প্রত্যাশিত কাট অফের অর দশ সেকেন্ড বাকি, বলল তানিয়া, ওয়াল্টার, চন্দ্র, বেরিয়ে আসতে প্রস্তুত হও। ম্যাক্স, ভ্যাসিলি, প্রয়োজন পড়তে পারে, স্ট্যান্ডবাই। পাঁচ…চার…তিন…দুই…এক…শূন্য!
কোন পরিবর্তন নেই। দুই শিপ-দেহ থেকে এখনো ডিসকভারির মৃদু কাঁপন বোঝা যায়। সেই একই ওজন এখনো। আমাদের কপাল বলতে হবে, ভাবল ফ্লয়েড, গজগুলোর রিডিং নিচে নেমে গেছে নিশ্চই, তার পরও, বাড়তি ফায়ারিংয়ের প্রতিটা সেকেন্ডই কাজে লাগবে দারুণভাবে। হয়ত এটাই জীবন আর মরণের মধ্যে দূরত্বটা আরো বাড়িয়ে দিবে। আর নিচে গণনার জায়গায় উপর-গণনা কী অদ্ভুত শোনায়।
পাঁচ সেকেন্ড… দশ সেকেন্ড…তের সেকেন্ড…হ্যাঁ, লাকি থার্টিন!
ওজনহীনতা, তারপর নিরবতা ফিরে আসে। দু শিপেই আনন্দের একটা ছোট বিস্ফোরণ টের পাওয়া যায়। এতো মাত্র শুরু, আরো অনেক কিছু বাকি। সেসব
করতে হবে তাড়াতাড়ি।
ফ্লয়েড এয়ারলকের কাছে যেতে অস্থির হয়েছে, এ শিপে হাজির হওয়ার পর যত তাড়াতাড়ি অভিনন্দন জানানো যায় চন্দ্র আর কার্নোকে। কিন্তু তার তেমন কিছু করার নেই সেখানে গিয়ে। ম্যাক্স আর শাসার সেখানে ব্যস্ত থাকার কথা। ওরা সম্ভবত ই ভি এ আর দু শিপের টিউবে কাজ করার জন্য একেবারে তৈরি। তার বরং লাউঞ্জেই অপেক্ষা করা ভাল-ফিরে আসা বীরদের এখানেও সম্মান জানানো যাবে।
যদি কোনো স্বস্তি-মিটার থাকত যেটায় দশটা ঘর আছে তবে এবার প্রথমবারের মতো তার স্বস্তির মাত্রা আট থেকে সাতে ধরা যায়। কত সপ্তাহ পার করে আজ এই প্রথম রেডিও কাটঅফের কথা সে ভুলে যেতে পারছে! হয়ত আর কখনোই এটার দরকার পড়বে না। হাল কাজ করেছে দারুণ। অবশ্য ও একবারও চেষ্টা করলে ডিসকভারির ফুয়েলের শেষ বিন্দু পর্যন্ত এ মিশনকে একটুও প্রভাবিত করতে পারত না।
সবাই ফিরেছে, বলল শাসা, হ্যাচ বন্ধ, আমি এবার বোমা ফাটানো শুরু করব।
বিস্ফোরণের পর এক বিন্দু শব্দও পাওয়া যায়নি। ফ্লয়েড বেশ অবাক। একটু শব্দ, দু শিপের একটু ঝাঁকি আশা করাটা অন্যায় না। তবু এ শিপ দুটো যে এর মধ্যে অনেক অনেক দূরে সরে গেছে তাতে সন্দেহ নেই। হালকা একটু কাঁপন টের পাওয়া যায় এর গায়ে, হয়ত বাইরে থেকে কেউ একটা হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি দিচ্ছে। একমিনিট পর ভ্যাসিলি অল্টিচ্যুড জেটগুলোর ট্রিগার টিপে চিৎকার করে উঠল, আমরা মুক্ত! শাসা, ম্যাক্স-তোমাদের দরকার নেই। প্রত্যেকে যার যার ঝুলানো জালের বিছানা হ্যাঁমোকে ফিরে যাও, একশো সেকেন্ডের মধ্যে ইগনিশন!
