কিন্তু এ-বর্ণনা আর বাড়াব না। আমার বক্তব্য বোঝাবার জন্য নিতান্ত যেটুকু প্রয়োজন। সেইটুকুই নিবেদন করি।
ক্যাবারিনীদের পরনে ছিল উক্তমার্ধে অতি সূক্ষ্ম, প্রায় স্বচ্ছ, শরীরের মাংসের সঙ্গে রঙ-মিলিয়ে চীনাংশুকের গোলাপি ব্রাসিয়ের। অধমার্ধে ছিল কটিসূত্র–সোজা বাংলায় যাকে বলে ঘুনসি। সেই ঘুনসি থেকে নেবে গিয়েছে চার আঙুল চওড়া, ঠিক, আমাদের পালোয়ানদের নেঙট, অবশ্য সাইজে তিনগুণের একগুণ, আকারে ত্রিকোণ, এবং সেটি ঘুরে গিয়ে পিছনের কটিমধ্যে যেখানে ঘুনসির সঙ্গে গিঠ খেয়েছে সেখানে সে ঠিক ঘুনসিরই মতো একটি সূক্ষ্ম সূত্ররূপ ধারণ করেছে।
নৃত্যের সর্বশেষ দৃশ্যে ক্যাবারিনীরা তাদের ব্রাসিয়ের খুলে খুলে স্টেজের চতুর্দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ছড়াতে আরম্ভ করলেন।
এস্থলে এসে পাঠক আমাকে লম্পট ভাবুন আর যাই ভাবুন, হক কথা বলতে গাফিলি করব না। যা থাকে কুল-কপালে!
এর পর আমি ভেবেছিলুম নর্তকীরা তাদের অধমার্ধের অঙ্গবাসও খুলে ফেলবেন। তা যখন হল না, তখন আমি আমার সঙ্গীকে শুধিয়ে জানতে পারলুম, আইনানুযায়ী স্টেজে সম্পূর্ণ নগ্ন হওয়া নিষিদ্ধ। অবশ্য বেআইনিভাবে গোপনে সম্পূর্ণ নগ্ননৃত্যের ব্যবস্থার অভাবও প্যারিসে নেই।
এরা যখন নাভির নিচের কাপড়টুকু খুলল না তখনই আমার মনে হল এবারে পাঠক নিশ্চয় বিস্মিত হবেন– এ নৃত্য এবারে হয়ে গেল অশ্লীল। আমার মনে হল, সেই চিত্রকরের আঁকা একটিমাত্র মোজা অশ্লীলতম ইঙ্গিত দিচ্ছিল, এখানেও হুবহু তাই, বরং বলব অশ্লীলতর, অশ্লীলতম। এরা যদি একেবারে নগ্ন হয়ে যেত তবে এরা সেই চিত্রকরের নগ্ন রমণীর মতো (একটি মোজা পরানোর পূর্বে) হয়ে যেত সরল স্বাভাবিক নৈসর্গিক নেচারেল। এদের সেই একচিলতে দক্ষিণার্ধবাস তখন দিতে লাগল অশ্লীলতম ইঙ্গিত চিত্রকরের মোজাটির ইঙ্গিত তার তুলনায় কিছু না।
তখন হঠাৎ মনে পড়ে গেল, এক নেটিভ স্টেটের জনৈক মহারাজা ভাস্কর্যশিল্পের প্রকৃত সমঝদার ছিলেন। তিনি ইয়োরোপ থেকে অনেকগুলো প্রথমশ্রেণির মূর্তির প্লাস্টার-কাস্ট নিয়ে এসে তার জাদুঘরটি সত্যকার দ্রষ্টব্য প্রতিষ্ঠান করে তুলেছিলেন। কিছু কিছু মূর্তি ছিল সম্পূর্ণ নগ্ন– পুরুষ রমণী দুই-ই। একদিন মহারানি গিয়েছেন সেই জাদুঘর দেখতে। তিনি তো শকড়। হুকুম দিলেন নগ্নমূর্তিগুলোর কোমরে গামছা বেঁধে দিতে? পাঠক ভাবুন, রোমান মূর্তির কোমরে (বাধিপোতার?) গামছা! সে কী বেপ দেখতে! কিন্তু এহ বাহ্য।… অজ পাড়াগাঁয়ে লোক, সে-শহরে এলে চিড়িয়াখানা এবং এই জাদুঘরটিও দেখতে আসত। এক ছুটির দিনে আমি জাদুঘরের এটা-সেটা দেখছি, এমন সময় একটি গামছা-পরা মূর্তির সম্মুখে তিনজন গামড়িয়া– চাষাই হবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আমি গুঁড়িগুড়ি তাদের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালুম এবং নিম্নোক্ত সরেস কথোপকথন শুনতে পেলুম।
