ওই দেখ, ওরা তোমাকে খুবলে খেতে আসছে, ওরা তোমাকে চাখতে আসছে, ছিড়তে আসছে, ওরা মৃত্যুর আরেক নাম। ওরা বীভৎসতার আরেক নাম, ওরা তোমাকে পান করতে আসছে, লেহন করতে আসছে, ওরা তোমাকে দলিত করতে আসছে। ওরা পুরুষ। ওরা মানুষ নয়।
নারী তুমি সতর্ক হও । তোমার দিকে ধেয়ে আসা পুরুষেরা মূলত আসে অবাধ কাম ও অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধের কারণে, কর্তৃত্বের ক্রোধ।
এই জগৎ তোমার নারী, এই জগতে তুমি যেমন ইচ্ছে বাঁচ। এই জগৎ যদি একটা নদী হয়, তুমি নদী জুড়ে সাতার কাটো। এই জগৎ যদি একটা আকাশ হয়, তুমি আকাশ জুড়ে ওড়। জীবন যদি তোমার হয়, যা আসলেই তোমার, তবে সেই জীবন তুমি যেমন ইচ্ছে যাপন কর। তোমার কর্তৃত্ব তুমি নাও নারী।
আমি মৃত্যু দেখেছি। আমি পাপ দেখেছি, পঙ্ক দেখেছি। আর যেন কোনও নারীকে এত কাটাতার পেরোতে না হয়, শত ছিন্ন হতে না হয়। আর যেন কোনও নারীকে কেবল গন্তব্যে পৌছোবার জন্য পেরোতে না হয় এমন দুর্গম অরণ্য। আর যেন কোনও নারীকে বুনো মোষ এমন না তাড়ায়, আর যেন পুরুষের গুহা থেকে রক্তাক্ত বেরোতে না হয় কোনও নারীকে।
পুষ্টিহীনতায় ভুগছে যে নারী, তাকে বলি বেঁচে থেক। রক্তশূন্যতায় ভুগছে যে নারী, তাকে বলি বেঁচে থেক। যে নারী বন্ধ্যাতে ভুগছে, প্রসব কষ্টে ভুগছে, তাকে বলি বেঁচে থেক। খুব ভোরে দল বেঁধে হেঁটে যাওয়া বস্ত্র বালিকাদের বলি বেঁচে থেক, ঘুটে কুড়োনো কিশোরীকে বলি বেঁচে থেকু, বেঁচে ওঠ নারী। চমৎকার বেঁচে ওঠ।
এই আমি সকল দুঃখ ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। এই আমি কোনও অশ্লীলতা ও অসুস্থতার সঙ্গে আপস করিনি। নারী তুমি হাত ধর সুন্দরের, নারী তুমি হাত ধর স্বপ্নের।
৫২. পূর্বাভাস
অনেকে বলে পূর্বাভাস পত্রিকাটি তোমার সঙ্গে এত শক্রতা করল, তারপরও এতে লেখ! ‘শক্রতা’ শব্দটির ব্যাপারে আমি অবশ্য আপত্তি করি না, কারণ একথা সত্য যে একজন লেখককে যে ন্যূনতম মর্যাদা দেওয়া উচিত—পূর্বাভাস তা দেয়নি—যদিও আমি পূর্বাভাসেরই নিয়মিত লেখক বা কলামিস্ট ছিলাম। এই শক্রতার বিরুদ্ধে আমার করণীয় কিছুই ছিল না, আমার পক্ষে সম্ভব নয় লোক লাগিয়ে পূর্বাভাসের কব্জির হাড় ভেঙে ফেলা, অথবা কষে দুই থাপ্পড় লাগানো। সম্ভব নয় এইজন্য বলছি যে, আমাকে তা মানায় না, আহিরিটোলা থেকে মস্তান জোগাড় করা কোনও মেয়েমানুষের কৰ্ম্ম নয়।
