অপরদিকে নিজের মেয়েকে যখন সে বিয়ে দেয়, পুরুষতন্ত্রের কাছে মেয়েকে সে অর্পণ করে, সে তখন পুরুষতন্ত্রের ধারক নয়। সে তখন নারীপক্ষ, নির্যাতিত নারীর প্রতিনিধি; তাই সে বিনত, অনুদ্ধত, শ্লীল, সংযত ও বশংবদ। ওদিকে মেয়ের শাশুড়ি আবার তারই মত দাপুটে, অপ্রসন্ন, অমর্ষপরায়ণ ও খড়গহস্ত—সে তার ছেলের বউ-এর কাছে যে চরিত্রে উপস্থিত।
তাই, নির্দ্বিধায় আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে নারী একই সঙ্গে পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক। পুরুষের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে নারীকে নারীর ওপর নির্যাতনের হাত প্রসারিত করতে হয়—একই নির্যাতন সে ভোগ করেছে, তার মেয়ে ভোগ করছে, এবং পুরুষতন্ত্র যখন তার হাতের মুঠোয়—সে আরেকজনকে ভোগ করাচ্ছে। এ হচ্ছে একটি আবর্ত। এই আবর্তের ভেতর মানুষের সঞ্চরণ। সময় এবং পরিবেশ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষতন্ত্র দ্বারা নারী নানা কায়দায় আবর্তিত হয়।
সে যখন নারী, যে নারী পুরুষতন্ত্রের ধারক কেবল তখনই সে দ্বিতীয় কোনও নারীকে নিগ্ৰহ করবার পরিবেশে পতিত হয়, সে তখন পৃথক কোন নারী-অস্তিত্ব নয়। সে তখন পুরুষতন্ত্রের নির্জলা প্রতিনিধি ছাড়া একবিন্দু অন্য কিছু নয়। সে তখন সেই নারী, যে নারী পুরুষ অধিকৃত সমাজের শোষণ ও পীড়নের শিকার এক শরীর মাংসপিণ্ড মাত্র।
২. কিছু বোকা বলে, মোল্লারা যেমন বিজ্ঞাপনে নারীর ব্যবহার পছন্দ করে না, তেমন পছন্দ করে না প্রগতিশীল নারী আন্দোলনের কর্মীরাও। অতএব দু’পক্ষের মধ্যে পার্থক্য আর কি রইল।
মৌলবাদরা বলে নারীর স্থান ঘরে, সে সর্বদা পর্দার ভেতরে থাকবে, তার বাইরে এসে বিজ্ঞাপন করা বারণ। আমার সিদ্ধান্ত মোটেও তা নয়। আমি বলি নারীকে স্বাবলম্বী হতে, বলিষ্ঠ হতে, তার ব্যক্তিত্বকে প্রধান করতে। নারীর মনোমুগ্ধকর শরীর ব্যবহার করে বাহবা পাওয়ার পক্ষপাতি আমি নই; আমি চাই সে তার রূপ নয়, গুণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হোক। আমি নিশ্চয় বিজ্ঞাপনে নারীর অংশগ্রহণ অনুমোদন করি—কিছুতেই অপ্রাসঙ্গিক, অযৌক্তিক অংশগ্রহণ নয়। কিন্তু মৌলবাদরা নারীকে উপার্জনক্ষম, স্বনির্ভর ও গতিময় দেখতে চায় না। তারা চায় বন্দিত্ব, অন্ধকারে আচ্ছন্ন সামাজিক গুহার ভেতরে তার বসবাস। তারা নারীর মুক্তি চায় না, চায় শৃঙ্খল। যেহেতু পুঁজিবাদিরা নারী-স্বাধীনতার নামে গোপনে নারীকেই পণ্য করে তোলে, নারীকে পণ্য করেই নারীকে শৃঙ্খলিত করে, নারীর কল্যাণকামিরা তাই বাজারের পণ্য বানাবার পুঁজিবাদি শৃঙ্খল থেকে নারীকে মুক্ত করতে চায়। মৌলবাদিদের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা নারীকে আলোয় আসতে দেবে না, তারা নারীকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দেবে না। তলিয়ে দেখলে পুঁজিবাদি ও মৌলবাদির অন্তর্নিহিত সাযুজ্য বেশ ধরা পড়ে। পুঁজিবাদির নারীকে যে শৃঙ্খল পরায় তা রঙচঙে, বাহারি। আর মৌলবাদিদের শৃঙ্খল সূরা-কলমা পড়া, ফুঁ দেওয়া, ফ্যাকাসে। সাযুজ্য এই কারণে যে তারা উভয়ে একটি জিনিস দিয়েই নারীর জীবন শক্ত করে বাধে—তা ওই শৃঙ্খল।
