ভ্যাসিলি ঘোষণা দিচ্ছিল, কিন্তু কথাগুলো বোঝা দায়। একবার ঘড়ির দিকে তাকালো ফ্লয়েড; হা-এখুনি সময়। এবার তারা বৃহস্পতি ছেড়ে যাবার গতি পেয়েছে। আর কখনোই দৈত্যটা ওদের ধরে রাখতে পারবে না মেঘময় হাতের মুঠোয়।
এবং তখুনি, হাজার হাজার কিলোমিটার সামনে একটা বিরাট আলো-ধনুক দেখা দিল আকাশে। সত্যিকার বৃহস্পতি-সূর্যোদয়ের প্রথম পরশ। এটা যেন পার্থিব যে কোনো রঙধনুর চেয়ে অনেক অনেক বেশি আশা নিয়ে আসছে। কয়েক সেকেন্ড পরেই সূর্য লাফিয়ে এগিয়ে এল, ওদের স্বাগত জানাবে। সূর্যদেব! এখন থেকে প্রতিদিন তিনি এগিয়ে আসবেন কাছ থেকে কাছে।
গতিবৃদ্ধি ঠিক করতে আরো কয়েক মিনিট সময় লেগে যায়, এবারও লাগবে। এরপর লিওনভ বিপ্লবের গতিতে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাবে। ফ্লয়েড নিজের ভিতরে অনেক অনেক শান্তি খুঁজে পায় এবার। কোনো এক ঐশ্বরিক নিয়ম, স্বর্গীয় প্রযুক্তি তাকে এখন টেনে নিয়ে যাবে সৌরজগতের কেন্দ্রের কাছাকাছি-গ্রহাণুপুঞ্জ পেরিয়ে আসবে ওরা, পেরোবে মঙ্গলের অর্বিটগুলোে, নিয়তির মতো এসে দাঁড়াবে পৃথিবীর অর্বিটে কিন্তু কেউ আটকাতে পারবে না; কেউ না।
সুখচিন্তার চরম পুলকে সে ভুলেই গেছে কালো পাথরের কথা। বৃহস্পতির মুখ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে কালো কালো অচিন পাথর।
৪৯. তুমি কোন্ ভাঙনের পথে এলে, সুপ্ত রাতে…
পরের সকালে তারা আবার এটাকে দেখতে পেল। স্পেসশিপে সকাল বলে কিছু নেই। সবই স্থবির সময়। এটা বৃহস্পতির দিনের অংশ। কিন্তু লিওনভ সময় সকাল। আঁধারের এলাকা ছড়িয়ে পড়েছে পেছনে, সামনে শুধু অখন্ড ইচ্ছেমাফিক গল্প।
জানো, এ দেখে কী মনে হয়? বলছে ক্যাথেরিনা, একটা ভাইরাস যেন কোনো কোষকে আক্রমণ করছে। যেভাবে একটা ফাজ৭৩ কোনো ব্যাকটেরিয়ামে তার ডি এন এ৭৫ ঢুকিয়ে দেয়, তারপর পুরোটা ভরে গিয়ে অনেক অনেক নতুন ভাইরাস বেরোয়, অনেকটা তেমন।
তুমি কি বলতে চাও যে, শান্ত চোখে তাকালো তানিয়া, জাগাদকা বৃহস্পতিকে খেয়ে ফেলছে?
এখন এমনই মনে হয়।
সত্যি, বৃহস্পতিকে দেখতে অসুস্থ লাগে, কিন্তু এত ভারি ওজন কি হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম দিয়ে বানানো অসম্ভব? সেখানে এ দু মৌল ছাড়া অন্য যেগুলো আছে তার পরিমাণ খুব কম।
সেই কমগুলোর সাথে যোগ দেবে মাত্র কয়েক কুইন্টিলিয়ন টন সালফার, কার্বন আর ফসফরাসসহ পর্যায় সারণির নিচের দিকের আরো কয়েকটা মৌল। শাসা খোঁচা দিল, যে কথাই বল না কেন, আমরা এমন একটা টেকনোলজি নিয়ে কথা বলছি, যেটা পদার্থবিদ্যার বিপরীতে যায় না এমন যে কোনো কাজ করতে পারে…মনে হয়। শুধু হাইড্রোজেন থাকলে আর কী দরকার? ঠিকমতো জানলে এ থেকেই বাকি সব মৌল বানাতে পারবে। এ কথা আর বলা লাগে?
