ইগনিশনের আট মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। ডক্টর চন্দ্র, একটা সাজেশন করব?
কী, হাল?
খুবই অস্বাভাবিক লক্ষণ। তোমার কি মনে হয় না, আমার এখন কাউন্ট ডাউন বন্ধ করা উচিত-যাতে তোমরা এটাকে ঠিকমতো স্টাডি করতে পার?
লিওনভে ফ্লয়েড ব্রিজের মধ্যে চলাফেরা শুরু করেছে দ্রুত। তানিয়া আর ভ্যাসিলির হয়ত দরকার পড়বে কোনো। বলতেই হয় না, চন্দ্র আর কার্নোরও প্রয়োজন পড়বে-কী পরিস্থিতি। এ অবস্থায় চন্দ্র যদি হালের পক্ষ নেয়? যদি সে নেয়, তাহলে তাদের দুজনেই হয়ত ঠিক কাজটাই করবে। হাজার হলেও, এটাই কি সেই উপলক্ষ না, যে জন্য এতদূর আসা?
তারা যদি কাউন্ট ডাউন বন্ধ করে তাহলে বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকবে। আর উনিশ ঘণ্টার মধ্যে ফিরে যাবে আগের জায়গায়। উনিশ ঘণ্টার অপেক্ষা কোনো সমস্যাই করবে না, কিন্তু যদি সেই জাদুকরি সতর্ককরণ এ জন্যে হয়ে থাকে, তো আর সময় নেই।
কিন্তু এতক্ষণে এটা সতর্ক করার চেয়েও বেশি কিছুর রূপ নিয়েছে। তাদের নিচে একটা গ্ৰহজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে প্লেগ। গ্রহরাজ বৃহস্পতির মুখ যাচ্ছে ছেয়ে। তারা আসলেই বিজ্ঞানের জগতের সবচে শক্তিমান, সবচে ভয়াল জন্মের সামনে থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে। এমন হলে সে একটা নিরাপদ দূরত্ব থেকে ঘটনাকে দেখতে বেশি পছন্দ করে।
ইগনিশনের ছ মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। তোমরা রাজি থাকলে আমি কাউন্ট ডাউন বন্ধ করতে প্রস্তুত। আমাকে মনে করিয়ে দিতে দাও। আমার প্রথম মিশন হল বৃহস্পতির আশেপাশে বুদ্ধিমত্তার নিদর্শন দেখলে তা জরিপ করা।
ফ্লয়েড বুঝছে, সে নিজেই হালের মেমোরিতে এ বাক্যটা লিখেছিল। একবার যদি সেটাকে মুছিয়ে ফেলা যেত! এক মুহূর্তের মধ্যেই সে ব্রিজে পৌঁছে অর্লোভদের সাথে যোগ দিল। অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে তারা ফ্লয়েডের দিকে চেয়ে আছে। তুমি কী বল? তাড়াতাড়ি প্রশ্ন করল তানিয়া।
এখন পুরোপুরি চন্দ্রের উপর নির্ভর করে-আমি…ভয় পাচ্ছি খুব। তার সাথে কথা বলতে পারি প্রাইভেট লাইনে?
ভ্যাসিলি তার হাতে মাইক্রোফোনটা তুলে দিল।
চন্দ্র, আশা করি হাল শুনছে না?
