পুরুষেরা নারীর এক শরীরে আরও বহু কিছুর ধারণ দেখতে চায়। স্ত্রীকে মাতারূপে ভগ্নীরূপে, প্রিয়ারূপে দেখলে পুরুষের বড় সুখ হয়। একের ভেতরে তিনের বড় কাঙাল তারা। তাদের খুব সাধ—তারা যখন ঘরে ফিরবে—স্ত্রীরা যেন সুস্বাদু খাবার রান্না করে নিজেরা না খেয়ে মায়ের মত অপেক্ষা করে। বড় বোনের মত যেন তারা জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখে, কাপড়চোপড় কেচে রাখে। প্রেমিকার মত যেন তারা বিছানায় মেলে ধরে অনিন্দ সুন্দর দেহ।
পুরুষেরা ঘরের বিভিন্ন কাজে নিজেদর সুবিধা অনুযায়ী স্ত্রীকে বিভিন্ন রূপে পেতে আগ্রহী। স্ত্রীকে বিভিন্ন অভিনয় করিয়ে তারা বাহবা দিচ্ছে, তালি দিচ্ছে। যত বেশি বহুমাত্রিক অভিনয়ে স্ত্রীরা পারদর্শি হয়, পুরুষের লাভ তত, আনন্দ তত শরীর এবং মনের।
বন্ধন কি সেই থেকে শুরু, গ্রীষ্মের মধ্যাহ্নে দাঁড়িয়ে তেরো বছর বয়সের মেয়েরা যখন জামা খুলে ফেলতে পারে না? প্রাকৃতিক বিভেদ ছাড়া নারী ও পুরুষে আসলে কোনও বিভেদ নেই। আর প্রাকৃতিক বিভেদই—এই সমাজের সবচেয়ে বড় পুঁজি। এই পুঁজি খাটিয়ে তারা ব্যবসা করছে, মুনাফা লুটছে।
যে মাটিকে মানুষ পায়ে পিষে মারে, খোদাই করে, খুবলে তোলে—সেই মাটির নাম দিয়েছে জননী। মাটিকে নারীর মত ভাবা হয়, যেহেতু সে ধারণ করে, যেহেতু সে নিষ্পেষিত হতে—যেহেতু সে কর্তিত, বিদীর্ণ ও চূর্ণ হতে দ্বিধা করে না।
নারীকে এমন এক খেলনা বানানো হয় যে, চাবি দিলেই পুরুষের বেষ্টনির মধ্যে একবার সে ঢোল বাজাবে, একবার বাশি। মূলত পুরুষকে সে স্বস্তি দেবে, একই সঙ্গে রকমারি আনন্দ।
৪২. পৌরুষিক অত্যাচার
১. ওরা আমাদের বাড়িতে বেলপাতা নিতে আসত পুজোর জন্য। ওদের লক্ষ্মীপুজোয় খেতে গিয়েছি তিলের নাড়ু, নারকেলের বরফি। খুব ভোরে ওরা ফুলের ঝুড়ি ভরে নিয়ে গেছে আমাদের লাল মাধবীলতা। দুর্গোৎসবে আমরাও দল বেঁধে সন্ধেয় বেরিয়েছি পুজো দেখতে। বিসর্জনের রাতে দেবীকে আরতি দিয়েছি। ওরা আমাদের ঈদের দুপুরে পোলাও কোর্মা খেয়েছে। কই, কারও কোনও অসন্তোষ তো দেখিনি।
মানিকগঞ্জে কালিগঙ্গার ধারে একবার বেড়াতে গিয়েছিলাম। স্কুলের মাঠে সরস্বতীর পূজোমণ্ডপ। ওই স্কুলে দল বেঁধে মুসলমান ছেলেরা পড়তে আসে। কই, কেউ তো ঢ়িল ছুড়ে সরস্বতীর কপাল ফুটো করেনি।
ভারতের অযোধ্যায় মসজিদ নিয়ে গণ্ডগোল হয়, আর এদেশে মুসলমান নামের কাফের নিরীহ হিন্দুদের অবলীলায় জবাই করে, দোকানপাট ঘর-বাড়ি লুঠ করে। আমার বাড়ির পাশের মন্দিরগুলো গুড়ো হয়ে গেছে, মন্দিরের একটি ভাঙা টুকরো কুড়িয়ে এনেছি—দেখে আমার মা আঁতকে উঠেছেন। তিনি বুঝতে পারেননি এটি মসজিদ না মন্দিরের টুকরো।
(ধর্মের দালান কোঠা যদি মানুষে মানুষে ভালবাসা নষ্ট করে তবে এই পৃথিবী থেকে ধ্বংস হয়ে যাক মন্দির, মসজিদ, গির্জা ও প্যাগোডার সকল অস্তিত্ব। ইট-সুরকির চেয়ে মানুষ বড়। ইট-সুরকির চেয়ে ভালবাসা বড়।)
