আমার সঙ্গে অতিথিরা যখন নিজ দায়িত্বে পরিচিত হতে চাইলেন সকলেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি মিসেস?’ ওঁরা যেমন নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন এভাবে যে আমি মিসেস আলম, আমি মিসেস মহিউদ্দিন, আমি মিসেস সাদেক—তেমন মিসেস জাতীয় কোনও পরিচয় না দিয়ে আমি বললাম, আমার নাম নাসরিন । ওঁরা কিছুটা বিস্মিত হলেন এবং কিছুটা মৰ্মাহতও বোধ হয়।
ফারুক, আমানুল্লাহ, সফিউদ্দিনের বিত্তের ওপর ভেসে বেড়ানো এই দ্বিপদী জীবগুলো গা ভর্তি প্রদর্শন করার জন্য শাড়ি এবং শাড়ির আঁচলকে গা থেকে প্রায় ফেলে দিতে পারলেই যেন ওঁরা বাঁচেন ।
কেন এই বিকৃতি? কেন ‘মিসেস’ শব্দের কালিতে নিজের নামকে ওঁরা মুছে ফেলেন? আর অ্যাকাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে অঢেল বিত্ত মিশিয়ে এমন এক উদ্ভট সংস্কৃতি তৈরি করেন যা ঠিক বাঙালির নয়, আবার ইংরেজেরও নয়। বাংলা বলতে গেলে আমি লক্ষ্য করেছি ওঁদের জিহ্বা আচমকা ভারি হয়ে যায় এবং স্বরধ্বনির সঙ্গে মোটেও সহযোগিতা করে না। ওঁরা কেউ নিজের নামে পরিচিত নন। ওঁরা স্বামীর সঙ্গী হিসেবে দেশে অবস্থান করেন এবং বিদেশ ভ্রমণ করেন। ওঁরা নিজ নিজ ঘরের পার্টিতে একটি পৃথক সংস্কৃতি লালন করেন, ওঁরা হাই হ্যালো বলে এর ওঁর গায়ে গড়িয়ে পড়েন। ওঁরা শরীরকে সবচেয়ে বড় সম্পদ বলে মনে করেন বলে শরীরকেও রঙে ও রেখায় এমন প্রকট উপস্থিত করেন যেন সকলে শরীরের তারিফ করেন। ওঁরা অনর্গল ঐর ওঁর প্রতি অশ্লীল বাক্য নিক্ষেপ করে অন্তরঙ্গতা প্রকাশ করেন।
একসময় আমার চোখও ক্লান্ত হয়, আমার শ্রবণযন্ত্রও বিরক্ত হয়। আমি হঠাৎ ঘর ভর্তি ওই অসুস্থ মানুষগুলোকে চমকে দিয়ে বলি আমি যাচ্ছি। আমি যাচ্ছি বলে কারও কোনও উদ্বেগ নেই। কারণ আমার গা ভর্তি অলংকার নেই, বাংলায় কথা বলতে আমার জিহা আড়ষ্ট হয় না, আমার গায়ে আঁটসাঁট পোশাক নেই, আমি কোনও মিসেস নামে পরিচিত নই, আমার গল্পে আজ ইউরোপ কাল আমেরিকার গন্ধ নেই। আমি চলে আসতে বাধ্য হই কারণ এই মেয়েরা যাঁরা নিজেদের খুব আধুনিক বলে দাবি করেন, স্বামীর ইন্ডাস্ট্রিগুলোর কাগজপত্রে পরিচালক হিসেবে যাঁরা বহাল আছেন, যারা অন্য পুরুষকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়াকেই নারী স্বাধীনতা বলেই ভাবেন হয়ত—ওঁদের গা থেকে ভুর ভুর করে টাকার গন্ধ বেরিয়ে ঘরকে এত ঠেসে ধরেছিল যে আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
এই নির্বোধ মেয়েরা কঠিন পানীয়ের গ্লাস হাতে নিয়ে শরীর দুলিয়ে বিত্ত এবং বৈভবের গল্প বলেন। লোকে ওঁদের শিক্ষিত এবং সন্ত্রান্ত বলে জানে। আর আমি ওই অন্ধকারে পড়ে থাকা অশিক্ষিত মেয়েদের বিকৃত সভ্যতার গালে দুটো চড় কষাতে চাই। জানি ওঁরা সভ্যতার শিকার, ওঁরা পুরুষ তৈরি সমাজের নিয়মে আক্রান্ত নিরীহ প্রাণী মাত্র।
