২৯-১১-৯০ সকাল
—কারফিউ-এ আছ কেমন?
—আর ব’লো না, ফ্রিজ একেবারে খালি।
—তোমাদের ওদিকে কোনও ঘটনা ঘটছে?
—কী আর ঘটবে, সকালে মুদি দোকানের ঝাঁপি খুলে ডিম এনেছি দুহালি।
—বড় রাস্তায় কিছু দেখেছ? মিছিল, পুলিশ, ছাত্র ঐক্যের ছেলেপিলেদের?
–ডিম কি আমি কিনেছি যে দেখব? গেছে কাজের মেয়ে।
—বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকছ। ওখানকার পরিস্থিতি…
–সবার একই অবস্থা। আমার মত। আমাদের ফ্ল্যাটে মিসেস আলম ছাড়া আর কারও ফ্রিজে মাছ মাংস নেই।
—হলগুলোর কি অবস্থা? রোকেয়া হলে শুনেছি কিছু মেয়ে থেকে গেছে?
—হুমায়ুন দেখছি এসব নিয়ে টিচারদের সঙ্গে আলাপ করছে। আমি আলাপে ছিলাম না।
—তো, ভালই আছ, তুমি, কী বল?
—যে খারাপ এলাকায় থাকি, কখন কী হয়, দোয়া করো।
আমার এই বোনের নাম মমতা। মমতা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাকে খারাপ এলাকা বলে। মমতা অপেক্ষা করছে কারফিউ ভাঙবার। কারফিউ ভাঙলেই সে ঝুড়ি ভরে বাজার করবে। কাটাবাছা করবে, রান্না চড়াবে। দেশ রসাতলে গেলে মমতা কী করবে আমি জিজ্ঞেস করিনি। সম্ভবত তখনও সে হুমায়ুনের কাছে জিজ্ঞেস করবে তার কী করা উচিত।
২৯-১১-৯০ সন্ধে
—আপনার ছোট ভাই তো সেই মিছিলে ছিল যে মিছিলে পুলিশ গুলি ছুড়ছে?
—হ্যাঁ ভাই, কী আর বলব। এত বারণ করি এসবে যেতে। এসব মিছিল, মিটিং-এ গিয়ে কোনও লাভ আছে, বল? আববা-আম্মা কেঁদে কেটে আকুল।
–কেন?
–ছেলেটা নষ্ট হয়ে গেল!
–ছোটটি করছে কী, রত্না! ওকে দিন না!
–এই দিচ্ছি।
–কেমন আছ?
—সারাদিন ভি-সি-আর-এ ছবি দেখেছি, কী মজা!
—টি-ভি-ও তো খোলা তাই না?
—টি-ভি-অলারা কিসব খেলাফেলা দেখাচ্ছে, ছাই। কাম সেপ্টেম্বর দেখেছ? রক হাডসন কি সুইট না গো? কেন যে মরে গেল!
–সামনে তোমার পরীক্ষা না?
—আরে পরীক্ষা হবে না। পুরো ডিসেম্বর তো স্কুল বন্ধ। ইস্ আজ যদি আফজাল-সুবর্ণার একটা নাটক হত!
এরা আমার আত্মীয়। এই মেয়েরা। এরা এভাবেই বড় হয়ে উঠছে। এভাবে গা বাঁচিয়ে এবং তুচ্ছ আমোদ-আহ্লাদে।
৩০-১১-৯০
–কিগো মেয়ে, হল ত্যাগ করেছ?
—না করে উপায় আছে?
—বাড়ি যাবে কবে?
—কারফিউ ভাঙলেই আর এক মুহুর্ত দেরি নয়।
—কেন ঢাকায় থেকে যাও। মামার বাড়ি। অসুবিধা কী?
–না ভাই, দেশে যে গণ্ডগোল।
–তুমি প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের মেয়ে। তোমার গণ্ডগোলে ভয় কেন?
—কী যে বলছেন দিদি। রুমের মধ্যে আয়াতুল কুরসি পড়ে দিন কাটিয়েছি।
—মিছিলে যাওনি।
—মাথা খারাপ?
—সূর্যসেন-মোহসিন হলের ঘটনার সময় কোথায় ছিলে?
–রুমে |
–বের হওনি কেন?
–ওই যুদ্ধক্ষেত্রে?
—কেন যুদ্ধক্ষেত্রে তো ক্লাসের ছেলেরাই ছিল, তোমার বন্ধুরাই—তবে?
—যদি কিছু হত?
—‘যদি কিছু’ তো ওদের বেলায়ও ঘটতে পারত।
—ছেলেরা এদিক ওদিক দৌড়-টোর দিতে পারে।
—মেয়েদের কি হাত-পা ভাঙা?
