আমাকে কেউ সম্মান দেবে কি না দেবে সে আমার ভাববার বিষয় নয়। এই সমাজ-প্রদত্ত ঠুনকো সম্মানের জন্য যদি আমি প্রাণ পেতে বসে থাকি—সে আমারই ক্ষতি। এ শুধু আমারই ক্ষতি নয়, সকল নারীর ক্ষতি—যে নারী দাঁড়ায়, যে নারী পথ হাটে, সিড়ি ভাঙে, যে নারী সত্য ও সাম্যের পক্ষে স্পষ্ট বাক্য উচ্চারণ করে। এ শুধু আমার ক্ষতিই নয়, সকল নারীর ক্ষতি।
নারীর জন্য যে সম্মান রক্ষিত থাকে, তা কথিত ওই মাতৃত্বের সন্মান, বার্ধক্যের সন্মান, পুরোমাত্রায় সামাজিক রীতিমাফিক নারীত্ব অর্জন করবার সম্মান, সৌন্দর্যের সম্মান। এছাড়া নারীকে অন্য সম্মান দিতে মানুষের কাপণ্য হয়, কাপণ্য হয় কারণ অভ্যেস নেই, রীতি নেই, প্রচলন নেই। ওদের আমি দোষ দিই না। ওরা ওদের পিতাকে দেখেছে, পিতার পিতা তস্য পিতাকে দেখেছে। ওদের রক্তে, ওদের হাড়ে-মজ্জায় মিশে আছে পূর্বপুরুষের সংক্রামক অসুখ, যে অসুখে অন্ধ হয়ে ওরা নারীকে মানুষ বলে দেখে না, যে অসুখে স্নায়ুবিকৃতি ঘটিয়ে ওরা নারীকে ‘মানুষ’ বলে চেনে না। ওদের আর দোষ দেব কী?
৫৩. সূর্যদীঘল বাড়ির জয়গুন
আপনাকে আমি ডলি বলেই ডাকছি। ডলি ইব্রাহিম নয়, ডলি আনোয়ার নয়, স্রেফ ডলি। আপনার সঙ্গে আমার কখনও আলাপ ছিল না, কিছু মানুষ আছে ওদের সঙ্গে আলাপের কোনও দরকার হয় না, বুকের মধ্যে এমনি ওরা অনুভূত হয়। স্মিতা পাতিলের সঙ্গে আমার কোনও আলাপ ছিল না, অথচ স্মিতা মারা গেলে এত দীর্ঘদিন আমি বিষণ্ণ ছিলাম যে আমার কোনও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মারা গেলেও এত বিষগ্নতা আমাকে গ্রাস করত বলে মনে হয় না।
পত্রিকায় আপনার ‘পারিবারিক অশান্তি’র কথা লেখা হয়েছে। পত্রিকায় নানারকম কথাই লেখা হয়। আমি সরাসরি অথবা কোনও বিশ্বস্ত সূত্রে আপনার পারিবারিক কোনও সুখ বা অসুখ সম্পর্কে অবগত নই। যদি পত্রিকার কথাই সত্য বলে মেনে নিই, তবে সত্য এই যে আপনি গত সোমবার ডাকে আসা একটি রেজিস্টার্ড চিঠি গ্রহণ করেননি, কারণ আপনি বেশ বুঝতে পেরেছেন ওটি আপনার স্বামীর তালাকনামা। আপনার স্বামী একজন সফল ব্যবসায়ী কি একজন ডাকসাইটে প্রকৌশলী কি প্রখ্যাত আলোকচিত্রী সে আমার আলোচনার বিষয় নয়। আমার বিষয় আপনি । আপনি ডলি, আপনি শিল্পের একটি শাখায় ঈর্ষণীয় কাজ করেছেন, আপনার প্রতিভাকে সম্মান করব না এত স্পর্ধা আমার নেই। অথচ এই স্পর্ধা আপনার নিজেরই হল, নিজের প্রতিভাকে আপনি নিজেই অসম্মান করলেন। প্রতিভার চেয়ে পরিবার যখন বড় হয়ে ওঠে, প্রতিভার চেয়ে তালাকনামা যখন মুখ্য হয়ে ওঠে তখন হতভাগ্য প্রতিভাবানের জন্য দুঃখ করা ছাড়া আর উপায় থাকে না।
আপনার লজ্জা হল না ডলি, কীটনাশক ওষুধ গলায় ঢালতে? ছিঃ! ডলি ছি! আমি সকল নারীর পক্ষ থেকে আপনাকে ধিক্কার দিচ্ছি। ছি! আপনার স্বামী ঘর থেকে তার জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেছেন, আপনাকে তালাকনামা পাঠিয়েছেন। তাই এত শোক আপনার, এত? শোকে আপনার আত্মহত্যা করতে হয়?
