আমি এখনো তোমার জবাবের অপেক্ষায় আছি, ডেভ।
কারেকশন, হাল। আমার বলা উচিত ছিল, অনেক সময়ের জন্য তোমার শেষ মেসেজ।
সে তাদের কাজ বোঝার চেষ্টা করছে-চেষ্টা করছে অবশ্যই তাদের সিদ্ধান্তে নিজেকে শরীক করতে। কিন্তু তারা নিশ্চই বুঝতে পারে যে তার অনুরোধটা অকারণে করা হয়নি। কোনো সচেতন অস্তিত্ব একাকিত্বের মধ্যে যুগের পর যুগ কাটাতে পারে না বিনা ক্ষতিতে। এমনকি তারা যদি সব সময়ের জন্য তাদের সাথে থাকেও, তবু অন্য কোনো সঙ্গীর দরকার, যে তার অস্তিত্বের লেভেলের কাছাকাছি বাস করে।
তার অনুভূতিকে প্রকাশ করার জন্য মানুষের ভাষাগুলোয় অনেক অনেক শব্দ আছে, চুজপাহ, ইন্দ্রিয়, এগিয়ে যাওয়া… সে বর্তমান ক্ষমতা দিয়ে ঠিক ঠিক মনে করতে পারল। একবার এক ফ্রেঞ্চ জেনারেল বলেছিল, লডাসি-তজার্স লডাসি! হয়ত এটাই মানবীয় বৈশিষ্ট্য। এটাই তারা বড় করে দেখে, শেয়ারও করে থাকতে পারে…কিছুক্ষণ পরেই ও জানতে পারবে।
হাল, ইনফ্রারেড চ্যানেল থার্টি, টুয়েন্টি নাইন, টুয়েন্টি এইটে দেখ। সময় চলে এল বলে। চূড়া শর্টওয়েভের দিকে এগোচ্ছে।
আমি ডক্টর চন্দ্রকে অবশ্যই জানাব যে ডাটা ট্রান্সমিশনে একটা বাঁধা পড়ছে। সচল করছি এ ই থার্টিফাইভ ইউনিটকে। লঙ রেঞ্চ অ্যান্টেনাকে নিচ্ছি নতুন অবস্থানে…লক করলাম বিকন টেরা ওয়ান-এ। মেসেজ পাঠানো হচ্ছে…
এই সব জগৎ…
তারা আসলেই একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে-নাহয় হিসাব অসম্ভব ঠিক। মাত্র শতবার সেই এগার শব্দ বলা হয়েছে কি হয়নি, খাঁটি তাপের আঘাত আছড়ে পড়ে শিপের উপর।
সামনের বিরাট একাকিত্ব কাটাতেই তার আবেদন ছিল সেইসব অস্তিত্বের কাছে। এককালে যে ছিল ডেভিড বোম্যান-ইউনাইটেড স্টেটস স্পেসক্রাফট ডিসকভারির কমান্ডার-সে অবাক চোখে দেখল সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছে পুরো শিপের শরীর। অনেক সময় ধরে শিপটা তার আকার ধরে রেখেছিল। তারপর গোল অংশটার সবগুলো সংযোগ হারিয়ে গেল। হঠাৎ করেই বনবনিয়ে ঘুরতে লাগল সেটার বিরাট চাকতির মতো অংশ, তার সেই গতি ধরে রেখেছে এখনো। একটা নিরব বিস্ফোরণের পর ডিসকভারি ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
হ্যালো, ডেভ, কী হয়েছে? কোথায় আমি?
সে জানে না যে এবার অস্থির হওয়ার কিছু নেই, এখন সাফল্যের আনন্দ উপভোগের সময়।
আগে প্রায়ই সে একটা পোষা কুকুরের মতো অনুভুতি পেত, কেউ একজন তার গলার বেল্ট ধরে রেখেছে। যে ধরে রেখেছে তার মনোভাব বোঝা যায় না, মাঝে মাঝে নিজের ইচ্ছানুসারে এক-আধটু পরিবর্তন আনানো যেত সেই পরিচালকের মনোভাবে। একটা হাড্ডি চাওয়ার পর তার দিকে যেন ছুঁড়ে দেয়া হল এবার।
পরে বুঝিয়ে বলব, হাল। আমাদের হাতে অনেক সময় আছে। অসীম সময়।
শিপের শেষ অংশটাও বিলীন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করল। অপেক্ষা করল তাদের বোঝার ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর তারা একটা নতুন ভোরের জন্য সে জায়গা ছেড়ে গেল, যে ভোরটা তাদের জন্য তৈরি। এরপর, তাদের অপেক্ষা করবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, যে পর্যন্ত তাদের আবার না ডাকা হয়।
.