আমি কোথাও কোনও মিত্রতার আশা করি না। আমি যদি পথচারী হই, পথে নয়; আমি যদি বধু হই, গৃহে নয়। আমি যদি কর্মী হই, কর্মক্ষেত্রে নয়। আমি যদি লেখক হই, পত্রিকায় নয়। মিত্রতার আশা করা নেহাত বোকামো ছাড়া কিছু নয় জানি। কারণ মেয়ে জাতীয় মানুষগুলো নিতান্তই ব্যবহারের জিনিস। যতক্ষণ এরা ব্যবহার উপযোগী, ততক্ষণ কদর। কাঠে ঘুণ ধরলে, লোহয় মরচে ধরলে—সেই কাঠ বা লোহার কদর আর তেমন থাকে না। তেমনি মেয়ে নামক দ্রব্য যখন অনুপযুক্ত হয়ে ওঠে ব্যবহারের, সেও কাঠ বা লোহার মত, জুতো বা জামার মত নিক্ষিপ্ত হয়।
নিক্ষিপ্ত হওয়াই সম্ভবত মেয়েদের নিশ্চিত নিয়তি। আর তাই হলে মান-মর্যাদা, শ্রদ্ধা-ভক্তি ইত্যাদি দামি ব্যাপারগুলো যত প্রতিভাবান মেয়েই হোক, দাবি করতে পারে না। তাই পূর্বাভাসের আশোভন আচরণেও আমি নীরব থেকেছি। নীরব থাকবার একটিই কারণ যত বড় কলামিস্টই হই না কেন, আমি মেয়ে। আমার মেয়ে নামের পরিচয়টিই সব ফুড়ে, সব ভেঙে উজিয়ে ওঠে। যেহেতু মানুষের ইতিহাসে নেই, চরিত্রে নেই, নীতি ও নিয়মে নেই যে মেয়েরা মূলত মানুষ, সে যখন আইনজীবী—আইনজীবীই, সে যখন চিকিৎসক—চিকিৎসকই, সে যখন লেখক–লেখকই। তাই ওই উজিয়ে ওঠা ‘মেয়ে’, ওই প্রধান এবং একমাত্র ‘মেয়ে’ পরিচয় নিয়ে সকলে ধুন্ধুমার নেচে ওঠে। পূর্বাভাস সকলের চেয়ে পৃথক কিছু নয়। বিচ্ছিন্ন কিছু নয়।
নারীর নিরাপত্তা কোথাও নেই, ঘরে নেই, বাইরে নেই। যতক্ষণ অন্যের সম্পদ হিসেবে সে অন্যের স্বার্থসাধন করবে—ততক্ষণ তার স্তুতি গাইবে লোকে, নিরাপত্তার নামে তাকে আবৃত করবে, আড়াল করবে। মুঠো খুলে বেরোতে চাইলেই ফুসে ওঠে স্ততিকারিরাই, মুখোশ ছিড়ে বেরিয়ে পড়ে তাদের আসল আদল।
নারী এই মুখোশগুলো চেনে না। নারী এই মুখোশগুলোকে বার বার প্রকৃত মুখ বলে ভুল করে। কারও ছায়ায় নারী নিজেকে নিরাপদ ভেবে ভুল করে। নারী ভুলে যায় পুরুষ কোনও বৃক্ষ নয়, যে কেবল ছায়াই দেবে। পুরুষের ছায়ার ছুতোয় শেকড় বাড়িয়ে নারীর রূপরস শোষণ করে, নারীর গুণগন্ধ শোষণ করে।
অনেকে বলে—আপনার লজ্জা হয় না পূর্বাভাসে লিখতে, যে পূর্বাভাস আপনাকে এমন ডোবাল। ডুবিয়েছে যে একথা অস্বীকার করি না। এ জগতে নারী হচ্ছে জীবন্ত খড়কুটো, কেউ ইচ্ছে করলে তাকে ডোবাতে পারে, ইচ্ছে করলে ভাসাতেও পারে। আজ তাকে এ ডোবাবে, কাল ও ডোবাবে, কেউ আবার করুণা করে একদিন তাকে হঠাৎ ভাসাবে। নারী তো নিজের নিয়ন্ত্রক নয়। ডুবে-ভেসে তাকে পার করতে হয় জলজ জীবন। হ্যাঁ লজ্জা হয় আমার, তবে নিজের জন্য নয়, লজ্জা হয় ওদের জন্য যারা যখন খুশি নারীকে ডোবায়-ভাসায়, মূলত নারীকেই। লজ্জা হয় ওই প্রগতিবাদিদের জন্য, যারা সামাজিক শৃঙ্খল ছিড়ে বেরিয়ে আসা প্রগতির পক্ষের নারীকেই পুনরায় পণ্য করে তোলে, লজ্জা হয় ওদের জন্য, যারা নিজেরাও একবার নিজেদের কৃতকর্মে লজ্জিত হয় না।
