আমার স্বাধীনতা ছুঁতে পারে এমন সাহস আমি কারও দেখি না। আমাকে ভালবাসবার দুঃসাহস যেন কোনও কাপুরুষের না হয়। বারবার কেবল নিজের কথায় ফিরে যাচ্ছি। ফিরে যাবার একেবারে যে কারণ নেই তা নয়। কারণ আমি একজন নারী। আমি নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের বোধ ও বিশ্বাস থেকে সকল নারীকে স্পর্শ করি। যেন প্রতিটি নারী প্রচণ্ড বেঁচে থাকে। যেন বেঁচে থাকবার যোগ্য জল-হাওয়ার এতটুকু কোথাও অভাব না হয়।
আর যদি হয়ই, তবে আর বেঁচে থাকা কেন, অধোমুখে বেঁচে থাকা কী এমন লোভনীয় জিনিস যে নারী তবুও নিলজের মতন বাঁচে!
আমার বাবা মেডিকেল কলেজের ক্লাসে পড়াতেন অপিয়াম খেলে ডেথ খুব পিসফুল হয়। চোখ বুজলেই আমার বাবার সেই কণ্ঠস্বর কানের কাছে শুনি অপিয়াম ইজ দ্য কজ অফ পিসফুল ডেথ আমার বাবা খুব ভাল শিক্ষক ছিলেন। তার ছাত্র-ছাত্রীদের তিনি এইটুকু বুঝিয়েছিলেন যে অপিয়াম খেলে মনে হয় মেঘের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছি, সামনে অনন্ত নীল আকাশ।
হঠাৎ হঠাৎ আমার ভেতর এরকম মৃত্যু-বাসনা ঘটে, তবে একথা সত্য নয় যে কুচক্রীদের গালে চড় কষাবার শক্তি আমার কব্জিতে কিছু কম, কিছু কম নয় আমার মত আরও নারীরও, কেবল একবার রুখে দাঁড়ালেই হয়। আমি যদি দাঁড়াতে পারি, দেশের আর সকল নারী কেন দাঁড়াবে না?
৫১. ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ
তসলিমা নাসরিন মরে গিয়েছিল। হ্যাঁ, মরেই গিয়েছিল সে। এখন বেঁচে উঠেছে। এখন সে ফুসফুস পূর্ণ করে নিতে পারছে নির্মল বাতাস। এখন সে ঘ্ৰাণ নিতে পারছে সবুজের, এখন সে ভিজতে পারছে রোদে, জলে, পূর্ণিমায়। সে দেখেছে মৃত্যু কত ভয়ঙ্কর, কত কুৎসিত। সে দেখেছে মৃত্যু কত বীভৎস, কত কদাকার। যে মানুষ একবার মরণ থেকে উঠে আসে, সে জানে বেঁচে থাকা কী সুন্দর, বেঁচে থাকা কী ভীষণ আনন্দের।
আমি বেঁচে আছি। ফুটপাতে টায়ার জ্বালিয়ে ভাত ফুটোয় যে অর্ধনগ্ন নারী, তাকেও বলি বেঁচে থেক। মুখে ক্ষো পাউডার মেখে পার্কের বেঞ্চে বসে থাকা উৎসুক রমণীকে বলি বেঁচে থেক। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের অলস্কৃত দুঃখিতাকে বলি বেঁচে থেক। মধ্যরাতে ঘরে ফেরা পাড় মাতালের অনঙ্গ বধূকে বলি বেঁচে থেক। বেঁচে থাক নারী, নারী তুমি বেঁচে ওঠ। প্রচণ্ড বেঁচে ওঠ ।
ওদের কথা ভেব না। ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ। ওরা তোমার বিকেলের চায়ে গোপনে বিষ মিশিয়ে দেবে। ওরা কৃষ্ণপক্ষ রাতে তোমার গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেবে আমগাছের ডালে, ঘরের সিলিং ফ্যানে, কড়ি বরগা কাঠে, ওরা পাল বেঁধে তোমাকে ধর্ষণ করবে উপযুপরি, ওরা কাচপুর ব্রিজের কাছে তোমার বুকে ছুরি বসাবে, ওরা ধাবমান ট্রেনের নিচে তোমাকে ধাক্কা দেবে, ওরা তোমার কণ্ঠদেশ চিরে দেবে ধারালো রেডে, ওরা তোমার সারা গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বেলে দেবে। ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ।