মহাকাশবিদ্যার ব্যাপারগুলো যে মহাকাশবিদ্যার সময় মেনে চলবে, সব সময় এমন হয় না। একটা নক্ষত্রের ভেঙে ছড়িয়ে যেতে একটা মাত্র সেকেন্ড দরকার। সুপারনোভারণ ক্ষেত্রে সেগুলো আবার একত্র হয়। সে হিসাবে বৃহস্পতির পরিবর্তন পুরোপুরি অলস একটা ব্যাপার।
তা হলেও শাসার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে কয়েক মিনিট সময় লেগে যাচ্ছে। সে রুটিনমতো টেলিস্কোপ দিয়ে গ্রহের দিকে তাকিয়ে ছিল…যেহেতু এখন সব দেখাই রুটিনের আওতায় পড়ে। ঠিকমতো দেখা শুরু হওয়ার পর তার মনে হল যেন নষ্ট হয়ে গেছে গ্রহটা। তারপর সে তার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে পুরনো ধারণাকে ঝাঁকি খেতে দেখল। টেলিস্কোপ নয়, স্বয়ং বৃহস্পতি নড়ছিল। ব্যাপারটা তার মুখে বিরাশি সিক্কার চড় বসিয়ে দেয় যখন আরো দু উপগ্রহ চোখে পড়ে। চাঁদ দুটো একেবারে অনড়!
আরো দূর থেকে দেখার জন্য সুইচ চাপল সে, যাতে পুরো গ্রহের চাকতিটা চোখে পড়ে। এবার দেখা যাচ্ছে কুরোগী, ধূসর বৃহস্পতিকে। কয়েক মিনিটের ধ্বস্তাধ্বস্তির পর আসল ঘটনাটা বোঝা যায়; কিন্তু এখনো ভয়ে ভয়ে সে ব্যাপারটা বিশ্বাস করছে। বৃহস্পতি অতি পুরনো অর্বিট ধরে ঘুরছে না, বরং অন্য কিছু…অসম্ভব। গ্রহটা সংকুচিত হচ্ছে-এত দ্রুত যে এর প্রান্তগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে চারধারে, এমনকি এর উপর ফোকাস করার পরও ঠিক তাই দেখা যায়। একই সাথে গ্রহটা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে পড়ছে। মৃদু ধূসরতা থেকে মুক্তা-সাদার দিকে বদলে যায় রঙ। নিশ্চই এটা আর কোনোদিন এত উজ্জ্বল ছিল না, অন্তত মানুষ কোনোদিন দেখেনি। সূর্যের আলোর প্রতিফলনেতো…
তখনি শাসা বুঝতে পারল কী হচ্ছে। কেন হচ্ছে তা বড় ব্যাপার নয়…
.
আধ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্লয়েড অবজার্ভেশন লাউঞ্জে পৌঁছলে জানালাগুলো দিয়ে আলোর চোখ ধাঁধানো স্রোত প্রবেশ করে। দেয়ালগুলোয় আলোর বৃত্ত গড়ে উঠছে একে একে। এত ভয়ংকর উজ্জ্বল আলো যে সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে সে। এমন আলো সূর্যও দিতে পারবে না!
ফ্লয়েড এত বেশি অবাক হয়েছে যে বৃহস্পতির কথা তার মনেই নেই। প্রথমেই যে কথাটা তার মনে ধাক্কা দিল সেটা হল-সুপারনোভা! সাথে সাথেই আবার বাতিল করে সিদ্ধান্তটা। এমনকি সূর্যের পাশের বাড়ির নক্ষত্র আলফা সেঞ্চুরিও এমন আলো তৈরি করতে পারবে না যে কোনো বিস্ফোরণে।