২. চার-পাঁচজন পুরুষের একের পর এক একটি মেয়েকে ধর্ষণ করবার ঘটনাকে লোকে ‘পাশবিক অত্যাচার’ বলে। আমি এই ক্ষেত্রে পাশবিক শব্দটিতে বড় আপত্তি করি। পশুর মত আচরণকে পাশবিক বলা হয়। কিন্তু আমি নিশ্চিত, চার পশু একত্র হয়ে যত নিচেই নামুক, এত নিচে নামে না—যত নিচে পুরুষেরা নামে। তাই এ ধরনের অত্যাচারকে ‘পৌরুষিক অত্যাচার’ বললে অত্যাচারের নির্মমতা ভাল আন্দাজ করা যায়।
৩. তৃতীয় বিশ্বে পিতা ও স্বামীর উত্তরাধিকার ছাড়া নারীরা রাজনীতির নেতা হতে পারে না। নারী, সে যদি মানুষ হয়, সে যদি শক্তিমান হয়, তবে কোনও উত্তরাধিকার ছাড়া সে রাজনীতি করুক, আর সেই রাজনীতি নারীকে স্বতন্ত্র করুন, অন্যের জনপ্রিয়তার লেজ ধরে তৃতীয় বিশ্বের নারী আর এগোবে কতদূর? এবার সময় এসেছে থামার। নারী নিজ কণ্ঠে তুলে নিক নিজের শ্লোগান, নারী নিজ হাত মুষ্টিবদ্ধ করুক, তর্জনী যদি তোলে একবার নিজস্ব তর্জনী তুলুক।
৪৩. উচ্চবিত্ত মিসেসদের জীবনযাপন
আমি মধ্যবিত্ত সংসারে মানুষ। উচ্চবিত্তের জীবনযাপন খুব কম দেখেছি। সেদিন আমার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য কি না জানি না এক উচ্চবিত্তের বাড়িতে আমাকে নিমন্ত্রণ করা হয়। বাড়ি গুলশান। ভদ্রলোক এককালে মন্ত্রী ছিলেন, এখন বাণিজ্য করছেন; ভদ্রমহিলা একটি কোম্পানির পরিচালক জাতীয় কিছু। ওঁরা আমাকে প্রথম যে ঘরে নিয়ে বসলেন, ওটি মদ খাবার ঘর। আমাকে জিজ্ঞেস করা হল আমি কি খাব অর্থাৎ কোন নামের মদটি আমার পছন্দ। আমি কোমল পানীয়ের কথা বলতে সম্ভবত ওঁরা আমাকে অতিথি হিসেবে খুব উঁচুদরের ভাবলেন না।
এক-এক করে অভ্যাগত আসছেন। আমরা বড় একটি হলঘরে বসলাম। যেহেতু মানুষ আমার প্রিয় এবং প্রধান বিষয়—আমি ওঁদের বাক্য এবং আচরণের প্রতি মনোযোগী হলাম। আর খুব অবাক হয়ে একটি ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, বাড়ির ভদ্রমহিলা—বয়স পঞ্চাশের কাছে আমি জানি, যদিও তার শরীর এবং সৌন্দর্য সেই বয়সকে তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে এনে দাঁড় করিয়েছে—তিনি আঁটসাঁট পরা শাড়িটি বারবারই বুকের ওপর থেকে সরিয়ে দিচ্ছিলেন, বিশেষ করে যখন পুরুষ অভ্যাগতদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখন। আমি এই আচরণের কোন অনুবাদ জানি না। কেন এই বিত্তবান ভদ্রমহিলার হাত অত্যন্ত সজাগ থাকে যেন শাড়ির আঁচল এসে তার পীনোন্নত পয়োধর আড়াল না করে? অতিথিরা পরপরের সঙ্গে ইংরেজিতে চেঁচিয়ে উঠছেন, চোখ নাক বন্ধ করে, কাঁধ শ্রাগ করে তাঁদের আবেগ প্রকাশ করছেন, এক দম্পতি আরেক দম্পতির গালে চুমু খাচ্ছেন অর্থাৎ এর স্ত্রী ওঁর স্বামীকে অথবা এর স্বামী ওঁর স্ত্রীকে। আমি ক্রমেই বিস্মিত হচ্ছিলাম এবং খুব স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম এই দম্পতিদের বিচিত্র জলসায় আমি এক একটি মানুষ বড় বেশি দৃষ্টিকটু ঠেকছি। আমার হাতে কোমল পানীয়ের গ্লাস, আমি ওঁদের দেখছি, এবং অল্প অল্প চুমুক দিচ্ছি গ্লাসে। আমার জন্য সে এক আশ্চর্য সন্ধ্যা বটে।
