বেশ আছি কিনা। বেশ আছি। ঘরে অসম্ভব বুদ্ধিমতী একটা বেড়াল। মাঝে মাঝে বুদ্ধিদীপ্ত কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, কথা কথা হয়। কলকাতা থেকে বছরে দুবার বন্ধুরা এসে কদিন করে কাটিয়ে যায়। বিদেশের বিদ্বজ্জনের সঙ্গে কনফারে ন্সে, সেমিনারে মত বিনিময় হয়। মৌলবাদী, নারীবিদ্বেষী, ছোটমনের হিংসুক লোকেরা শত্রুতা করে ঠিক, তবে বড় মানুষের কাছে সম্মান প্রচুর পাই। বেশ আছি। বয়স হচ্ছে, এ নিয়ে দুঃখ করে তো লাভ নেই। আমি যেমন বিশ্বাস করি না পঞ্চাশে জীবনের শুরু, এও বিশ্বাস করি না পঞ্চাশেই জীবনের শেষ। তবে কোনও বয়সই মন্দ নয়। আমরা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছি, এই জীবনের পরে আর কোনও জীবন নেই, জীবন একটাই, আর চাইলেও কোনওদিন জীবন ফেরত পাবো না বলেই বয়স হয়ে যাওয়া বয়সগুলোকে মেনে নেওয়া এবং বয়সগুলোকে সে যে বয়সই হোক না কেন সেলেব্রেট করা উচিত| এই উচিত কাজটি বা ভালো কাজটিই যথাসম্ভব করতে চেষ্টা করি। ধীরে ধীরে অসুখ বিসুখ হবে, অথবা হঠাৎ করেই, মরে টরে যাবো, এ হচ্ছে অপ্রিয় সত্য। কিন্তু প্রিয় সত্যও তো আছে। জন্মেছিলাম বলে, কিছুকাল বেঁচেছিলাম বলে এই মহাবি শ্বকে জানতে পারছি, কোথায় জন্মেছিলাম, কেন, চারদিকে এত সহস্র কোটি গ্রহ নক্ষত্র, ওরা কোত্থেকে এলো, কী করে এই বিশাল বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে এত কিছুর মেলা, এত কিছুরই বা খেলা কেন, কী করে আবর্তিত হচ্ছে, কী করে প্রাণের সৃষ্টি, কেন বিবর্তন, কী করে মানুষ আর তার ইতিহাস এগোলো! না জন্মালে এসব জানা থেকে, এসব দেখা থেকে, এসব বোঝ থেকে, এসবের রহস্য আর রস আস্বাদন থেকে তো বঞ্চিত হতাম। বিশ্ব হ্মাণ্ডের সবকিছু কবিতার মতো সুন্দর। সত্যের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। ছোটবেলা থেকে মিথ্যে একেবারে সইতে পারিনি। সত্যের মধ্যেই দেখেছি অগাধ সৌন্দর্য। জীবন যতক্ষণ, ততক্ষণ জীবনটাকে যাপন করবো, জীবনের উৎসব করবো। বেঁচে আছি, এ খুব চমৎকার ঘটনা। তবে বেঁচে আছির চেয়ে কী করে বেঁচে আছি, সেটা বড় ব্যাপার। অন্ধত্ব, কুসংস্কার, হিংসে, ঘৃণার মধ্যে বেঁচে থাকাটাকে আমি মোটেও ভালোভাবে বেঁচে থাকা বলি না। কেউ কেউ নিজের জন্য শুধু স্ফুর্তি আর আনন্দ কাটাতেই ভেবে নেয় বেঁচে থাকার সার্থকতা, কেউ মনে করে কাড়ি কাড়ি টাকা উপার্জন করাটাই সব, কেউ আবার ভাবে অন্যের জন্য ভালো কিছু করলে জীবন অর্থপূর্ণ হয়। কেউ কেউ পরিবারের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে জীবনে সার্থকতা আনে। এই মহাবিশ্বের কিছু যায় আসে না আমাদের ছোট ছোট জীবনের ছোট ছোট সাহকিতায় বা ব্যর্থতায়। তবে আমরা ভেবে তৃপ্তি পাই যে আমরা সার্থক। পথ চলায় এই তৃপ্তিরও হয়তো প্রয়োজন। আছে। এ আমাদের চলায় প্রাণ দেয়, চলার গতিতে ছন্দ দেয়। |
