শাসার চিৎকারটা কান্নার মতো শোনায়।
৫১. দ্য গ্রেট গেম
লম্বা অপেক্ষার শেষ প্রান্তে চলে এসেছে তারা। অন্তত আরেকটা জগতে বুদ্ধির বিকাশ ঘটেছে। নিজের গ্রহের এলাকা ছেড়ে চলে এসেছে সে আরেক জগতে। একটা প্রাচীন পরীক্ষার ফলাফল দেখানোর সময় উপস্থিত।
অনেক অনেক আগে যারা এ পরীক্ষাটা শুরু করেছিল তারা মানুষ ছিল না; মানুষের কাছাকাছিও না। কিন্তু তাদের রক্ত-মাংস ছিল। তাকিয়েছিল মহাকাশের এপাড় থেকে ওপাড়ে, যেন ভীত, একা, অসহায়, অবাক। যখনি ক্ষমতা এসেছে, দৌড়ে গেছে মহাশূন্যের দিকে। তারার জগতে। তাদের অভিযানে বহু রকমের, অনেক বিস্ময়ে ভরা জীবন দেখেছে; চেখেছে হাজারটা দুনিয়ার বিবর্তন। কসমিক অন্ধকারে, মহাজাগতিক রাত্রিতে কতশত বুদ্ধিমত্তাকে তারা একটু জ্বলে উঠতে দেখল দূরের নক্ষত্রের মতো, কত শত বুদ্ধিমত্তাকে যে দেখল নিভতে!
কিন্তু কোনো গ্যালাক্সিতে যেহেতু মনের চেয়ে দামি কোনোকিছুই পায়নি তাই এর নতুন ভোরকেই সবচে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে, সৃষ্টি করেছে,..সব জায়গায়। পরিণত হয়েছে কৃষাণে। তাদের চাষের জমি অনন্ত নক্ষত্রবীথি। কখনো বুনেছে তারার জগতের চারা, কখনো পেয়েছে দারুণ ফসল।
মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে তাদের ফসল ফলানো বাদও দিতে হয়েছে, দিতে হয়েছে পুড়িয়ে।
বিরাট বিরাট ডায়নোসরেরা আর নেই। অনেকদিন ধরেই নেই। একটা সার্ভে শিপ প্রবেশ করেছিল সৌরজগতে। শিপটা হাজার বছর ধরে অভিযান চালাচ্ছে তারা থেকে তারায়। বাইরের দিকের জমাট গ্রহগুলোকে ফেলে চলেছে সেটা। মৃতপ্রায় মঙ্গলের নতুন মরুভূমির উপরে থেমেছে একটু সময়ের জন্য, তারপর একবার তাকিয়েছে নিচে, পৃথিবীর দিকে।
তাদের নিচে এক বিরাট জগৎ দেখতে পেল অভিযাত্রীরা। সারাটা বিশ্ব জুড়ে সাঁতরে বেড়াচ্ছে জীবন আর জীবন। বছরের পর বছর তারা সব দেখল, সংগ্রহ করল, শ্রেণীবদ্ধ করে নিল। যতটা সম্ভব জানার পর, বোঝার পর এদের মধ্যে পরিবর্তন আনার পথে নামল। অনেক অনেক প্রজাতির মধ্যে তারা বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা দেখার চেষ্টা করল, অনেকের মধ্যে সম্ভাবনা খতিয়ে দেখল; সাগরে, স্বাদু পানিতে, মাটিতে, আকাশে, গাছের উপর। কিন্তু তাদের সেই পরীক্ষা সার্থক নাকি ব্যর্থ, তা দেখতে আরো মিলিয়ন বছরের দরকার।
ধৈর্য আছে অসীম, কিন্তু তখনো তারা অমর নয়। এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আরো অনেক অনেক অনেক কাজ করার বাকি। দশ হাজার কোটি তারার দুনিয়া তাদের ডাকে অহর্নিশি। দশ হাজার কোটি তারা, তাদের প্রায় প্রত্যেকের নিজস্ব সৌর জগৎ, অনেকগুলো করে গ্রহ, আরো আরো উপগ্রহ, আরো ধূমকেতু, গ্রহাণু, ক্যাওস, ব্ল্যাক হোল… তাই আবারো তারা অসীমের গর্তে পা রাখে। তারা জানে, এ পথে আর কক্ষনো, কোনোদিন ফিরে আসা হবে না।