এখন বলার আছে একটা কথাই… বলল ভ্যাসিলি, তাকাও, ওরা বৃহস্পতি ঝেড়ে ফেলছে।
টেলিস্কোপ মনিটরে একটা মনোলিথের খুব কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে। এমনকি খালি চোখেও দেখা যাচ্ছে, দুই মুখের মাঝে গ্যাসের আবরণ ভেসে বেড়ায়। গ্যাসের বাষ্প। একটা চুম্বকের বাইরে চারধারে এভাবেই লোহার গুড়া জমা হয়।
লাখ লাখ ভ্যাকুয়াম ক্লিনার! মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে বলল কার্নো, বৃহস্পতির বায়ুমণ্ডল শুষে নিচ্ছে। কিন্তু কেন? এসব ধুলা-বালি দিয়ে এরা করবেটা কী!
আর কীভাবে জন্ম নিচ্ছে? প্রশ্নটা ম্যাক্সের, এ অবস্থায় দেখেছ কোনোটাকে?
হ্যাঁ এবং না। ভ্যাসিলি অনেকটা চিন্তায় পড়ে গেল যেন প্রশ্নটা করার পর, বিস্তারিত দেখার মতো কাছাকাছি নেই আমরা। এটা এক ধরনের ফিশন…বিভাজন। অ্যামিবা যেভাবে বিভক্ত হয়।
মানে, তারা দুভাগ হয়ে যায়, তারপর আধাআধিগুলো আসল আকার পায়?
নয়েট। কোনো আধা জাগাদকা চোখে পড়েনি। সেগুলো দ্বিগুণ হওয়া পর্যন্ত বাড়ে, তারপর বিভাজন। পুরুত্বের দিক দিয়ে বেড়ে গিয়ে তারপর ঠিক আসল আকারের সমান হয়ে জোড়ায় ভেঙে যায়। এ ব্যাপারটা আবার দু ঘন্টার মধ্যে হয়।
দু ঘণ্টায় একটা নতুন বিশাল জাগাদকা! প্রতি দু ঘণ্টায় দ্বিগুণ! আধা গ্রহ দখল করে বসেছে…অবাক হওয়ার কিছু নেই। এটাতো গুণানুপাতিক বৃদ্ধির টেক্সটবুক অঙ্ক-সমস্যা!
আমি জানি, ওরা কী! টার্নোভস্কি হঠাৎ করেই বলল, এগুলো হল ভন নিউম্যান মেশিন।
মনে হয় তোমার কথাই ঠিক। ভ্যাসিলি বলল, কিন্তু এ কথা বললেও আসল সমস্যার সমাধান হয় না। ওদের কাজ বা উদ্দেশ্য কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। ওদের কোনো একটা নাম দিলেই আমাদের কোনো লাভ হয়ে যাবে না।
ক্যাথেরিনা প্রশ্ন করল, ভন নিউম্যান মেশিন জিনিসটা কী?
অলোভ আর ফ্লয়েড দুজনেই বলা শুরু করেছে। একই সাথে থেমেও গেছে। দুজনেই, অন্যকে বলার সুযোগ দেয়ার জন্য। ভ্যাসিলি একটু হেসে আমেরিকানের দিকে হাত নাড়ল।
ধর, ক্যাথেরিনা, তোমার খুব বড় কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং কাজ আছে। বড়। যেমন চাঁদের বুকে বিরাট করে অনেক অনেক গর্ত খুঁড়তে হবে, স্ট্রিপ মাইনিং। এজন্য তুমি লাখো ধরনের যন্ত্র বানাতে পারো। লাখো পরিমাণ যন্ত্র বানাতে পারো। কিন্তু এক এক করে তৈরি করতে শতাব্দী পেরিয়ে যাবে। যথেষ্ট বুদ্ধি থাকলে তুমি কিন্তু মাত্র একটা মেশিনই বানাবে যেটা আশপাশের জিনিস নিয়ে এমন আরেক মেশিন তৈরি করে যাবে। একটা চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করে দাও। একেবারে কম সময়ের মধ্যে তোমার কাজের উপযুক্ত পরিমাণ মেশিন পেয়ে যাবে। এক থেকে দু, চার, আট, মোল, বত্রিশ-এভাবে। স্পেস এজেন্সি এ আইডিয়া নিয়ে বছরের পর বছর ধরে পুতুল খেলছে, নিশ্চই তোমার ভিতরও এমন কোনো ধারণা কাজ করে কখনো কখনো, তানিয়া।
