৭. অনেক চিত্র পরিচালক নাকি আপনার গল্প বা উপন্যাস নিয়ে ছবি করতে গিয়ে নানা ভাবে পিছিয়ে এসেছেন?
উত্তর: কোথাও নিশ্চয়ই তাঁদের সমস্যা হয়। কোথাও গিয়ে তাঁরা হয়তো বাধা পান। কোথায় সেট, এখনও জানি না। একটা ভুতুড়ে ব্যাপার এখানে আছে। পরি চালকরা আমার কাছে আসছেন। স্ক্রিপ্ট পড়িয়ে কনস্ট্রাক্ট সই করে নিয়ে যাচ্ছেন। তারপর কী যে হয়, কোন খাদে যে তাঁদের ফেলে দেওয়া হয়, কে যে ফেলে দেয়, কে যে। কী করে, তার কিছুই আমি জানি না। অনেককে শুধু অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেখেছি।
৮. পশ্চিমবঙ্গের অনেক কবি সাহিত্যিক চান না আপনার লেখা এখানে ছাপা হোক। বা আপনি কলকাতায় স্থায়ী ভাবে বাস করুন। এদের এরকম মনোভাবের কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: কেন চাননা ওঁরা, সেটা ওঁদের জিজ্ঞেস করুন। আমি কী করে বলবো ওঁরা কেন চান না আমি কলকাতায় বাস করি বা কলকাতায় আমার লেখা ছাপা হোক। এক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়া কেউ মুখ খুলে আমাকে বলেননি কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। পুরো ২০০৭ সাল জুড়ে যখন পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমাকে রাজ্য থেকে তাড়াবার জন্য প্রায় উন্মাদ হয়ে উঠেছিল, তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একবার আমাকে বলেছিলেন, আমি যেন ভালোয় ভালোয় চলে যাই। আর, অন্য কার মনে কী ছিল বা আছে, সেটা তো আমি বলতে পারবো না। মনের কথা খুলে বললে তবেই না বুঝতে পারা যায় মনে কী আছে। না বললে বোঝাটা একটু কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ, দেখা হলে সবাই তো হাসি মুখ করে সম্ভাষণই জানাতেন। মনে-এক-মুখে-আরেকদের নিয়ে চিরকালই আমার একটু সমস্যা হয়।
৯. আপনার জনপ্রিয়তাকে এঁরা ঈর্ষা করেন বলে মনে করেন?
উত্তর: আমি জানি না কেউ ঈর্ষা করেন কি না। তবে, সহকর্মীদের জনপ্রিয়তা কে একটু আধটু ঈর্ষা প্রায় সবাই করে। শুধু সাহিত্যের জগতে নয়, সব জগতেই। লেখাপড়ার জগতে, খেলাধুলার জগতে, নাটকের জগতে, সঙ্গীতের জগতে, শিল্পের জগতে, বাণিজ্যের জগতে। কোথায় ঈর্ষা নেই? ঈর্ষা থাকা তো ক্ষতিকর নয়। বরং ঈর্ষা থাকলে প্রতিযোগিতাটা থাকে, আরও ভালো কিছু লেখার, আরও ভালো কিছু করার আগ্রহ জন্মায়। খুব কম মানুষই বলে যে কাঁধটা দিচ্ছি, কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে তুমি একটু বড় হও। কিন্তু, ওর জনপ্রিয়তাকে ঈর্ষা করি, সুতরাং ওকে এ তল্লাটে আর চাই না, ওকে যে করেই পারো খতম করে দাও, এটা কোনও ভদ্রলোকের মীমাংসা নয়। এই মীমাংসা অতি দুর্বল চিত্তের, অতি নড়বড়ে স্নায়ুর, অতি ভঙ্গুর মনের লোকেরা করে। ওদের, মানে ওই ভীতু আর কুচুটে কুচক্রীদের দিয়ে ভালো সাহিত্য হওয়াটা মুশকিল। ওরা খালি মাঠে গোল দেওয়ায় জন্য মুখিয়ে থাকে। বোঝেই না যে এতে কোনও বীরত্ব নেই।
১০. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আপনি যে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন, তাতে বাঙালির আবেগ ধাক্কা খাবে জেনেও আপনি ঝুঁকি নিয়েছেন। এতদিন। বাদে এই অভিযোগ করা কি খুব জরুরি ছিল?
