কার্নো এতটা নিশ্চিত নয়। সে ফ্লয়েডকে বলেছে, এক সেকেন্ডের চেয়েও যদি বেশি সময় লাগে, লাগবে চন্দ্রের জন্যই। রাতের আকাশ অনেক বেশি সুন্দর দেখায়। চারপাশের উপগ্রহের ঠিকরে পড়া আলোয় কী অদ্ভুত সুন্দর লাগে বৃহস্পতির মেঘমালাকে! তার উপর আলোক-সক্রিয় বিক্রিয়া আর পৃথিবীর চেয়ে লম্বা বিজলী রাতের আঁধারকে সরিয়েছে আরো দূরে।
একটু মুচকি হেসে সূর্য বিদায় নিল আজকের মতো। আর তারপরই আবার দেখা দেয়। তাদের বরং তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার চিন্তা করা উচিত।
ইগনিশনের বিশ মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে।
ধন্যবাদ, হাল।
চন্দ্র সত্যি কথা বলে থাকলে আমি বরং অবাক হব…ভেবেছিল কার্নো যখন চন্দ্র বলেছে যে সে ছাড়া অন্য কেউ হালের সাথে কথা বললে সে হয়ত ধাঁধায় পড়ে যাবে। কেউ না থাকলে আমি তার সাথে সব সময় কথা বলেছি। সবসময় সে আমাকে ঠিকমতো বুঝতে পারে। আর এখন তার সাথে বন্ধুত্বের কথা বলার মতো সময় কারো নেই, যদিও এটা সমস্যা কাটাতে পারত।
হাল সত্যি সত্যি চিন্তা করতে জানলে মিশন নিয়ে কী ভাবছে? সারা জীবন কার্নো নিজেকে নিয়ে একটা ঠাট্টা করে গেছে, কোনো দার্শনিক মার্কা কথাবার্তার সামনে পড়লেই, আমি হলাম নাট-বল্টর মানুষ। এমনকি স্পেসশিপেও সে এ দাবীই করত। অন্য সময় হলে হেসে কুটিকুটি হওয়া যেত যেটা ভেবে-সেটাই তাকে ভাবাচ্ছে বার বার, হাল যদি সত্যি চিন্তা করতে জানে, যদি না-ও জানে, শুধু জানতে পারে যে মহাকাশে ছেড়ে চলে যাওয়া হচ্ছে তাকে, মেনে নিতে পারবে? কার্নোর হাত নিজের অজান্তে আবারো কাট-অফ সুইচের দিকে চলে যাচ্ছিল। সংযত করল নিজেকে। এর মধ্যেই কাজটা এতবার করে ফেলেছে ও, চন্দ্র যে কোনো সময় সন্দেহ করে বসতে পারে।
পরের ঘণ্টায় যা করতে হবে, ভেবেই ও আরো শতবার হাত বাড়িয়েছে। ডিসকভারিকে ছেড়ে দেয়ার মুহূর্তে একেবারে প্রয়োজনীয় দু-একটা যান্ত্রিক ব্যাপার ছাড়া আর সব বন্ধ করে দিতে হবে। কমুনিকেশন টানেল ধরে লিওনভে ফিরতে হবে, এরই পর পর বিচ্ছিন্ন করার জন্য বিস্ফোরণ, এরপর লিওনভের বার্নিং-এরই মধ্যে বৃহস্পতির যতটা সম্ভব কাছে যাওয়া।
ইগনিশনের পনের মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিক চলছে।
ধন্যবাদ, হাল।
আচ্ছা, অন্য শিপ থেকে বলল ভ্যাসিলি, আমরা আবার সেই গ্রেট ব্ল্যাক স্পটের আওতায়। এবার নতুন কী দেখতে হয় কে জানে?