আসার কোনো দরকারও ছিল না। পেছনে ফেলে আসা কালো, একশিলাস্ত গুগুলো বাকিটা করতে পারবে।
পৃথিবীর বুকে হিমবাহগুলো এল, আবার চলেও গেল বরফযুগকে সাথে নিয়ে, পরিবর্তনহীন চাঁদ তখনো তার বুকের ভিতরে লুকিয়ে রেখেছে নিজের রহস্য। পৃথিবীর বুকে মাত্র বরফ গলছে, ওদিকে গ্যালাক্সি থেকে গ্যালাক্সি, তারা থেকে তারায় চলছে নতুন জোয়ার, দু মেরুতে বরফ জমার চেয়েও ধীরে আসছে সভ্যতার উচ্ছ্বাস। অদ্ভুত আর সুন্দর আর ভয়াল সব সাম্রাজ্য তৈরি হয়েছে, হয়েছে পতন-শুধু তাদের প্রতিষ্ঠাতার কল্যাণে সভ্যতাগুলোর জ্ঞান পরিবাহিত হয় যুগ থেকে যুগে। পৃথিবীকে তারা ভুলে যায়নি, আরো একটা ছোট অভিযান দরকার। লাখ লাখ নীরব বিশ্বের মধ্যে এটাও একটা, এ লাখো দুনিয়ার মধ্যে খুব কমগুলোই কথা বলতে পারবে।
এবার আরও অনেক দুনিয়ার মতো এখানেও বিবর্তন একটা নির্দিষ্ট দিকে চলতে শুরু করল। একটা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। প্রথম অভিযাত্রীরা তাদের রক্ত-মাংসের সীমাবদ্ধতা নিয়ে এসেছিল। মেশিনগুলো শরীর থেকে বেশি কার্যকর হবার পরই আবার সময় এল বেরিয়ে যাবার। প্রথমে শুধু তাদের ব্রেনগুলো বেরিয়ে পড়েছে। মেশিনের সাথে। এখানেই শেষ নয়। এবার চায় এ সীমাবদ্ধতা থেকেও মুক্তি। এবার শুধু তাদের মন আসে সব অভিযানে। তাদের চিন্তাগুলো, তারা, চকচকে ধাতু আর ঝকঝকে প্লাস্টিকের সব ধরনের বাধা অতিক্রম করে চলতে শুরু করে।
এভাবে নক্ষত্র জগতে চলে যাওয়া যায় সহজেই। আর তারা স্পেসশিপ বানায় না। তারাই স্পেসশিপ।
কিন্তু মেশিন-অস্তিত্বের যুগ পেরিয়ে গেল সহজেই। অসীম পরীক্ষার মাধ্যমে তারা জ্ঞানকে স্বয়ং মহাশূন্যের গায়ে জমা করার পদ্ধতি পেয়ে যায়। আলোর জমাট কণার মধ্যে অসীম সময়ের জন্য তাদের চিন্তাগুলোকে জমা করে রাখতে শেখে। পরিণত হল তেজস্ক্রিয়ার অস্তিত্বে। রেডিয়েশন প্রথমবারের মতো তাদেরকে দিল মুক্তি। বস্তুর একনায়কত্ব থেকে মুক্তি।
এবার তারা নিজেদেরকে একেবারে খাঁটি শক্তিতে পরিণত করেছে। কারণ তেজস্ক্রিয় কণার অনেক অসুবিধা। গতিতে অসুবিধা, পরীক্ষাধীন বস্তুকেন্দ্রিক সভ্যতার কাছাকাছি গেলেই ঐসব প্রাণীর ক্ষতি হবার অসুবিধা, সবচে বড় কথা, তেজস্ক্রিয়তা নিজেওততা কণা-নির্ভর। সেই বস্তুরই ছোট ছোট কণা, হোক আলোর গতির।
কালক্রমে শক্তিতে পরিণত হওয়ার পর তারা দেখতে পেল ছেড়ে আসা সব দেহকে, রক্ত-মাংসের শরীর, তারপর শুধু ব্রেন, তারপর চিন্তা সহ স্পেসশিপ, তারপর রেডিয়েশনের কণা…হাজার হাজার দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মনহীন, চিন্তাহীন নশ্বরতার অতলে যাচ্ছে তলিয়ে।