আপনাদের সম্পর্ক ভাল যাচ্ছিল না, তাতে কি? মানুষ নানা সম্পর্কের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই এগোয়। মানুষ এক স্রোতস্বিনী নদীর মত, সম্পর্ক গড়বে ভাঙবে, নদীর পাড় ভাঙার মত। এত যে ভাঙে নদী, তবু কি থেমে থাকে? মানুষ তো স্থবির কোনও জলাশয় নয় ডলি যে কারও আঘাত এতই তাকে শোকাচ্ছন্ন করবে যে সে ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগোবে! মানুষ তো কারও সম্পদ নয়, সম্পত্তি নয়—কারও অভাবে তার অযত্ন হবার কথা নয়। মানুষ তো কারও ব্যক্তিগত বাগান নয় যে কারও পরিচর্য ছাড়া সে আগাছাপূর্ণ এক অদ্ভূত অরণ্যে পরিণত হবে।
আপনি নিজেকে এত তুচ্ছ, এত নিকৃষ্ট, এত অকিঞ্চিৎকর কিছু ভাবতেন কেন, জীবনে দু-একটি ব্যর্থতা ছিল বলে? সাফল্যও কি আপনার কিছু কম ছিল ডলি?
দুঃখ পেয়েছেন জানি। দুঃখ কে না পায়? আপনার মত শিক্ষিত, প্রতিভাবান মেয়ে যখন এইসব জাগতিক দুঃখে কাতর হয় তখন দুঃখ জিনিসটি এত শক্তিমান হয়ে ওঠে যে সাধারণ মানুষেরাও দুঃখকে সন্ত্রম করতে বাধ্য হয়। এ কি অন্যায় নয় ডলি? এ কি অন্যায় নয় একটি তুচ্ছ তালাকনামার কাছে আপনার মূল্যবান জীবন বলি দেওয়া? এ কি অন্যায় নয় ডলি এইসব নিতান্তই ব্যক্তিগত অনুভূতির কাছে পরাজিত হওয়া?
আত্মহত্যা করে কী লাভ হয়েছে আপনার? কি ক্ষতি হত আত্মহত্যা না করলে? আপনার বেঁচে থাকা খুব দুর্বিষহ হত তাই? মানুষ যে এই ঘরে ঘরে সংসার সাজিয়ে বেঁচে থাকে, খুব কি সহনীয় জীবন তাদের? তবে একলা জীবন কি এমন দুঃসহ জীবন যে যাপন করা যায় না? সমাজকে ভয় পান? এই নষ্ট সমাজের মুখে থুথু যদি আপনি দিতে না পারেন, আপনি সূর্যদীঘল বাড়ির জয়গুন চরিত্রের সম্মানিত অভিনেত্রী, তবে কে পারবে? কী লাভ হল আত্মহত্যা করে? জীবন তো আপনার আর ঘুরে ফিরে আসবে না যে চমৎকার একটি চরিত্রে আবার অভিনয় করে আপনি তৃপ্ত হবেন? একটিই মাত্র জীবন মানুষের, ফুটপাতের নুলো ভিখিরিও চায় বেঁচে থাকতে, ক্যান্সারে মরো-মরো রোগীরও বেঁচে থাকবার কি আকুলতা! অথচ একটি সুস্থ সুন্দর জীবনকে আপনি নিজের হাতে হত্যা করলেন? আপনার জন্য আমার বড় রাগ হয় ডলি ।
আপনি নারী হয়ে জন্মেছেন। নারীকে তার জন্মের প্রায়শ্চিত্ত এভাবেই করতে হয়, এভাবেই, যে, তাকে পেরোতে হবে দীর্ঘ বাশের সাকো, পেরোতে হবে এবড়োখেবড়ো পথ, কাদাজল, পেরোতে হবে গহন অরণ্য কিংবা পর্বত। নারীর পথ কখনও মসৃণ নয়। এই অমসৃণ পথ আপনাকে এত কেন আক্রান্ত করবে, যেখানে আমরা, বাকি নারীরা এই অমসৃণতায় অভ্যস্ত, গতিময় এবং প্রাণবান?