মিসেস নামের আড়ালে আমি নাজমা, শাহানা, ডালিয়া, চিত্রা, নিপা, শিখা, ফেরদৌসী, নুপুর, কুসুম নামের মানুষগুলোকে অন্তরে অনুভব করি। ওঁরা কি ইচ্ছে করলেই পারেন না নিজ নামে পরিচিত হতে, ওঁরা কি হীরে সোনার কাছে নিজেকে বিক্রি না করে, নিজেকে এমন ফাঁপা এবং অন্তঃসারশূন্য আনন্দদায়িনী শরীর না করে একবার মানুষ করতে পারেন না, পূর্ণাঙ্গ এবং সম্পূর্ণ মানুষ—যে মানুষ এক দাঁড়াতে পারে, একা এক ব্যক্তি সুস্থ মেরুদণ্ড নিয়ে এমন যে ইবসেনের মত বলা যায়–The strongest man in the world is the man who stands most alone.
একটি দরিদ্র দেশে বিত্ত নিয়ে যে ব্যভিচার চলে গুটিকয় সংসারে, তা দেখবার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে। গুলশান থেকে ফিরে আসবার পথে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পঙ্গুত্বের কথা ভাবি, এবং কিলবিল করে হেসে ওঠা ওই পঙ্গু নারীদের কথা ভেবে গায়ে কঁকিয়ে ওঠে তীব্র শোক। এই দুর্ভাগা দেশ এবং দেশের দুর্ভাগা নারীর জন্য শোকে ও সন্তাপে আমার মাথা নুয়ে আসে।
৪৪. ভিন্ন এক সমাজে নারীরা
২৮-১১-৯০
–গত রাতে বি-বি-সি কী বলেছে?
—আমি ঠিক জানি না। দাঁড়া, কামালকে জিজ্ঞেস করি।
–কেন, খবরের সময় কোথায় ছিলি?
—কাজের কি শেষ আছে, সামনে সুহৃদের পরীক্ষা।
—তোদের বাড়ির কাছে দুটো ছেলে গুলি খেয়েছে শুনলাম!
–কী জানি, কামাল জানে বোধহয়।
–গুলির শব্দ পাসনি?
—ঠিক খেয়াল করিনি। তবে গতকাল না পরশু বোধহয় খুব শব্দ হচ্ছিল।
–কিসের শব্দ? বন্দুক, পিস্তল, ককটেল, পটকা? কিসের?
—আমার ভাসুর বলছিলেন…
—কি বলছিলেন?
–ঠিক মনে নেই।
—কারা গুলি করেছে? পুলিশ না কি সরকারি সন্ত্রাস বাহিনী?
–তাও জানি না।
–তুই জানিস কী বকুল?
–দেখ এসব আমি খবর রাখব কখন? আমার সংসার আছে না?
–সংসার থাকলে জানা যায় না তোর ঘরের কাছে কোন দুটো ছেলে মরে গেল, কারা মরল, কেন মরল? কোথায় গুলি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, দেশে কারফিউ কেন?
বকুল, আমার বান্ধবী। বকুলের মেধা ও মনন তার স্বামী কামালের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। দেশের রাজনীতি-অর্থনীতির খবর রাখবার দায়িত্ব কামালের। বকুলের নয়। বকুল ঘর গোছায়, বকুল ছেলেকে স্কুলে নেয়, বকুলের ছেলের পরীক্ষা সামনে। বকুল তার ছেলেকে ইংরেজি রাইম মুখস্থ করায়। বকুলের বাড়ির পাশ দিয়ে তখন মিছিল যায়, ছাত্রদের মিছিল। সেই মিছিলে গুলি হয়। বকুল তখন পায়েস রান্না করে। বকুল তখন স্বাদ বাড়াবার জন্য পায়েসে কিছু এলাচ ও কিসমিস দেয়।