এই মেয়ের নাম দীনা। ইউনিভার্সিটির চৌকস মেয়ে। এই মেয়ে মিছিলকে ভয় পায়। বাইরে আন্দোলন, বাইরে সংঘর্ষ, বাইরে এক-সমুদ্র বিপদের মধ্যে ডুব-সাঁতার দিচ্ছে সচেতন মানুষ, আর দেশের শিক্ষিত মেয়েরা নিজেদের বিপদ এড়াতে ঘরে বসে আয়াতুল কুরসি পড়ছে।
২.
গত ১-১২-৯০ তারিখে তিন জোটের যৌথ আহ্বান ও নির্দেশাবলি প্রচারিত হয়েছে। ওই নির্দেশাবলির এগারো নম্বরে লেখা—বীর ছাত্রসমাজ, যুবসমাজ, নারীসমাজ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, সংস্কৃতিসেবী, টি.ভি ও বেতার শিল্পী ও কলাকুশলী এবং অন্যান্য পেশাজীবী মানুষের গৃহীত সকল আন্দোলনের কর্মসূচী সফল করুন।
নারী কি সাংবাদিক নয়, চিকিৎসক নয়? নারী কি শিক্ষক হয় না? আইনজীবী হয় না? প্রকৌশলী, সংস্কৃতিসেবী, বা টি.ভি বেতারের শিল্পী নয় তারা? তবে আলাদা করে নারীসমাজ লিখবার কারণ কি? নারীকে সকল সমাজ থেকে দূরে নিক্ষেপ করবার উদ্দেশ্য কী? যদি বলি, এই পৃথক হওয়ার কারণেই নারী মিছিলে নামে না। গুলিবিদ্ধ হয় না, আন্দোলনের খবর রাখে না, নারী ভয়ে পিছু হটে, ভি.সি.আরে ছবি দেখে পার করে বিক্ষোভের উত্তপ্ত দিন।
নারী ভিন্ন এক সমাজে চিহ্নিত হবে কেন, যে সমাজ কোনও পেশাকে নয়, লিঙ্গকে চিহ্নিত করে? নারী যদি এভাবেই নিক্ষিপ্ত হয়, তবে এর চেয়ে ঢের ভাল তার আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়া।
৪৫. মিস্টার বনাম মিস এবং মিসেস
বিয়ে দুজনেরই ঘটে, নারী এবং পুরুষ, দুজনেরই কিন্তু বিবাহিতের যাবতীয় চিহ্ন নারীকেই এক বহন করতে হয়, পুরুষকে নয়। অবিবাহিত এবং বিবাহিত পুরুষের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই; নামে নেই, কাপড়-চোপড়ে নেই, চুলের ফাকে নেই, হাতের আঙুলে নেই। বিবাহিত এবং বিপত্নীক পুরুষকেও আলাদা করবার কোনও উপায় নেই। অথচ অবিবাহিত ও বিবাহিত নারীর মধ্যে বিস্তর পার্থক্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিবাহিত এবং বিধবা নারীর ক্ষেত্রেও একই ব্যবস্থা।
পাশ্চাত্যে এই নিয়মটি খুব প্রচলিত, কোনও নারী যখন কোনও পুরুষের জন্য নির্দিষ্ট হয়—নারী তার আঙুলে একটি অঙ্গুরি পরে, এবং বিবাহিত হবার পরও একটি অঙ্গুরি। নারীর হাতের অঙ্গুরিই তার বিবাহিতের চিহ্ন বহন করে। নারী তার বিবাহের সকল সংস্কার একাই এক অঙ্গ জুড়ে লালন করে। শুধু পাশ্চাত্যে নয়, প্রাচ্যেও এই অঙ্গুরি নারীর কুমারীত্ব ঘুচে যাবার চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিবাহিত, অবিবাহিত ও বিধবা নারীর সজ্জা বিভিন্ন রকম। তবে পৃথিবীর সকল দেশের সকল সম্প্রদায় পুরুষের জন্য একই রকম সজ্জা এবং সম্বোধন তৈরি করেছে। অবিবাহিত নারী তার নামের আগে মিস এবং বিবাহিত নারী মিসেস শব্দ ব্যবহার করে নিজের বৈবাহিক অবস্থার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে। কিন্তু পুরুষ তার ‘মিস্টার’ সম্বোধনটিকেই আগাগোড়া লালন করে মিস্টার সৌমেন এবং মিস্টার মিলনের মধ্যে কে বিবাহিত এবং কে বিবাহিত নয় তা নির্ণয় করবার সাধ্য আছে কারও?
