রাস্তায় নামার পর সখা বলল, তা হলে চলো, পুরোধাক্কা উলঙ্গ নৃত্যে।
আমি আঁতকে উঠে বললুম, সর্বনাশ! সে জায়গার টিকিটের মূল্য তো বিলেতের পঞ্চম জর্জের মুকুটের কূ-ই-নূরের চেয়ে খুব কিছু একটা কম হবে না। আমার পকেটে সে-রেও নেই।
সখা জানতেন আমি বুদ্ধু। তাই শান্তকণ্ঠে বললেন, একদম নগ্ননৃত্যের আসরে টিকিটের দাম ঢের টের কম। ওগুলো বিলকুল পপুলার নয়।
আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলুম, যেটি এ-লেনে আমার একমাত্র বক্তব্য।
সম্পূর্ণ নগ্ননৃত্য তা অত্যন্ত স্বাভাবিক, নৈসর্গিক নেচারেল জিনিস। সেটা দেখতে যাবে কে? প্যারিসে বেড়াতে আসে সাধারণত বিদেশিরা। তাদের অনেকেই মরবিড়, নপুংসক পার্ভার্স। তারা, এবং অম্লাধিক ফরাসিরা যায় ওইসব অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ নৃত্যে। তারা তো নেচারেল নগ্ননৃত্য দেখতে চায় না। এইটেই আমার মূল বক্তব্য।
সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খোলা অতিষ্ঠ হয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। সে-বিবৃতিতে তিনি একটা অশ্লীল ফিল্মের সাতিশয় ভসনাপূর্ণ বর্ণনা দিয়েছেন। যুবক নায়ক যুবতী নায়িকা একটা টিলার সানুদেশে একে অন্যের অতিশয় পাশাপাশি লম্ববান হয়ে গড়গড়িয়ে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছেন এবং একে অন্যের প্রতি কুৎসিততম জঘন্যতম যৌনইঙ্গিত দিচ্ছেন। এটা কেন হল, তার বিশ্লেষণ শ্ৰীযুত খোলা করেননি। বোধহয় প্রয়োজন বোধ করেননি। পাঠকদের সহৃদয়, অনুমতি নিয়ে আমি তার বিশ্লেষণ করি।
যেহেতু এ-দেশের ফিল্মে চুম্বন, আলিঙ্গন, নগ্নতা দেখানো বেআইনি তাই ফিলু-নির্মাতা রগরগে ছবি বানিয়েছেন যৌন-সম্পর্কের প্রতি অশ্লীল ইঙ্গিতের আশ্রয় নিয়ে বহু যেরকম নগ্লাকে মোজা পরিয়ে, কাব্যের নৃত্যের শেষ কটিবস্ত্র উন্মোচন না করে।
আমার মনে প্রশ্ন জাগে, চুম্বন নগ্নতার বাধা-নিষেধ যদি আজ তুলে দেওয়া হয় আর্টের খাতিরে (অবশ্যই সেটা কঠিন প্রশ্ন, ফিল্মে আর্ট বলতে আমরা কী বুঝি, এ নিয়ে সুযোগ পেলে পরবর্তীকালে আলোচনা করব), তবে কি আমাদের ফিল-নির্মাতারা সঙ্গে সঙ্গে উদোম নৃত্য আরম্ভ করে তাদের ফিল্ম চুম্বনে নগ্নতায় ভরপুর, টইটম্বুর করে দেবেন?