আর আমি, আমি যদি সামান্যও নারীর কল্যাণ কামনা করে থাকি—আমি কোনও শৃঙ্খল চাই না। নারী যতদিন যাবতীয় শৃঙ্খল ছিড়ে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ যেমন ইচ্ছে ভোগ করবার অধিকার অর্জন না করে, ততদিন তাবৎ শৃঙ্খলবাদিদের জন্য আমি নিক্ষেপ করব ঘৃণা, ঘৃণা এবং ঘৃণা।
৩৮. বিবাহিত মেয়েরা যেমন হয়
১. অধিকাংশ বিবাহিত মেয়ের সঙ্গে আমি পনেরো সেকেন্ডের বেশি কথা বলতে পারি না। কারণ এরা কথা বলবার শুরুতেই সাধারণত স্বামী কি খেতে এবং পরতে পছন্দ করে তা-ই শোনায়। এছাড়া এদের নিজস্ব কোনও গল্প নেই। এসব গল্প করে এরা সমাজে টিকে থাকতে চায় কারণ এরা মনে করে টিকে থাকবার মত অন্য কোনও ব্যবস্থা এদের জন্য নেই।
সুতরাং স্বামী যদি ভালবেসে দামি শাড়ি কিনে দেয় কি সোনার গহনা গড়িয়ে দেয় কি আরও ভালবেসে জমির একটি দলিল ধরিয়ে দেয় হাতে—তবে আর রক্ষে নেই। এইসব বৈষয়িক সম্মোহনের কাছে দুর্বল মেয়েরা ক্রমশ পরাজিত হয়। কেউ পরাজিত হয় খুব দ্রুত, কেউ ধীরে। আসলে সংসারের এই সুখ নামক মোহটি একটি পাতকুয়োর মত। ব্যাঙ যেমন কুয়োটিকেই বিশাল দীঘি ভেবে আনন্দে লাফায় তেমন দুটো শাড়ি আর কানে নাকে ঝোলাবার কিছু ধাতব পদার্থ পেলেই নিজের সংসার কুয়োকেই এরা বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ড ভেবে ভুল করে। মানুষ ভুলে যায় যে স্বাধীনতা মানুষের সর্বপ্রথম অধিকার। নারী তার স্বাধীনতা বিক্রি করে একটি ঘরের কাছে। যদিও মানুষ । জানে ঘর কারও জগৎ নয়, ঘর হচ্ছে বিশ্রাম এবং নিতান্ত ব্যক্তিগত কাজকর্মের জন্য মানুষের । একটি নিজস্ব আড়াল। অথচ কোনও পুরুষ যখন বিয়ে করে, স্ত্রীকে সংসার এবং শেকল দুই-ই । উপহার দেয়। আসলে পুরুষ এককভাবে তা দেয় না। দেয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ।
সংসার কারও কর্ম হতে পারে, কারও বর্মও হতে পারে কিন্তু কারও ধর্ম হতে পারে না। যারা কারও ওপর এ জাতীয় ধর্ম চাপাতে চায় তারা আর যাই হোক ধামিক তো নয়-ই প্রকৃত মানুষও নয়।
২. বিজ্ঞাপনে নারীরা ব্যবহৃত হয়। কারণ কোনও পণ্যের বিজ্ঞাপনে নারী তার আকর্ষণীয় দেহবল্লর ও সাজসজ্জা নিয়ে এমনভাবে উপস্থিত হয় যে পণ্যের চেয়ে প্রধান হয়ে ওঠে নারীই। আর সেই নারীর কারণে জনপ্রিয় হয় পণ্য। এতে ব্যবসায়িক লাভ হয় বটে কিন্তু যে নারী পণ্যের বিজ্ঞাপনের নামে পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় তার কী হয়? এদেশের যে কোনও পণ্যের বিজ্ঞাপনের নারীও এক ধরনের পণ্য। তার চোখ, ভুরু, চুল, নাক, ঠোঁটের হাসি, পীনোন্নত পয়োধর, তার সাত-পাক নৃত্যকে বাজারের পণ্যের চেয়েও বড় পণ্য হিসেবে বিচার করা হয়। এই বিজ্ঞাপনদাতা পণ্য-ব্যবসায়ীরা পণ্যের চেয়ে নারীকেই প্রধান করে তুলবার চেষ্টা চালায়। পুরুষের শেভিং-এর ব্লেড, সিগারেট, শার্টিং সুটিং, জুতো মোজা, শ্যাম্পু সাবান সব কিছুতেই অনাবশ্যক নারী এনে হাজির করা হয়। সেই নারীরা আসলে কোনও কাজ করছে না, তারা ব্যবহৃত হচ্ছে। আর এ সমাজে সম্ভবত ব্যবহৃত হওয়াই তার প্রধান কাজ।
