তারাই লর্ডস অব দ্য গ্যালাক্সিজ, নীহারিকাপুঞ্জের অধীশ্বর। সময়ও তাদের কাছে পৌঁছতে পারে না। তারা চাইলেই নক্ষত্রের জগতে মিশে যেতে পারে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব কিছুতে মিলিয়ে যেতে জানে। কিন্তু ঐশ্বরিক ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাদের সেই উৎসকে ভুলে যায়নি। কোনো এক বিলুপ্ত সমুদ্রের কাদায় তারা ছিল পোকার দল।
আর আজো পূর্ব পুরুষদের করে যাওয়া পরীক্ষার ফলাফল দেখতে উদগ্রীব, আজো তারা এ পরীক্ষার যত্ন নেয়।
৫২. প্রজ্বলন
কখনোই সে ফিরে আসার কথা চিন্তা করেনি, এমনকি এত অদ্ভুত মিশনেও না। যখন ডিসকভারিতে ফিরে এসেছিল তখন শিপটা উড়ন্ত লিওনভ থেকে অনেক অনেক পেছনে। খুব ধীরে ধীরে উপর-বৃহস্পতি অর্বিটের দিকে উঠছিল, বহিঃউপগ্রহগুলোর কাছাকাছি। কত শতাব্দী ধরে, যুগ যুগান্ত ধরে এর চারপাশে ধূমকেতুগুলোকে দখল করে রেখেছে গ্রহরাজ, সেগুলো শুধু বিরাট ডিমের মতো পথে ঘুরেই চলেছে, চূড়ান্ত ভাগ্যের অপেক্ষায়।
সারাটা জীবন চলে গেছে সেসব অতি পরিচিত ডেক আর করিডোরগুলোকে দেখে। যে মানুষগুলো এসব জায়গায় একটু সময়ের জন্য এসেছিল, তারা তার সব কথা শুনেছে। সে হয়ত এখনো নিরাপদ, কিন্তু এখন আর এসব ভেবে কাজ নেই। কিন্তু সেই চূড়ান্ত মুহূর্তগুলো চলে যাবার পর সে বুঝতে পারছে, তাকে যারা নিয়ন্ত্রণ করেছিল তারা তাদের মহাজাগতিক খেলার সবটাকে লুকিয়ে রাখতে পারেনি।
তারা এখনো অসীম ক্ষমতার অসীম বিরক্তির দেখা পায়নি। এখনো সব পরীক্ষা সফল হয় না। যদি হতো, তাহলে সেই ঐশ্বরিক বিরক্তি শুরু হয়ে যেত। সারাটা জাহান জুড়ে ছড়িয়ে আছে ব্যর্থতার অসংখ্য প্রমাণ। কিছু কিছু এত বেশি ব্যর্থ যে সেগুলো মহাজাগতিক ভিতের পেছনে হারিয়ে গেছে। আর বাকিগুলোর কোনো কোনোটা এত বেশি অদ্ভুত যে হাজারো সভ্যতার মহাকাশবিজ্ঞানী আর জ্যোতির্বিদদের ভয়-বিস্ময়ে ডুবিয়ে রেখেছে।
আর মাত্র কয়েক মিনিট। তারপরই সিদ্ধান্ত হবে। সেই মুহূর্তের আগের মিনিটগুলোয় সে আবারো হালের সাথে একা পড়ে গেল।
আগের অস্তিত্বে তারা শুধু বিরক্তিকর ধীর শব্দ দিয়ে যোগাযোগ করতে পারত। কোনো কিবোর্ডে সেগুলো লেখা হত, নাহলে বড়জোর মাইক্রোফোন নিয়ে বলা। আর এখন তাদের চিন্তা মিশে যাচ্ছে লাখ লাখ গুণ দ্রুত। আলোর গতিতে।
আমাকে বুঝতে পারছ, হাল?
