উপগ্রহের ব্যাপারে কথা বলছিলাম-আমরা এইমাত্র সাইনোপ এর অর্বিট পেরিয়ে গেলাম। তার মানে জোভিয়ান সিস্টেম-বৃহস্পতি জগৎ ছেড়ে যাচ্ছি কিছুক্ষণের মধ্যেই। বৃহস্পতি এখন দু কোটি কিলোমিটার দূরে, দেখা যায় আমাদের চাঁদের চেয়ে একটু বড়।
এমনকি এত দূর থেকেও তুমি বলতে পারবে যে এ গ্রহের খুব ভয়াবহ কিছু একটা হয়েছে। এর সুন্দর কমলা রঙ উবে গেছে। একটু অসুস্থ ধূসর দেখাচ্ছে এখন; আগের উজ্জ্বলতার একটু ভগ্নাংশ। এখন পৃথিবীর আকাশে একে একটা অতি নিভু নিভু তারার মতো লাগছে-অবাক হওয়ার কিছু নেই।
কিন্তু কিছুই হয়নি। আর আমরা ভালভাবে ডেডলাইন পেরিয়ে এসেছি। এই পুরো ব্যাপারটা কি একটা মিথ্যা সতর্কবাণী, নাকি মহাজাগতিক ঠাট্টা? কোনোদিন জানতে পারলে ভাল হত। যাই হোক, আমাদের পৃথিবীতে ফিরে আসতে আরো সাহায্য করবে। আমি এজন্যে কৃতজ্ঞ, খালি সৌর জগতের ভারসাম্য আর আকর্ষণ মাত্রা পাল্টে না গেলেই হয়!
এখনকার মতো বিদায়, ক্যারোলিন…থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভরিথিং…আশা করি এখনো আমরা বন্ধু থাকতে পারব। এবং চিরদিনের মতো আজো আমার গভীরতম ভালবাসা ক্রিসের জন্য।
শেষ করার পর ফ্লয়েড ছোট কিউবিকলটার ভিতরে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকল। এ ঘরটার আর দরকার নেই। এবার অডিও চিপটা ট্রান্সমিশনের জন্য উপরে ব্রিজে নিয়ে যেতে হবে। চন্দ্র ভেসে ভেসে ভিতরে ঢুকছে।
ফ্লয়েড অবাক হয় কীভাবে এ বিজ্ঞানী হালের কাছ থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাওয়া সহ্য করছে তা দেখে। এখনো প্রতিদিন তারা কয়েক ঘণ্টার জন্য কথা বলে। বৃহস্পতির ডাটা ট্রান্সফার করে, ডিসকভারির অবস্থা দেখে। যদিও কেউ আবেগের ছড়াছড়ি আশা করেনি-তবু চন্দ্র তার নিয়ন্ত্রণের দারুণ প্রকাশ ঘটিয়েছে। তার গোপন কথাগুলো জানে একমাত্র নিকোলাই টানোভস্কি। সে-ই ফ্লয়েডকে কিছু ব্যাখ্যা দিতে পারে।
চন্দ্র নতুন একটা জায়গায় আগ্রহ খুঁজে পেয়েছে, উডি। মনে রেখ, সে সবসময় কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত। গত কয়েক মাসে সে অনেক অনেক জেনেছে, পড়েছে। কী করছে আন্দাজ করতে পার?
আসলেই পারিনি।
হাল দশ হাজারের ডিজাইন করায় ব্যস্ত।
ফ্লয়েডের চোয়াল ঝুলে পড়ল, আচ্ছা, তাহলে শাসা যে মেসেজ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিল, আরবানার সেই লম্বা মেসেজগুলোর এই মাহাত্ম! যাই হোক, সে বেশিক্ষণ সার্কিটগুলো জ্যাম করে রাখতে পারবে না।
চন্দ্র ঢোকার পর যে কথাগুলো হয়েছিল তা মনে পড়ল। সে জানে, এসব নিয়ে বিজ্ঞানীকে প্রশ্ন করার কোনো মানেই হয় না; এটা ফ্লয়েডের কাজের সাথে খাপও খায় না। এসব ছাড়াও আরো কারণ আছে যার জন্য সে চিন্তিত।
চন্দ্র, বলল সে, আমার মনে হয় না ছেড়ে আসার সময় তুমি যে কাজটা করেছ তার জন্য ঠিকমতো ধন্যবাদ দিতে পেরেছি। বিশেষ করে তুমি হালকে রাজি করিয়েছ কাজের জন্য। এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছে সে আমাদের বিপদে ফেলতে পারে। তুমি সব সময় আত্মবিশ্বাসী ছিলে, তুমিই ঠিক। আজো কি তোমার একটুও আফসোস হয় না?
