৩. সেদিন এক কবরস্থানে ঢুকতে গিয়ে দেখি সাইনবোর্ডে লেখা মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ। এতকাল জেনে এসেছি প্রবেশ নিষেধ সাধারণত গরু ছাগলের জন্য হয়। এখন দেখি মহিলাদের জন্যও। সম্ভবত জন্তু ও মহিলাদের ক্ষেত্রেই যাবতীয় নিষেধ জারি হয়।
মৃত্যুই নারীকে কবরস্থানে ঢুকবার স্বাধীনতা দিতে পারে। তবে কি এই-ই সত্য যে নারীর না মরে মুক্তি নেই?
৪. এ নিয়ে দুবার তারা আমাকে জবেহ্ করতে চেয়েছেন। বাংলাদেশের স্বনামধন্য আলেম, ইসলামী রাজনীতির নেতৃবৃন্দ ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ। একবার সালমান রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস প্রসঙ্গে লেখকের স্বাধীনতার পক্ষে বিবৃতি দেবার কারণে এবং দ্বিতীয়বার মেয়েদের পর্দাপ্রথার বিরুদ্ধে বক্তব্য প্রকাশের কারণে তারা জাতীয় দৈনিকে বিবৃতি দিয়েছেন যে আমাকে কতল করা ওয়াজিব।
এ আমি একেবারে অবিশ্বাস করি না যে, যে কোনওদিন তারা ‘আল্লাহু আকবর’ বলে আমাকে জবেহ্ করতে পারেন। না, আমি এতটুকু ভয় পাচ্ছি না। সড়ক দুর্ঘটনা হতে পারে জেনেও কি আমি সড়কে নামি না? বিদ্যুৎস্পষ্ট হয়ে মৃত্যু ঘটে বলে আমি কি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি না? করি। আমাকে এই সমাজের ভেতরই বাস করতে হবে, সমাজ আমাকে ফণা তুলে বারবার ছোবল দেবে জেনেও। আমি জানি না তাঁরা কেউ আছেন কি না যাঁদের কণ্ঠে এখনও মরচে ধরেনি, যাঁদের কলম এখনও আপসের ভাষা শেখেনি—নাকি তাঁরা আছেন, অনেকেই আছেন, কেবল আমি নারী বলে আমার পক্ষে দাঁড়াতে তাঁদের সঙ্কোচ হয়, যদিও তা সত্যের পক্ষে ।
সম্ভবত নিজেকে নিঃশব্দে কতল হতে দিয়ে আমাকে নারী-জন্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
৫. ইটালির প্রখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাসি বলেন—‘আমার ভেতরের ভ্রূণটিকে আমি বলেছি, প্রিয় শিশু জীবনটা হচ্ছে যুদ্ধ, নিরন্তর যুদ্ধ। জানতে চেয়েছি এই পুথিবীতে সে জন্ম নিতে চায় কি না। সে বলেছে, “নরকে যাও তুমি মা। আমি আর জন্ম নিচ্ছি না”।’
৩৯. নারীর শ্লীলতা
১. ‘শ্লীলতা’ শব্দের অর্থ ভদ্রতা, শিষ্টতা। ‘শ্লীলতাহানি’ শব্দের অর্থ ভদ্রতানাশ বা শিষ্টতানাশ। ‘শ্লীলতাহানি’ শব্দটি উচ্চারণ করলে যে মানুষের মুখ মনে আসে তা পুরুষ নয়—নারী। শ্লীলতাহানি পুরুষের হয় না, হয় নারীর। কারণ শিষ্টতা পুরুষের বজায় না রাখলেও চলে, নারীর যদি শিষ্টতা, শুদ্ধতা, সতীত্ব, সৌন্দর্য না থাকে তবে আর থাকে কী?
নারীর গুটিকয় মাত্র সম্পদ—এই সম্পদ আগলে না রাখলে জগতে নারী আর আগলাবে কী?
