আমার চিকিৎসক বন্ধুরা ইরানী মেয়েদের চমৎকার শরীরের বড় প্রশংসা করেন। কড়ে আঙুলে ব্যথার কথা বলে পুরো উলঙ্গ হয়ে যাওয়া মেয়েদের গা টিপে টিপে দেখতে হয় আর কোথাও ব্যথা আছে কিনা, না হলে ওরা বড় রাগ করে। পরাধীনতা মানুষকে অসুস্থ করে, বিকৃত করে, মন এবং শরীরকে পঙ্গু করে। পরাধীন শরীরকে ওরা সুযোগ পেলেই যেখানে সেখানে স্বাধীন করতে চায়। এতে ওদের স্বাধীনতা সামান্যও অর্জন হয় না, বরং বিদেশি পুরুষের চোখের খানিকটা আরাম হয়।
৫. ঢাকা শহরে বিভিন্ন রকম চুল কাটার দোকান আছে। ফুটপাতে পিঁড়িতে বসে নাপিত চুল কাটে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দেশি বিদেশি মেয়েরা মেয়েদের চুল কাটে, চুল বাঁধে। আর কিছু আছে মাঝারি মাপের দোকান। ওতে ছেলেরা ছেলেদের চুল কাটে।
ইদানীং এইসব মধ্যবিত্ত সেলুনে কিছু মেয়ে-নাপিতের আবির্ভাব হয়েছে। অবশ্যই এটি একটি ভাল লক্ষণ—মেয়েরা কাজ করছে, উপার্জন করছে। কিন্তু একই সেলুনে কাজে সমান পারদর্শি ছেলে এবং মেয়ের পারিশ্রমিক দুরকম। ছেলে চুল কাটলে বিশ টাকা, মেয়ে কাটলে চল্লিশ টাকা। ফার্মগেটের একটি সেলুনে এই মূল্য তালিকা টাঙানো দেখলাম সেদিন। আমার প্রশ্ন—মেয়ের কেন চল্লিশ টাকা, কেন তার বেলায় বিশ টাকা বেশি?
এই দোকানগুলোয় চুল কাটার বাইরে আর একটি অলিখিত জিনিস বিক্রি হয় তা হল—নারীস্পর্শ। চুল কাটার দাম বিশ টাকা, নারীম্পর্শের দাম বিশ টাকা। মোট চল্লিশ টাকা। শেষ বিশ টাকা তার অসৎ উপার্জন। পারিশ্রমিকের পার্থক্য দেখে এই নারী শ্রমের প্রতি আমার আর শ্রদ্ধা থাকেনি।
মেয়েরা যে কাজেই নামে, যে কাজেই তারা অগ্রসর হয়—কিছু না কিছু নারীত্ব তাদের উৎসর্গ করতে হয়। কোথাও দৃষ্টি, কোথাও স্পর্শ, কোথাও কণ্ঠস্বর, কোথাও ভঙ্গিমা, কোথাও হাসি, কোথাও আহ্লাদ।
যেদিন এই সমাজ নারীর শরীর নয়—শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নয়—নারীর মেধা ও শ্রমের মূল্য দিতে শিখবে, কেবল সেদিনই নারী মানুষ বলে স্বীকৃত হবে।
৪০. চুড়ি আর সস্তার জিনিস
১. পুরুষ যদি কোনও শক্ত কাজে অপারগ হয়, তবে সেই পুরুষকে অপদস্থ করবার একটি পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়—হাতে চুড়ি পরতে বলা। এতে অপারগ পুরুষটি পুরোমাত্রায় অপদস্থ হয় এবং অপদস্থকারীরা প্রভূত আনন্দ লাভ করে।
পুরুষের মান-মর্যাদা ধুলোয় লুটোবার জন্য এই হাতে চুড়ির প্রসঙ্গটি সবচেয়ে কার্যকর। হাতে চুড়ি পরবার অর্থ সে পুরুষ নয়, যেহেতু পুরুষ নয়—সে শক্তিমান নয়, শৌর্যশালী নয়; যেহেতু সে পুরুষ নয়—সে নারী, সে নারী কারণ সে ব্যর্থ, কারণ সে দুর্বল। নারীমাত্রই অক্ষম, অসমর্থ, অপদার্থ ও অকৰ্মণ্য। তাই নারী-বেশ পুরুষকে ধিকৃত করে, কলঙ্কিত করে।
