ইগনিশনের দু মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। ফাইনাল কাজ শুরু হয়েছে। আমি দুঃখিত যে তোমরা থাকতে পারছ না। গুরুত্বানুসারে আমাকে দু একটা কারণ বলতে পার?
দু মিনিটে পারব না, হাল। কাউন্ট ডাউন চালিয়ে যাও। পরে সব খুলে বলব। আমরা আরো কমপক্ষে…একঘন্টা একত্রে আছি।– কোন জবাব নেই। নিরবতা আস্তে আস্তে বাড়ছে। এক মিনিট ঘোষণার সময় নিশ্চই হয়ে গেছে…
কার্নো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবল…মাই গড! হাল মিস করেছে! হাল কাউন্ট ডাউন বন্ধ করে দিয়েছে?
কার্নো অনিশ্চিতভাবে সুইচের উপর হাতড়ে বেড়ায়। এখন কী করি! ফ্লয়েড কিছু বলতে পারে। হায় হায়, ও সম্ভবত সবকিছু ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত…
আমি জিরো টাইম পর্যন্ত অপেক্ষা করব-না; এটা সেই জটিল মুহূর্ত না, আচ্ছা, আরও একটা মিনিট যাক; তারপর আমি তাকে টুকরো করে ম্যানুয়াল কমান্ড হাতে নিব…
অনেক, অনেক অনেক দূর থেকে একটা ক্ষীণ হুইসেলের মতো শব্দ এগিয়ে এল একটু একটু করে। যেন বিরাট এক ঝড় উঠছে নিচের সেই জায়গাটায়। কাঁপছে ডিসকভারি। ফেরার অভিকর্ষের কাজ শুরু!
ইগনিশন! বলে হাল, টি প্লাস ফিফটিন সেকেন্ডে ফুল ফ্রটল দেয়া হয়েছে।
থ্যাঙ্ক ইউ, হাল। জবাব দেয় ডক্টর চন্দ্র।
৪৮. রাতের আকাশ
হেউড ফ্লয়েডের মনে হয় তারা ঠিক কোথায় তা বলা যাচ্ছে না। ওজশূন্যতাও নেই লিওনভে। যেন কোনো পুরনো শ্লো-মোশন দুঃস্বপ্ন-আস্তে ধীরে পরিণতি এগিয়ে আসছে। এ জীবনে আগে মাত্র একবার এমন অনুভূতি হয়েছে, একবার পিছলে যেতে শুরু করেছিল তাদের গাড়ি, ড্রাইভার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না। অসহায়ত্ব কীভাবে ভর করে মানুষের মনে-একটা কথাই শুধু ভাবার ছিল, এতে কিছুই যায় আসে না…আমার কি হবে না, হলে হবে অন্যদের।
ফায়ারিং পর্যায় শুরু, তার মনোভাবও গেছে বদল। সব আগের মতো সত্যি মনে হচ্ছে। ঠিক পরিকল্পনা মতো সব চলছে হাল দিচ্ছে পৃথিবীর দিকে নিরাপদে যাওয়ার সব দিক নির্দেশনা। প্রতি সেকেন্ডে তাদের ভবিষ্যত হয়ে যাচ্ছে আরো আরো নিরাপদ। ধীরে টান টান ভাবটা সরে গিয়ে চারপাশ সম্পর্কে সাধারণ সচেতনতা কাজ করছে ফ্লয়েডের মনে।
শেষবারের মতো কোন পাগল দু বার এমন জায়গায় আসতে চায় শেষবারের মতো বৃস্পতির রাতের আকাশের উপর উড়ছে তারা। সেই গ্রহরাজের এলাকায় যে হাজার পৃথিবীর চেয়েও বড়! শিপ উপরনিচ করা হয়েছে যেন লিওনভ বৃহস্পতি আর ডিসকভারির মাঝে থাকে। তাদের চোখে সেই রহস্যময় বৃহস্পতির মেঘ। এখন ডজন ডজন যন্ত্রপাতি সেটাকে দেখা আর তদন্ত করায় মেতে আছে। তারা চলে গেলে হাল কাজ চালিয়ে যাবে।