ওরা জেরুজালেমে, হিমালয়ে, হেরা পর্বতে বসে ধর্ম রচনা করেছে। এই ধর্মকে ওরা পবিত্র ঘোষণা করেছে। এই পবিত্রতার দোহাই দিয়ে ওরা তোমাকে পাকে ফেলছে। ওরা তোমাকে পায়ের নিচে স্থান দিচ্ছে, ওরা তোমাকে রন্ধনশালায় পাঠাচ্ছে, ওরা তোমাকে সাজসজ্জা করাচ্ছে, ওরা তোমাকে শয্যায় ওঠাচ্ছে, শয্যা থেকে যখন ইচ্ছে নামাচ্ছে। ওরা তোমাকে আবৃত করছে, প্রয়োজনে অনাবৃত করছে। ওরা তোমাকে পদাঘাত করছে, পরিহার করছে। ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ।
নারী তুমি বেঁচে ওঠ। নিঃশ্বাসে নাও অমল হওয়া। এই আকাশ তোমার, আকাশের সব নক্ষত্র তোমার। এই ঝাউপাতা তোমার, এই নদী, কাশবন, অরণ্য তোমার, এই মেঘপুঞ্জ, এই জল-হাওয়া তোমার। এই মাটি, এই ঘাস, ঘাসফুল, পাখি, এই সমুদ্র তোমার। ওরা তোমার কেউ নয়, ওরা পুরুষ। ওরা তোমাকে গ্রাস করবে, ওরা তোমাকে শত টুকরোয় ছিড়বে। ওরা তোমাকে পিষে পিষে নিশ্চিহ্ন করবে। করবে, কারণ ওরা মানুষ নয়, পুরুষ।
যে তুমি মুখ থুবড়ে পড়ে আছ নারী, তোমার সারা শরীরে পুরুষের কামড়, তোমাকে শুকতে এসে একটি কুকুরও বেদনায় নীল হবে, তোমাকে দেখতে এসে কাক শকুনও লুকিয়ে রাখবে নখর, সেই তোমাকেই যদি কেউ পুনরায় কামড় বসায় সে কোনও শূকর নয়, সে কোনও কালকেউটে নয়, সে পুরুষ। তুমি উঠে দাঁড়াও নারী। মেরুদণ্ড সোজা করে একবার দাঁড়াও। তুমি হাঁটো। এই পথ তোমার। এই মাঠ তোমার। এই শস্যখেত তোমার, আলপথ তোমার। দিগন্ত অদি যতদূর দেখ তুমি, সব তোমার।
আমি মৃত্যু দেখেছি। আমি আগুন দেখেছি। সাপের ছোবল দেখেছি। আমি অন্ধকার দেখেছি। খাদ দেখেছি, ফাঁদ দেখেছি। আমি দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ সমৃদ্ধ জীবনের দিকে। আমি দেখতে দেখতে পার হচ্ছি রেলসেতু, পার হচ্ছি কাচপুর ব্রিজ, আমতলা, পার হচ্ছি ঘোর অন্ধকার। আমি নারী বলে আজ আমার অহঙ্কার হয়। আমি নারী বলে আমার রক্তের প্রতি কণাকে আমি শুদ্ধ বলে ভাবি, নারী বলে শরীরের প্রতি লোমকূপকে পবিত্র বলে ভাবি, নারী বলে আমার স্নায়ুতন্ত্রকে সৎ ও সরল বলে ভাবি।
তুমি যদি নারী হও, তুমি এইভাবে মৃত্যুকে অতিক্রম করে বেঁচে ওঠ। ওরা তোমাকে সতীত্ব শেখাবে, ওরা তোমাকে চিতায় ওঠাবে, ওরা তোমাকে নারীত্ব বোঝাবে, ওরা তোমাকে মাতৃত্বের মাহাত্ম্য বর্ণনা করবে। এইসব ভুল শিক্ষা, এইসব পাপ, এইসব পাতা ফাঁদে একবার পা দিলেই ওরা তোমাকে চুমু খাবে, ওরা তোমাকে পাজাকোলা করে ধী ধা নৃত্য করবে, ওরা তোমাকে চার দেয়াল দেবে, সোনার শেকল দেবে, ওরা তোমাকে পোষা টিয়ার খাচায় যেমন আহার দেওয়া হয়, তেমন আহার দেবে। তুমি যদি মানুষ হও শেকল ছিড়ে একবার দাঁড়াও। দুহাতে শেকল ছেড়, এই হাত তোমার। দুপায়ে দৌড়ে যাও, এই পা তোমার। দু’চোখে জীবন দেখ, এই চোখ তোমার। তুমি ঠা ঠা করে হাস, তোমার ঠোঁট, চোখ, গ্রীবা তোমার। তুমি আদ্যন্ত তোমার। তুমি আমূল তোমার।