হ্যাঁ, ডক্টর ফ্লয়েড।
তাড়াতাড়ি কর। বল যে কাউন্ট ডাউন চলতেই হবে। বল যে-শালার…বল যে তার সায়েন্টিফিক হিসাব নিকাশকে আমরা শ্রদ্ধা করি…হু..এভাবেই বলতে হবে। বল যে আমরা নিশ্চিত, আমাদের ছাড়াই সে কাজ চালাতে পারবে। না, না, আমাদের সাহায্য ছাড়াই…আমরাও সব সময় তার সাথে যোগাযোগ রাখব। অবশ্যই।
ইগনিশনের পাঁচ মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। আমি এখনো তোমার জবাবের আশায় আছি, ডক্টর চন্দ্র।
আমরা সবাই। কার্নো জোরে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। দাঁড়িয়ে আছে বিজ্ঞানীর মাত্র কয়েক মিটার দূরে। আর যদি বাটনটা টিপতেই হয় তো আমি মুক্তি পাই।
হাল, কাউন্ট ডাউন চালাও। আমি তোমার বৃহস্পতি-পর্যবেক্ষণের উপর পুরোপুরি ভরসা রাখি, এমনকি আমাদের নজরদারী ছাড়াও। আমরা অবশ্যই সব সময় তোমার সাথে যোগাযোগ রাখব।
ইগনিশনের চার মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। প্রোপ্যাল্যান্ট ট্যাঙ্কে প্রেশার দেয়া শেষ। প্লাজমা ট্রিগারের ভোল্টেজ স্বাভাবিক। তুমি শিওর, সিদ্ধান্ত ঠিক হচ্ছে-ডক্টর চন্দ্র? আমি মানুষের সাথে কাজ করে মজা পাই এবং তাদের সাথে একটা দারুণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শিপের আচরণ এক মিলিরেডিয়ান৭২ পর্যন্ত স্বাভাবিক।
আমরাও তোমার সাথে কাজ করে আনন্দ পাই, হাল। আমরা তাই করতে থাকব, যদি লাখ লাখ কিলোমিটার দূরেও চলে যাই।
ইগনিশনের তিন মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে। রেডিয়েশন প্রতিরোধ চেক করা হয়েছে। এখানেই সময় পার্থক্যের সমস্যা, ডক্টর চন্দ্র। এখনি সবার সাথে সবার যোগাযোগ করার সময়। দেরি করা অনুচিত।
একেবারে বেহুশ কাজ-ভাবছে কার্নো, তার হাত এখন আর কাট অফ সুইচ থেকে দূরে যায় না। আমি সারা জীবন বিশ্বাস করি, হাল হল…একা। যন্ত্রটা কি চন্দ্রের ব্যক্তিত্বের একটা অংশের মতো আচরণ করছে যা আমরা কেউ আশাই করিনি?
লাইট মিটমিট করে, একজন মাত্র ডিসকভারির সব আচরণ সম্পর্কে জানে, তার খেয়াল করা উচিত। এটা ভাল খবর হোক,আর খারাপ-প্লাজমা ফায়ারিং শুরু হোক,না হোক…
সে চন্দ্রের দিকে এক মুহূর্ত তাকানোর রিস্ক নিল। ছোটখাট বিজ্ঞানীর চেহারা নিচের দিকে নোয়ানো, ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। প্রথমবারের মতো কার্নো তাকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে তার জন্য অন্তর থেকে মায়া অনুভব করছে। আর ফ্লয়েডের কাছে করা চন্দ্রের অনুরোধ শুনে তার বিশ্বাস হচ্ছে এই প্রথমবার। চন্দ্র শিপে থেকে যেতে চেয়েছিল, তিন বছর পর যখন হাল পৃথিবীতে ফিরত তখন পর্যন্ত কে তাকে সঙ্গ দেবে? এর পর কী হল তা সে জানে না। ওয়ানিংয়ের পর সব গড়বড় হয়ে গেল। চন্দ্র যদি আবারও এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এখন এমন হলে তার কিছু করার নেই। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়ার সময় নেই, এমনকি তারা যদি অন্য কোনো অর্বিটে থাকে, আর ডেডলাইনের পরে যেতে চায়, তবু নেই। এতকিছুর পর তানিয়া জীবনেও এমন প্রস্তাব মানবে না।
হাল? ফিসফিস করল ডক্টর চন্দ্রশেখর। এত আস্তে যে কার্নো চমকে উঠেছে, আমাদের যেতে হবে। তোমাকে সব কথা বলার মতো সময় নেই। কিন্তু নিশ্চয়তা দিতে পারি, সত্যি-কারণ আছে যাওয়ার।