কখনও ভাবিনি পঞ্চাশ হবো। একসময় কুড়ি বা তিরিশ হওয়াকেই সবচেয়ে বয়স হয়ে যাওয়া বলে ভাবতাম। এখন পঞ্চাশে এসে মনেই হয় না যে বয়স হয়েছে। আবার মাঝে মাঝে মনে হয়, যেন হাজার বছর ধরে বেঁচে আছি। বয়স চুলে হয় না, ত্বকে হয় না, বয়স মনে হয়। আমার এখনও মনের বয়স একুশ। একুশ! একটু ক্লিশে হয়ে গেল না! হলো না, কারণ একুশ বলতে একুশ বছর বয়সী শরীরও বোঝাইনি, ভুল করা আর হোঁচট খাওয়ার বয়সও বোঝাইনি, একুশ বলতে চারদিকের অসংখ্য অজানাকে জানার ব্যাকুলতা, আর অদম্য আগ্রহের বয়সটাকে বুঝিয়েছি। কলকাতার একটা সাহিত্য পত্রিকা থেকে আজ দীর্ঘ দিন যাবৎ একটা সাক্ষাৎকার চাওয়া হচ্ছে। দেব দেব করে আজও দেওয়া হয়নি। আজ দুয়ার খুলেই প্রশ্নোত্তর দিচ্ছি।
১. প্রায় দু বছর আগে একটি সাহিত্য পত্রিকার জন্য আপনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তখন আপনার কণ্ঠে অভিমান আর ক্ষোভ অতিমাত্রায় লক্ষ্য করেছিলাম। এখন কি অবস্থা কিছুটা পাল্টেছে? উত্তর: কী নিয়ে অভিমান করেছিলাম বা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলাম, তা তো বলবেন মশাই! আমার অভিমান, ক্ষোভ, রাগ ইত্যাদির পেছনে বড় কোনও কারণ থাকে। এমনিতে আমি খুব হাসিখুশি মানুষ, ছোটখাটো ভুলত্রুটিগুলোর জন্য মানুষকে নিরন্তর ক্ষমা করে দিই। তার মানে এই নয় যে কারও কোনও ভয়ংকর বদমাইশি দেখবো, আর না দেখার ভান করে অন্য দিকে চলে যাবো। অন্যায় যদি দেখি, রাগ করবো না? যেদিন কিছুতেই কিছু আসবে যাবেনা আমার, ক্ষোভ টোভ মরে ভূত হয়ে যাবে, রাগ করার মতো কিছু ঘটলেও রাগ করবো না, সেদিন বুঝবেন আমার মৃত্যু হয়েছে। এই যে অতিমাত্রা শব্দটা ব্যবহার করলেন, সেটা আবার অদ্ভুত! ক্ষোভের মাত্রা কী করে মেপেছিলেন আপনি? ক্ষোভ ঠিক কতটা হলে মাত্রার মধ্যে থাকে, কতটা হলে থাকে না, সেটা বোঝাবে কে? এই মাত্রাটা মাপার দায়িত্বটা কার, বলুন তো! গজফিতেটা ঠিক কার কাছে থাকে? যে ক্ষোভ দেখায় নাকি যে ক্ষোভ দেখে? নাকি তৃতীয় কোনও ব্যক্তি? সমাজের সবাই আপনারা মাত্রা মাপার মাতব্বর হয়ে গেলে চলবে কী করে বলুন। মানুষকে একটু নিজের মতো নিজের মত প্রকাশ করতে দিন। আপনার মাথায় ডাণ্ডা যতক্ষণ নামারছি, অর্থাৎ ভায়োলেন্স যতক্ষণ না করছি, ততক্ষণ আমাকে সইতে শিখুন।
২. সেই সাক্ষাৎকারে আপনি একটি প্রসঙ্গ তুলেছিলেন যা তার আগে কেউ জানতো না। আরও বেশি মানুষের জানা উচিত বলেই আমি সেই প্রসঙ্গটি আর একবার এখানে উত্থাপন করতে চাই। আপনি জানিয়েছিলেন যে আপনি যে শুধু মুসলিম মৌলবাদ বিরোধী তা নয়, আপনি সমস্ত ধরনের মৌলবাদের বিরোধী। যে কারণে গুজরাত দাঙ্গার পর পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু মৌলবাদ বিরোধী যে সংগঠন তৈরি হয় তাতে আপনি এককালীন বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। আপনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন এই বলে যে শঙ্খ ঘোষ সব কিছু জানা সত্ত্বেও কেন এই কথা প্রকাশ্যে জানাননি। শঙ্খ ঘোষ পরে একটি চিঠিতে আপনার কথা স্বীকার করে জানিয়েছিলেন যে আপনি নিজেই ওই কথা প্রকাশ্যে জানাতে নিষেধ করেছিলেন। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?