প্রথম চাষা : মূর্তিটার কোমরে গামছা কেন? (আমি বুঝলুম, ওই অঞ্চলের একাধিক মন্দিরে নগ্নমূর্তি দেখেছে বলে এ-প্রশ্নটা তুলেছে।)
দ্বিতীয় চাষা : শুনেছি, মহারানি নাকি ন্যাংটো মূর্তি আদপেই বরদাস্ত করতে পারেন না। তারই ইকুমে গামছা পরানো হয়েছে।
পূর্ণ এক মিনিটের নীরবতা। তার পর—
তৃতীয় চাষা : (ফিসফিস করে) মহারানির পাপ মন।
আমার এই অভিজ্ঞতা সমর্থন করেন, এই জাদুঘরের ধুরন্ধর পণ্ডিত জর্মন উচ্চতম কর্তা! জাদুঘরে গাইয়াদের ভিড় লাগলেই তিনি তার একাধিক কর্মচারীকে নিযুক্ত করতেন ওদের পিছনে গা-ঢাকা দিয়ে ছবিমূর্তি সম্বন্ধে ওদের টীকাটিপ্পনী শুনে তাঁকে রিপোর্ট দিতে।… এ-দেশ ছাড়ার সময় তিনি আমাকে বলেন, শহুরেদের তুলনায় এদেশের জনপদবাসীদের সরল স্পর্শকাতরতা অনেক বেশি। এরা যেমন কালীঘাটের পট দেখে আনন্দ পায়, ঠিক তেমনি ইউরোপীয় মডার্ন ছবি দেখেও সুখ পায়। এবং বললে বিশ্বাস করবেন না, গগন ঠাকুরের কিউবিস্ট ছবিও এদেরকে হকচকিয়ে দিতে পারে না। তবে এগুলো সম্বন্ধে মতামত দেবার পূর্বে এবং আকছারই লোহার উপর হাতুড়িটি মারে মোক্ষম–অনেকখানি চিন্তা করে তবে বলে। আরও একটা মোস্ট ইনট্রিসটিঙ এবং ক্যারাকটেরিস্টিক ফ্যাক্ট–এরা থ্রি-ডাইমেনশনাল, রিয়ালিস্টিক, রঙিন ফটোগ্রাফের মতো ছবি বাবদে উদাসীন (যেগুলো শহুরেরা পছন্দ করেন)। এই হল আমার কর্মচারীদের রিপোর্ট। অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। কারণ, হা-হতোস্মি, এই কর্মচারীরা অন্যান্য শহুরেদের মতো পছন্দ করে রঙিন ফটোগ্রাফের মতো ছবি।
আমি শুধালুম, নিউড?
যার ডিরেক্টর তাজ মেনে বললেন, নিউড। এসব গ্রাম্য লোক সুস্থ স্বাভাবিক যৌনজীবন যাপন করে। উত্তম বলদের সঙ্গে জাতগাভীর সম্বন্ধ করায়। পথেঘাটে কুকুর-বেড়ালের সম্পর্ক দেখে ছেলেবেলা থেকেই। এদের ভিতরে তো কোনও ঢাক-ঢাক গুড়গুড় নেই। এরা তো শহুরেদের মতো সেক্সার্ভড় বা পার্ভার্স নয়। এরা নড দেখে সরলচিত্তে, রস পায় অনাবিল হৃদয়ে।
কী বলতে গিয়ে কী বলে বলে কহাঁ কহা মুলুকে চলে এলুম! কিন্তু বিচক্ষণ গ্রাম্য পাঠক অনায়াসে বুঝতে পারবেন আমার এসব আশকথা-পাশকথা আমার মূল বক্তব্যের সৎ বুনিয়াদ নির্মাণ করছে।
তা হলে ফিরে যাই ফের সেই ক্যাবারেতে; বরঞ্চ বলি, ততক্ষণে আমি সখাসহ নৃত্যশালা ত্যাগ করে রাস্তায় নেমে পড়েছি। আমি পুরিটান নই, নটবরও নই। তাই এসব অশ্লীল ইঙ্গিত আমার ভালো লাগে না। ওই জর্মন পঞ্জিতের ভাষায় বলতে গেলে আমি গ্রামাঞ্চলের সাধারণ স্বাভাবিক জনপদপ্রাণী। তদুপরি আমি বুদ্ধ। আমি চট করে উত্তেজিত হইনে, ঝপৃ করে মাটির সঙ্গে মিলিয়েও যাইনে।