হয়তো গোড়ার দিকে কিছুটা বাড়াবাড়ি হবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তারা শিগগিরই বুঝে যাবেন যে, সাধারণ দর্শক তিন মিনিটব্যাপী চুম্বন, পাঁচ মিনিটব্যাপী নগ্নতা প্রদর্শন দেখবার জন্য অত্যধিক ব্যাকুল নয়। ঠিক যেরকম পূর্বেই নিবেদন করেছি, প্যারিসের পরিপূর্ণ নগ্ননৃত্য দেখবার জন্য মানুষ হই-হুঁল্লোড় লাগায় না।
আইন দরকার, ব্যান্-এরও আয়োজন আছে।
কিন্তু মনে রাখা উচিত, কোনও কোনও দেশে মৃত্যুদণ্ড তুলে দেওয়ার পরও সেসব দেশে খুনের সংখ্যা বেড়ে যায়নি।
হালে ডেনমার্কে সর্বপ্রকার অশ্লীল সাহিত্যের উপরকার ব্যান তুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোথায় না অশ্লীল সাহিত্যের বিক্রি হুশ হুশ করে বেড়ে যাবে, রাম ব্যাপারটা উল্টো বুঝেছেন। অশ্লীল মালের পাবলিশাররা মাথায় হাত দিয়ে ফুটপাতে বসে গেছেন। তাঁদের বিক্রি শতকরা ৭০ ভাগ কমে গেছে। কারণ মানুষের লোভ নিষিদ্ধ ফলের প্রতি। ইংরেজিতে প্রবাদ : A stolen kiss is sweeter than any other.
এ বাবদে শেষ আপ্তবাক্য বলেছেন একটি সুরসিকা ফরাসি মহিলা। আমেরিকায় তখন লরেন্স মহাশয়ের লেডি চ্যাটারলি পুস্তক অশ্লীল কি না, সেই নিয়ে মোকদ্দমা চলছে। লেডি চ্যাটারলি পক্ষের উকিল (লেডি চ্যাটারলির লাভার না, লেডি চ্যাটারলির লয়ার) হুতাশনসদৃশ প্রজ্বলিত ভাষায় তাঁর বক্তৃতা শেষ করে অনুপ্রেরণিত কণ্ঠে বললেন, লেখকরাজ লরেন্স এই পুস্তক দ্বারা যৌন-সম্পর্ককে অকল্পনীয় স্বর্গীয় স্তরে (স্পিরিচুয়াল লেভেলে) তুলে ধরেছেন।
এই বিবৃতিটি পড়ে সেই ফরাসি মহিলাটি একটু দুষ্টহাসি হেসে বললেন, সর্বনাশ। এখন তা হলে যৌন-সম্পর্কের অর্ধেক আনন্দই মাঠে মারা গেল। আমি তো অ্যাদ্দিন জানতুম, এটা পাপাচার!
ত্রিমূর্তি
প্রখ্যাত রুশ ঐতিহাসিক মিখাইল গুস্ একটি বড় খাঁটি তত্ত্বকথা বলেছেন : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাবলির কথা আজ আমরা স্মরণ করি এজন্য যে, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য আমরা তা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। এরকম একটা শিক্ষা হল যে, আমাদের যুগে বিশ্ব আধিপত্য বিস্তারের যে কোনও রকম দাবি এক সামগ্রিক ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। হিটলারের পদানুসরণ যারা করতে চায়, তাদের সকলের প্রতি এ হল এক গুরুতর হুশিয়ারি। (১)
কমরেড পণ্ডিত গুসের কথার পিঠ-পিঠ আমি কোনও মন্তব্য করার দস্তু ধরিনে। আমি অন্য এক মনস্তত্ত্ববিদের একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি মাত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে নরনবের্গ শহরে যখন গ্যোরিঙ, হে, কাইটেল প্রভৃতি জনা বিশেকের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা চলছিল তখন প্রখ্যাত মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদ ডাক্তার কেলি দিনের পর দিন হাজতে ওদের মনঃসমীক্ষণ করার পর দেশে ফিরে গিয়ে বলেন, হিটলারের মতো ডিক্টেটর এবং নাসি পার্টির মতো পার্টি পৃথিবীর যে কোনও দেশে যে কোনও সময়ে পুনরায় দেখা দিতে পারে। তাই আমার মনে ভয় লাগে, কমরেড় গুসের গুরুতর হুশিয়ারি সত্ত্বেও এ গর্দিশ পুনরায় যে কোনও দিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তবু যদি রুশ তরিশ গুস্-এর এ হুশিয়ারি (অস্তরজ্বননা!) মেনে নেন তবে ক্রমে ক্রমে চীন এমনকি মার্কিনও হয়তো রুশের সৎ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবেন এরকম একটা আশা করা যেতে পারে।