এবার বৃহস্পতি ঘুরতে ঘুরতে সরে যাচ্ছে দূরে, আর জানালার বাইরে একটা নতুন, অদ্ভুত গড়ন দিল দেখা-লম্বা, হাড়ের মতো এক দেহ। ডিসকভারি। এখনো নেভিগেশন লাইট জ্বলছে, ভেসে চলছে তাদের কাছ থেকে, ইতিহাসের দিকে। এখন আর আবেগ দেখিয়ে বিদায়ের সময় নেই, এক মিনিটের মধ্যেই লিওনভ যাত্রা করবে শুরু।
এমন শব্দ ফ্লয়েড শুধু ফুল থ্রটলের সময় শুনতে পায়, সেই জগৎ মাতাল করা গর্জনের হাত থেকে দু কান বাঁচানোয় ব্যস্ত থাকে। লিওনভের ডিজাইনাররা বছরব্যাপী অভিযানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার শব্দ তরঙ্গ থেকে যাত্রীদের বাঁচাতে বাড়তি শব্দ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে চায়নি, শিপটা ভারি হয়ে যাবে। হঠাৎ ওজন মনে হচ্ছে একেবারে অসম্ভব বেড়ে গেল-কিন্তু এখনো তার জীবনের সবচে ভয়াল ওজনের চারভাগের একভাগ এসেছে মাত্র।
ক মিনিটের মধ্যেই জ্বলন্ত ওয়ার্নিং লাইটগুলো নিয়ে ডিসকভারি হারিয়ে গেল অনেক অনেক দূরে। নিজেকেই বলছে ফ্লয়েড, আরো একবার আমি বৃহস্পতিকে ঘুরে যাচ্ছি-এবার গতি পেতে, হারাতে নয়। একপলক তাকালো জেনিয়ার দিকে, মেয়েটা অবজার্ভেশন জানালায় নাক চেপে থাকায় শুধু নাক আর মুখের সামনের দিকটাই দেখা যায়। তারও কি সেদিনের কথা মনে পড়ছে, যেদিন তারা দুজন এই ঝুল-বিছানা, এই হ্যাঁমোক ভাগাভাগি করে নিয়েছিল? এবার আর জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যাবার ভয় নেই; অন্তত আজ আর মেয়েটা সে ভয়ে অস্থির হবে না। আজ তাকে অনেক বেশি আনন্দে থাকতে দেখা যাচ্ছে, অনেক বেশি নিরাপদ। ধন্যবাদ ম্যাক্স আর হয়ত ওয়াল্টারকেও।
জেনিয়া ফ্লয়েডের ভাবনা ধরে ফেলেছে মনে হয়-একটু ঘুরে হাসল, তারপর নিচের বাতাসহীন মেঘের দিকে হাত নেড়ে নিল একটু, দেখো! মেয়েটা তার কানে চিৎকার করল, বৃহস্পতির একটা নতুন চাঁদ উঠেছে।
ও কী বলতে চায়? মনে মনে প্রশ্ন করল ফ্লয়েড। আজো তার ইংরেজি বেশি সুবিধার না; কিন্তু এত সাধারণ একটা বাক্যে ভুল করে বসবে? মনে হয় না। আমি নিশ্চিত, ওর কথাটা ঠিকমতোই শুনেছি-আশা করি সে উপরের দিক নির্দেশ করেনি-বুঝিয়েছে নিচে…
হঠাৎই বুঝতে পারছে, নিচের দৃশ্যটা একেবারে ভোজবাজির মতো উজ্জ্বল; এমনকি হলুদ আর সবুজ রঙগুলোও দেখা যাচ্ছে যা আগে বোঝা যেত না। বৃহস্পতীয় মেঘে ইউরোপার চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল একটা কিছু আলো ছড়ালে এমন হওয়ার কথা।
লিওনভ নিজে বৃহস্পতির মাঝ-দুপুরের সূর্যের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল-ছেড়ে যাওয়ার সময় একটা মিথ্যা সূর্যোদয় ঘটিয়ে যাচ্ছে স্পেসশিপটা। শত কিলোমিটার লম্বা একটা পুচ্ছ দেখা দিয়েছে শিপের পিছনে। প্লাজমার জ্বলন্ত, অসম্ভব তাপমাত্রার একটা লেজ।
