটা অপয়া। বারো কিংবা চোদ্দ দিনের হলে হয়তো একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যেত। ভেনিস বন্দরে সজল নয়নে আমরা একে অন্যের কাছ থেকে বিদায় নিলুম। আমার যেসব সপত্নরা (আজকের দিনের ভাষায় পুংসতীন) ফরাসি জানত না বলে বিফল মনোরথ হয়েছিল তাদের মুখে পরিতৃপ্তির স্মিতহাস্য ফুটে উঠেছিল। বিদ্যেসাগর মশাই নাকি মানুষের মুখে হাসি ফোঁটাতে পারলে উল্লাস বোধ করতেন; জানিনে তিনি কখনও এমন হাসি দেখেছেন কি না যেটা দেখলে মানুষের মাথায় খুন চাপে।
ব্রেন্নার পাস, অস্ট্রিয়া হয়ে জর্মনিতে ঢুকলুম। বন শহরে পৌঁছলুম সন্ধ্যার সময়।
বন প্রাচীন দিনের গলি-খুঁচির শহর। একে আমি আপন হাতের উল্টো পিঠের চেয়েও ভালো করে চিনি। মালপত্র হোটেলে নামিয়ে বেরিয়ে পড়লুম প্রাচীন দিনের সন্ধানে।
ওই তো সামনে হাসে রেস্তোরাঁ। দেখি তো, আমার দোস্ত বুড়ো ওয়েটার হাস্ এখনও টিকে আছে কি না। যেই না ঢোকা, হাসের সঙ্গে প্রায় হেড-অন্ কলিশন। বুড়ো হাস্ বাজিকর। দু হাতে সে একসঙ্গে পাঁচ প্লেট দু হাতে চার প্লেট, পঞ্চমটা এই চারটের মধ্যিখানে, উপরে সুপ রান্নাঘর থেকে খাবারঘরে তার চির প্রচলিত পদ্ধতিতে নিয়ে আসছিল। কোনওগতিকে সামলে নিয়ে হুঙ্কার দিল, ওই রে, আবার এসেছে সেই কালো শয়তানটা! আমি বললুম, তোর জান নিতে। হিটলার তোর জান নেবে–তুই ইহুদি! দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে সেই লোকটার কথা ভাবলুম, যে দুঃখ করে বলেছিল, হায় মা, টাক তো দিলি, কিন্তু ক-এর সঙ্গে আকারটা দিতে ভুলে গেলি। আমি বললুম, ইহুদির কালো চুল দিলি, মা, কিন্তু তার পকেটের রেস্তটা দিতে ভুলে গেলি। হামৃকে শুধালুম, তোমার ডিউটি কটা অবধি? ন-টা। তা হলে কাইজার কার্লে এসো ন-টায়। কেন? আমেরিকার পয়সাওলা কাকা মারা গেছে নাকি? না, কোলারে। সে আবার কোথায়? ভারতবর্ষে সোনার খনি। ওহ! তা হলে একটা গোল্ড-ডিগার সঙ্গে নিয়ে আসব।
গোল্ড-ডিগার মানে যেসব খাবসুরৎ মেয়ে প্রেমের অভিনয় করে আপনার মনি-ব্যাগটি ফাঁকা করতে সাহায্য করে। আপনারই উপকারার্থে। পোকা লাগার ভয়ে সেটাতে বাতাস খেলাতে চায়।
গোরস্তানে ঢুকলে আমরা চেনা লোকের গোরের সন্ধান করি; অচেনা লাইব্রেরিতে ঢুকলে চেনা লেখকের বই আছে কি না তারই সন্ধান করি প্রথম। বন্ শহর নতুনত্ব অত্যন্ত অপছন্দ করে; তৎসত্ত্বেও দু-চারটে নতুন রেস্তোরাঁ কাফে জন্ম নিয়েছে। সেগুলো তদারক করার কণামাত্র কৌতূহল অনুভব করলুম না। কে বলে মানুষ নতুনত্ব চায়?
কুকুর যেরকম পথ হারিয়ে ফেললে আপন গন্ধ এঁকে এঁকে বাড়ি ফেরে, আমিও ঠিক তেমনি সাত দিন ধরে আজ ভেন্সবের্গ, কাল গোডেসবের্গ, পরশু জীবেনগেবের্গে, পরের দিন রাইনে লঞ্চ-বিহার করে করে আপন প্রাচীন দিনের গন্ধ খুঁজে খুঁজে কাটালুম; আর শহরের ভিতরকার গলি-ঘুচির রেস্তোরাঁ-বারের তো কথাই নেই।
অষ্টম দিনে ডুসলডর্কে আমার প্রাচীন দিনের সতীর্থ পাউলকে ট্রাঙ্ক করলুম। প্রথমটায় সে একচোট গালাগালি দিল আমি কেন আগে জানাইনি। আমি বললুম, কেন? বেতার তো আমার টুরের খবর প্রতিদিন বুলেটিনে ঝাড়ছে।
শুধাল, কোন্ বেতার? দক্ষিণ মেরুর?
না, কন্সানট্রেশন ক্যাম্পের।
এই! চুপ চুপ!
না রে না, ভয় পাসনি। তোদের ফুরারের সঙ্গে আমাদের এখন খুব দোস্তি। তিনি গোপনে আমাদের দু-একজন বেসরকারি নেতাকে শুধিয়েছেন, তিনি যদি ব্রিটেন আক্রমণ করেন তবে ভারতীয়েরা তার মোক নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে কি না।
থাক্ থাক্। আজ সন্ধ্যায় দেখা হবে।
অমি বললুম, হাইল হিটলার।