চুড়ান্ত সংকট কেটে যাবার পর ফ্লয়েড ফ্লাইট ডেকে নেমে গেল! ওজনের অভিজ্ঞতা কী অদ্ভুত, হোক দশ কেজি! অবজার্ভেশন লাউঞ্জে আছে ক্যাথেরিনা আর জেনিয়া। লাল আলোগুলোও জ্বলছে খুব কম, যাতে তারা রাতের বৃহস্পতিকে ঠিকমতো দেখতে পারে। শাসা কোভালেভ আর ম্যাক্স ব্রেইলোভস্কির জন্য সে একটু মন খারাপ করল, বেচারারা পুরোপুরি স্যুট পরে বসে আছে এয়ারলকে। এত সুন্দর রাত মিস করছে। তাদের উপর মস্ত দায়িত্ব, যদি একটা বিস্ফোরকও কাজ না করে, তাহলে তাদেরকে নিজের হাতে এ টেপগুলো কেটে দিতে হবে।
সামনের আকাশ বৃহস্পতিতে বৃহস্পতিময়। মাত্র পাঁচশ কিলোমিটার দূরে। ফলে মাত্র ছোট একটা অংশ তারা দেখতে পাচ্ছে নিচে। পঞ্চাশ কিলোমিটার উপর থেকে পার্থিব মেঘের একটা সমুদ্র দেখতে যেমন হয়, ততটুকু এলাকা। তার চোখ আটকে গেছে হালকা আলোয়। এর বেশিরভাগই ইউরোপার প্রতিফলিত,জোছনা। ফ্লয়েড খুব অবাক চোখে অনেক জায়গা দেখতে পায় একেবারে স্পষ্ট। এখানটায় লালের এক আধটু ছোপ ছাড়া কোনো রঙের ছড়াছড়ি নেই। কিন্তু পেঁজা মেঘ ভেসে বেড়ায় এদিক সেদিক। তুষারে ঘেরা একটা ডিমের মতো ঝড় উঠেছে নিচে কোথাও। গ্রেট ব্ল্যাক স্পট ঘুরে ঘুরে হারিয়ে গেছে ওপাশে। ওটা ঘুরছে না, শুধু শব্দের গতিতে বেড়ে চলেছে, কিন্তু বৃহস্পতিতো ঘুরছে অনন্তকাল ধরে। তারা বৃহস্পতি দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন পৃথিবীর দিকে ভো দৌড় দেবে, তখন আরেকবার দেখা দিতে পারে সেই স্পট।
নিচে আলোর নিয়মিত বিস্ফোরণ দেখা যায়, এগুলো বৃহস্পতির বিজলি চমক আর আগ্নেয় বিস্ফোরণ। মাঝে মাঝে শক ওয়েভের মতো করে আলোর বন্যা বেরিয়ে আসে গভীর থেকে। কখনোসখনো গোল আলো বা আরো অবাক করা ছায়া দেখা যায়, তাই বলে নিচে কোনো সভ্যতা গড়ে উঠেছে এমন ভাবার সুযোগ নেই। মহানগরীর আলো, এয়ারপোর্টের বিশাল আলো-বিম… কিন্তু রাডার আর পরীক্ষা বেলুন ভাল করে দেখেছে, এ বৃহস্পতির উপরিতলে হাজার কিলোমিটার জুড়ে কোনো শক্ত কঠিন জিনিস নেই। একেবারে অসহ্য কোর পর্যন্ত সবই আধ-কঠিন, তরল নাহয় গ্যাসীয়।
বৃহস্পতিতে মধ্যরাত! এই শেষ দেখা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদের মধ্যে একটা। আরো বেশি করে উপভোগ করার পরিস্থিতি এখন আর কোনো বিপদের ভয় নেই। যদি থেকেও থাকে তো তার করার কিছু নেই। করেছে যথাসম্ভব।
লাউঞ্জ একেবারে চুপচাপ, কেউ কথা বলতে চায় না, কারণ নিচের মেঘ-চাদর সরছে দ্রুত। প্রতি মিনিটে তানিয়া আর ভ্যাসিলি প্রজ্বলনের অবস্থা ঘোষণা করে। ডিসকভারির ফায়ারিং টাইমের পর আবার টেনশন শুরু। এটাই ক্রিটিক্যাল মুহূর্ত। এ জটিল সময় কখন হাজির হরে কেউ জানে না। ফুয়েল গজের ঠিক থাকা নিয়ে কোনো কথা ওঠেনি। একেবারে শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত প্রজ্বলন চলবে।