২. এক সপ্তাহে আমার বাড়ির পাশের দুই বাড়িতে ছয় বছরের দুটো শিশু ধর্ষিতা হয়েছে। ওদের অভিযোগের ধরন একই দূর আত্মীয় অথবা প্রতিবেশী বয়স্ক লোকটি (বয়স তেতাল্লিশের উপর) চকলেট মিমি দিয়ে ভুলিয়ে ফুলিয়ে বাচ্চাদের প্যান্টি খুলেছে। আমি আন্দাজ করতে পারি না, ছয় বছরের বাচ্চার শরীরে উপগমনের ইচ্ছায় ওই প্রৌঢ় শরীরগুলো কী করে উত্তপ্ত হয়।
৩. সতীত্ব, মমতা, বাৎসল্য প্রভৃতি গুণকে নারীধর্ম বলে। ‘পুরুষধর্ম’ বলতে অভিধানে কোনও শব্দ নেই। কারণ পুরুষের তো সতীত্ব রক্ষার বালাই নেই, মমতা বাৎসল্য না হলেও চলে। উদ্যম ও তেজ হলেই পুরুষত্ব টিকে থাকে। কোনও নারীর ভেতরে যদি তেজ ও উদ্যমের প্রকাশ হয় তবে তাকে ভাল গুণ না বলে বদগুণ বলা হয়। এতে এই ধারণা স্পষ্ট হয় যে নারী নরম এবং পুরুষ কঠিন প্রকৃতির। তাই নরম জাতীয় গুণগুলো নারীর জন্য ধার্য করা হয়েছে। শারীরিক পার্থক্যের কারণে গুণের কোনও হেরফের হয় না। কার কি গুণ এবং কি ধর্ম হবে তা নির্ধারণ করে সমাজের গুটিকয় পুরুষ। তারা শৌর্য-বীৰ্য ইত্যাদি প্রধান গুণগুলো নিয়ে বাকি যা অনর্থক কিছু গুণ থাকে তা নারীর ভাগে দিয়েছে।
আসলে যে ধর্মটি নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য দরকার তা কোনও নারী বা পুরুষধর্ম নয়—তা ‘মানবধর্ম’। যাদের ‘মানবধর্ম’ নেই তারাই নারী ও পুরুষের মধ্যে ধর্ম ভাগাভাগি করে।
৪. এদেশের চিকিৎসকরা সুযোগ পেলে ইরান চলে যান। আমার বেশ ক’জন চিকিৎসক বন্ধু ইরান থেকে ফিরে এসে ওখানকার গল্প বলেছেন। তাঁরা যে কথাটি সবচেয়ে বেশি বলেন তা হল ইরানী মেয়েরা পা থেকে মাথা অবধি ঢেকে রাখে বটে তবে চিকিৎসকের কাছে অসুখ দেখাতে এসে নিজে থেকেই পুরো কাপড় খুলে উলঙ্গ হয়ে শুয়ে পড়ে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে ওদের শরীরে বিশেষ কোনও অসুখ খুঁজে পান না। ওদের অসুখ আসলে মনে। চার দেওয়ালে আবদ্ধ থাকা মেয়েগুলো আসলে বেরোতে চায়, তাই অসুস্থতার ছুতোয় ওরা বেরিয়ে পড়ে–মূলত বের হওয়াই ওদের উদ্দেশ্য। এবং বিদেশি মানুষ পেলে ওরা দেশি নিয়ম ভেঙে মনের অসুখ দূর করে।
চিকিৎসকের কাছে এসেই যারা গায়ের কাপড়চোপড় খুলে ফেলে, তারা এবারের একাদশ এশিয়াডে কেবল মুখ ছাড়া আর কিছুই দেখায়নি। কালো বোরখায় আবৃত হয়ে তারা মার্চ পাস্ট করেছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল—প্রতিটি দলের নামফলক নিয়ে চীনা মেয়েরা মিনিস্কার্ট পরে হেঁটেছে। কেবল ইরানীদের বেলায়—যেহেতু মিনিস্কার্ট পরা ইসলাম-বিরুদ্ধ কাজ তাই নামফলক নিয়ে হাঁটবার জন্য তারা একটি পুরুষ বেছে নিয়েছে। অনেকে প্রশ্ন করেছে ইরানী মেয়েরা কি এশিয়াডের লম্ফ বাফ, দৌড়, সাঁতার বোরখা পরেই সারবে, না কি ইসলামকে খেলার প্রয়োজনে গা থেকে শেষ অদি নামাবে?