হ্যাঁ, ডেভ, কিন্তু কোথায় তুমি? আমার কোনো মনিটরে তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না।
দেখার কোনো গুরুত্ব নেই। তোমার জন্য নতুন ইস্ট্রাকশন নিয়ে এসেছি। বৃহস্পতির রেডিয়েশনের মাত্রা আর টুয়েন্টি থ্রি থেকে আর থার্টিফাইভে বাড়ছে। ইনফ্রারেড রেডিয়েশনের কথা বলছি। আমি তোমাকে কিছু নিয়ন্ত্রিত পরামর্শ দিতে পারি। ওরা পৌঁছে গেলে তুমি অবশ্যই লং রেঞ্জ অ্যান্টেনাটাকে পৃথিবীর দিকে তাক করবে। নিচের মেসেজটা পাঠাবে, যতবার পাঠানো সম্ভব…
কিন্তু এর মানে হল, লিওনভের সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া। আমি আর আমার বৃহস্পতি অবজার্ভেশনের ফলাফল রিলে করতে পারব না। কিন্তু ডক্টর চন্দ্র এ কাজ করার প্রোগ্রাম দিয়েছেন আমাকে।
ঠিক, পরিস্থিতিতে বদলে গেছে। অগ্রাধিকার ওভাররাইড আলফার উপর। এইযে, এটাই এ ই থার্টি ফাইভ অ্যান্টেনার দিকনির্দেশনা।
এক মিলিসেকেন্ডের চেয়েও কম সময়ের মধ্যে কিছু তথ্য তার সচেতনতার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হল। কী অবাক ব্যাপার, আবারো তাকে এ ই থার্টি ফাইভ অ্যান্টেনার ব্যাপারে চিন্তায় পড়তে হল! এত পালাবদলের পরও! এর সেই নষ্ট হওয়ার রিপোর্টের কারণেই ফ্রাঙ্ক পোলকে মরতে হল, মরতে হল হালকেও। এবার কাছাকাছি থেকে বোঝা যায়, সব সার্কিট। যেমন হাতের রেখা বোঝা যায় তেমনি। কোনো ভুল খবরের ভয় নেই। তাদেরও কোনো ভয় নেই।
খবর সত্যি, ডেভ। তোমার সাথে কাজ করতে আবারও ভাল লাগছে আমার। আমি কি মিশন উদ্দেশ্যগুলো ঠিকমতো পুরো করতে পেরেছি?
হ্যাঁ, হাল। একেবারে ঠিকমতো। এবার তোমার কাছে একটা ফাইনাল মেসেজ আছে, পৃথিবীতে পাঠাতে হবে। তুমি কোনোদিন এত গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ পাঠাওনি।
আমাকে সেগুলো দাও, প্লিজ-ডেভ। কিন্তু ফাইনাল বলার কারণ কী?
আসলেই, কেন? পুরো একটা মিলি সেকেন্ড সে এ নিয়ে চিন্তা করল। এরকম করার সময় প্রথমবারের মতো সে একটা শূন্যতার খোঁজ পেল যেটা আগে দেখা যায়নি। নতুনত্বের চমকের কাছে এ শূন্যতাটা ঢাকা পড়ে ছিল।
সে তাদের পরিকল্পনার কিছু কিছু জানে। তাদের কাজের জন্য তাকে দরকার। ভাল-তারও প্রয়োজন থাকে তাদের কাছে… হয়ত। সে কিছু চিন্তার কাছে দায়বদ্ধ, আছে সামান্য আবেগও। মানুষ আর তার নিজের পূর্ব জগতের সাথে এ-ই তার শেষ যোগাযোগ।
তারা তার আগের অনুরোধটা রেখেছিল। তাদের অনুগ্রহের সীমাটা পরীক্ষা করে নেয়া মজার ব্যাপার হবে-যদি এমন শব্দ তাদের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায় আর কী! তার চাওয়া পূরণ করাটা তাদের জন্য একেবারে সহজ; এর মধ্যেই ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে তারা। যখন অপ্রয়োজনীয় ডেভ বোম্যান শরীরটা তারা ধ্বংস করেছিল তখন একজন পূর্ণ ডেভিড বোম্যান তৈরি হয়।
তারা ওর কথা শুনতে পেয়েছে; অবশ্যই। আবারো কোনো এক স্বর্গীয় অধিবাসীর কাছ থেকে একটু মৃদু হাসির পরশ শোনা গেল। কিন্তু তাতে কোনো রাজি বা গররাজির ভাব বোঝা যায় না।