কানো এক বিন্দু নতুন কিছু দেখতে চায় না। আমাদের হাতে নতুন দেখার মতো অনেক অনেক জিনিস পড়ে আছে, অন্তত ইগনিশন পর্যন্ত। ভাবতে ভাবতেই ভ্যাসিলির পাঠানো ইমেজটা দেখে নিল মনিটরে।
প্রথমে হাল্কা উজ্জ্বল রাত ছাড়া আর কিছুই তার চোখে ধরা পড়েনি। তারপর লম্বালম্বি অতি কালচে আরেকটা অন্ধকার দেখা যাচ্ছে। ঠিক সেটার দিকেই তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। অসম্ভব গতিতে।
ভ্যাসিলি আলোর বিবর্ধন বাড়িয়ে দিতেই মনিটর আলোকিত হয়ে উঠল। অবশেষে দ্য গ্রেট ব্ল্যাক স্পট তার আসল রূপ নিয়ে বেরিয়ে এসেছে…নিজেকেই বলছে কার্নো, মাই গড! আমি বিশ্বাস করি না…না, বিশ্বাস করি না!
লিওনভে যারা অবাক হয়েছে তাদের কণ্ঠও সে পেল। একই মুহূর্তে একইভাবে বাকিরাও তাদের নিজের কথা বলেছে।
ডক্টর চন্দ্র, বলল হাল, আমি সবার কণ্ঠস্বরের লম্বা মোটা আর নিচু প্যাটার্ন পেলাম, কোনো সমস্যা?
না, হাল। দ্রুত জবাব দিল চন্দ্র, মিশন এগোচ্ছে সুন্দরভাবে। আমরা একটা অবাক ব্যাপার দেখেছি-এইমাত্র। মনিটর সার্কিট মোলতে যে ইমেজটা ফুটে উঠেছে সেটায় কী বুঝলে?
আমি রাতের বৃহস্পতি দেখতে পাচ্ছি। সেখানে একটা বৃত্তাকার এলাকা দেখা যাচ্ছে। ব্যাস তিন হাজার দুশ পঞ্চাশ কিলোমিটার, এর সব পদার্থই চতুষতলকীয়।
কতগুলো?
একদম ঘোঁট একটা বিরতি দেয়ার পর তার ভিডিও ডিসপ্লেতে হাল একটা হিসাব দেখালো: ১৩৫৫০০০–/+১০০০
আচ্ছা! আচ্ছা! তুমি কি সেগুলোকে চিনতে পারছ?
হ্যাঁ, তাদেরকে আকার আর গঠনে চেনা যাচ্ছে। যে জিনিসকে তোমরা বিগ ব্রাদার বল, ঠিক তার মতো। ইগনিশনের দশ মিনিট বাকি। সব সিস্টেম ঠিকমতো চলছে।
আমারটা ঠিকমতো চলছে না-কানো নিজেকেই শোনায়। সেই মরার জিনিসটা বৃহস্পতিতে নেমে গেছে, তারপর শুরু করেছে বংশবিস্তার! কালো মনোলিথের প্লেগ-বিস্তার দেখা বড়ই মজার ব্যাপার। কিন্তু আসলে ততটা মজা লাগছে না তার। আর একের পর এক বিস্ময় আসতে আসতে বিস্ময়-ক্ষমতাকে নেই করে দিয়ে বাতাসে শব্দের গতির সমান গতিতে মরার জিনিসগুলো আরো, আরো অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ছে।
অবশ্যই। এই সেটা! সেই ভয়াল কালচে চৌকোণা জিনিসগুলো তাকে ডমিনাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। কয়েক বছর আগে কিছু পাগলা জাপানীর ভিডিও দেখেছিল সে। লাখ লাখ ডমিনাস একের পর এক সাজিয়েছিল মাত্র একটা উদ্দেশ্যে-একটা ফেলে দিতে পারলে বাকিগুলো পড়ে যাবে, পড়বেই পড়বে। অত্যন্ত জটিল গঠনে সেগুলোকে বসানো; সার দিয়ে। কিছু পানির নিচে, কিছু উপরে, কিছু সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে, আবার কিছু বিভক্তও হয়েছিল, যাতে পড়ে যাওয়ার সময় সুন্দর দৃশ্য তৈরি হয়। কাজটা করতে কয়েক সপ্তাহ লাগে, কার্নোর মনে পড়ে, কয়েকবার ভেঙেও যায় ভূমিকম্পের কারণে। এরপর যখন চূড়ান্ত কাজটা শুরু হল-প্রথম ডোমিনো থেকে শেষটা পর্যন্ত-তখন শেষটা পড়েছিল একঘণ্টারও পরে, প্রতিটা ডোমিনো পড়ার সময় অন্যটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেছে।