উত্তর: বাঙালির আবেগে ধাক্কা না দেওয়ার দায়িত্বটা আমাকে কে দিয়েছে? যে-ই দিক, কারও আবেগ বাঁচিয়ে চলা আমার কাজ নয়। বিশেষ করে সেই আবেগ, যে। আবেগ সত্য শুনতে রাজি নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কিছুদিন ধরেই বলছিলেন, উনি নাকি বই ব্যানের বিরুদ্ধে। এটি সত্য নয়। আমার দ্বিখণ্ডিত ব্যান করার জন্য ২০০৩ সালে উনি অনেক লেখালেখি করেছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, সরকারকে বলেছেন, আর এখন কি বলছেন তিনি চিরকালই সব রকমের বই ব্যানের বিরুদ্ধে। আমি সবিনয়ে তাঁর ভুল ধরিয়ে দিলাম। তখনই কথায় কথায় ওই প্রসঙ্গ উঠলো, যৌন হয়রানিতে আমাকেও যে বাদ দেননি সেটা। শহরের সাহিত্য জগতে শুনেছি অনেকেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অনেক কথাই জানে, কিন্তু সবাই নাকি চেপে যায়। কারণ উনি খুব নামী দামী মানুষ। নামী দামী মানুষেরা অন্যায় করলেও সেটাকে অন্যায় হিসেবে দেখতে নেই। আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তো অহরহই বলছে, পুরুষমানুষ তো, ওরকম তো একটু করবেই। কিন্তু ওরকম করাটা যদি না মানি? তবে দোষটা আমার। পুরু মানুষের অন্যায় করাটা অন্যায় নয়, তার অন্যায় না মানাটা আমার অন্যায়। এই সমাজের নামী দামী কারও বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করা মানে নিজেকে জেনে বুঝে শূলে চড়ানো।
এতদিন বাদে অভিযোগ করেছি কেন? ঠিক কতদিন বাদে অভিযোগ করলে সেটা ঠিক, আর কতদিন বাদে করলে বেঠিক, শুনি? আমি কি বাপু কোর্টে গিয়ে পিনাইল ভ্যাজাইনাল-ধষর্ণের অভিযোগ করেছি যে আমাকে খুব দ্রুত অভিযোগটা করতে হবে কারণ ডাক্তারী পরীক্ষার জন্য তৈরি থাকতে হবে, কিছুদিন বাদে হলে যে পরীক্ষাটা সম্ভব নয়? যৌন হয়রানি মানেই, বেশির ভাগ ডিকহেড (বাই দ্য ওয়ে, ডিকহেড শব্দটা বাংলাভাষায় ঢোকাটা অত্যন্ত জরুরি, এর সমার্থক কোনও বাংলা শব্দ নেই।) ভাবে, পিনাস বুঝি ভ্যাজাইনাতে ঢুকেছেই ঢুকেছে, আরে বাপু ও ছাড়াও তো যৌন হয়রানি হয়। আমার বিনা অনুমতিতে আমাকে জাপটে ধরে আমার বুক খামচে ধরলেও তো হয়, নাকি হয় না? বিচ্ছিরি ঘটনাটা পুষে ছিলাম অনেকগুলো বছর। কোর্টেও যাইনি, কাগজেও যাইনি। সেদিন বই ব্যান নিয়ে ওই অনর্গল মিথ্যেটা যদি সুনীল গঙ্গোপা ধ্যায় না বলতেন, তাহলে হয়তো হয়রানির কথাটা বলাই হতো না কখনও। কিছু লেখায় দুঃখ করে যেটুকু লিখেছিলাম, সেটুকুই থাকতো। এখন মনে হয়, বলে ভালোই করেছি। কোনও অস্বস্তি মনের মধ্যে পুষে রাখা ঠিক নয়। মহামানবের সম্মান পান, আর তলে তলে যে ওই কীর্তিগুলো ঘটান, তা জানুক মানুষ। মেয়েরা এবার মুখ খুলুক, অনেক তো মুখ বুজে থাকী হল, আর কত! বাংলাদেশের এক লম্পটের মুখোশ উন্মোচন করেছিলাম বলে সারা দেশ আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করেছে, পশ্চি মবঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে। যেন সুনীল সম্পর্কে আমি একটি অক্ষর বানিয়ে বলেছি। যে হয়রানির শিকার হয়েছে, তাকে অসম্মান করে, অপমান করে, যে হয়রানি করেছে তাকে মাথায় তুলে সম্মান দেখিয়ে এরা আবারও প্রমাণ করেছে যে এরা কতটা নীচ, কতটা অসভ্য, কতটা নারীবিদ্বেষী, কতটা পুরুষাঙ্গ-পূজারী!