একটুও না। ডক্টর ফ্লয়েড।
কেন না? পরিস্থিতির কারণে সে অবশ্যই চাপে ছিল। শেষবার কী হয়েছিল তাতো তুমি জানোই।
খুব বড় পার্থক্য আছে পরিস্থিতি দুটোর মধ্যে। আমার তেমন করে বলতে হলে বলা যায়, এবারের সফল কাজের পিছনে আমাদের জাতীয় চরিত্রের কিছু প্রভাব থাকে।
বুঝলাম না।
এভাবে দেখ, ডক্টর ফ্লয়েড, বোম্যান ওর বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের চেষ্টা করেছে। আমি করিনি। আমাদের মাতৃভাষায় একটা শব্দ আছে-অহিংসা [লেখক ঠিক এ শব্দটাকেই ইংরেজি উচ্চারণে লিখেছেন। এর আক্ষরিক অর্থ হয় নন ভায়োলেন্স-যদিও আসল অর্থ আরো ব্যাপক, গভীর। আমি অহিংসা ব্যবহারের ক্ষেত্রে হালের সাথে কাজ করেছি খুব সতর্কভাবে।
খুবই প্রশংসার কাজ, আমি নিশ্চিত। কিন্তু কিছু কিছু সময় আসে যখন আরো কার্যকর পথ ধরতে হয়। এমনকি কোনো কোনো সময় সেই প্রয়োজনের কারণে খারাপ কাজ করার দরকার পড়ে যায়। একটু সময়ের জন্য থামল ফ্লয়েড, চন্দ্রের পবিত্র ভাব একটু যেন বিরক্ত। তবু, এখন জীবনের কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য তাকে বলে দিলে আর কোনো বিপদের সম্ভাবনা নেই।
এ পথে যে কাজ হয়েছে তাতে আমার খুব ভাল লাগল। কিন্তু এমন নাও হতে পারত। আমাকে প্রত্যেক সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। অহিমসা বা যা-ই তুমি বল না কেন, তোমার এই দর্শনের পেছনে আমার একটা ব্যাক আপ ছিল কিন্তু। যদি হাল একটু এদিক সেদিক করত-তাহলে তার সাথে কিছু করার ছিল আমার।
ফ্লয়েড একবার চন্দ্রকে কাঁদতে দেখেছিল। এবার দেখল হাসতে। এটাও তেমনি নতুন অস্তিত্বের প্রকাশ।
আসলেই, ডক্টর ফ্লয়েড? আমার খুব খারাপ লাগছে। এত কম মার্ক দাও আমার বুদ্ধিমত্তাকে! শুরুতেই যে কোনো কাট আউট বসাবে হালের কোনো না কোনো জায়গায় সেটা কি ভাবিনি? কাট আউটটা কয়েক মাস আগেই তুলে ফেলেছি আমি।
ফ্লয়েড তার অপ্রস্তুত মুখের সাথে মানানসই কোনো জবাব খুঁজে চলেছে। একটা কৃত্রিম হাসির মাছের মতো মুখ করার চেষ্টা করছে যেটা মাত্র নদী থেকে ধরা পড়ে একুরিয়ামে ভরে ফেলা হল। কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে শাসার চিৎকার, ক্যাপ্টেন! আর সবাই! মনিটরগুলোর কাছে যাও। বোহে মোয়ে! লুক অ্যাট দ্যাট!