অকথ্য গালিগালাজের চেয়ে, শারীরিক নির্যাতনের চেয়ে হাতে চুড়ি পরবার কথা উচ্চারণ করাই বেশি অপমানকর। পুরুষেরা হাতে চুড়ি পরাকে অসম্মানজনক মনে করে। পুরুষেরা তিলার্ধ নারী হওয়াকেও ঘৃণা করে। তাই বীর্যবন্ত শরীরে নারীর সজ্জা পুরুষের খ্যাতি নাশ করে, পুরুষকে নিন্দিত করে। নারী হবার মত চরম লজ্জা আর কিছুতে নেই।
একবার এক ছেলেকে ভীষণ এক অপরাধের কারণে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। শাণিত বুদ্ধির কিছু ছেলে শাস্তি হিসেবে অপরাধীকে মেরে লাশ বানাবার বদলে তার গায়ে শাড়ি পরিয়ে, ঠোটে-কপালে লিপস্টিক মেখে দেওয়াকে সর্বোচ্চ শক্তি বিবেচনা করে। এতে অপমানের মাত্রা এত বেড়ে যায় যে ছেলেটি আত্মহত্যা করে। নারী-সাজ ছাড়া অন্য কোনও শাস্তিই, আমি নিশ্চিত, ওই ছেলেকে অন্তত আত্মহত্যা করাত না। নারী-রূপে এত অসম্ভ্রম, এত গ্লানি—তা সেই রূপ অঙ্গে না নিলে বোঝা দুরূহ।
কই, পুরুষের পোশাক পরলে তো নারীর সন্মান যায় না, নারী অপমানিত হয় না, আত্মহত্যা করে না। নাকি নারী অধম বলে, অকিঞ্চিৎকর বলে নারীর পোশাককে পুরুষেরা হীন ও নীচ চরিত্রের পোশাক মনে করে তাই ওই পোশাকের আবরণে তারা লজ্জিত হয়, তাই তারা মুখ লুকোয়। তাই তারা ক্লাউন হয়, লোক হাসাবার লোক হয়। নারী হওয়ার মত লজ্জা আর কোথায় আছে। নারী জন্মের মত ঘৃণ্য জন্ম শুয়োর-শকুনদেরও নয়।
প্রাচীনকালে পাপী-পুরুষদের অভিশাপ দেওয়া হত, যেন পরজন্মে তারা নারী হয়ে জন্মায়। ছাগল-ভেড়া হয়ে জন্মাবার চেয়ে নারী হয়ে জন্মানোটিই অভিশাপ হিসেবে অধিক মারাত্মক ছিল।
২. ‘মূলধারা’ নামে এদেশে একটি শিল্প-সাহিত্য বিষয়ক সাপ্তাহিকী ছিল। চলেনি। ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকবার বদলে মূলধারা এখন নারীদেহে ফিরে গেছে। চলচ্চিত্র নায়িকাদের ক খ গ অর্থাৎ তাদের চুল, চোখ, নাক, ঠোঁট নিয়ে গবেষণা, রাঁধা-বাড়া, গৃহকোণ, টেলিভিশন-তারকাদের চেহারা ছবি, সাজগোজ, নারীর বক্ষ উন্নত ও কটিদেশ সরু করবার উপদেশ বর্ষণই এখন মূলধারার মূল কাজ। এখন মূলধারার বাজার হবে রমরমা। দেশে নারী দেহের ব্যবসা যেমন ভাল, নারী দেহ সম্পর্কিত খবরা-খবরের বাণিজ্যও সমান তালে ভাল।
আমাদের পাঠক মুখরোচক খাদ্য ও দেহরোচক নারী পেলে ব্যস, আর কিছুই চায় না। তাই পাঠকের সুবিধার্থে মূলধারা তার অধঃযাত্রাকেই কবুল করেছে।
৩. লোকে বলে, নারী মুখে সাদা রঙের ক্ষো পাউডার বুলোয় আর চোখে কালো কাজল পরে। আমি বলি নারী নিজের মুখে নিজে চুনকালি মাখে। নারী নিজের হাতে নিজের গালে চুন মাখে, নিজের হাতে নিজের চোখে কালি মাখে।
