কিন্তু সেটা আস্তে আস্তে আরো বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে। প্রথম মুহূর্তে ফ্লয়েড একটু অস্বস্তি বোধ করছিল, এবার হঠাৎ যখন মনে হল এ স্পটটা কোনো প্রাকৃতিক জিনিস না…না, হতেই পারে না। বৃহস্পতির অসম্ভব বিস্তৃত আর বিচিত্র প্রকৃতির কোনো না কোনো রহস্য হবে। এবার একটু থমকে যাচ্ছে সে।
জিনিসটা রাতের মতোই কালো, একদম ঘনাকার, স্পষ্ট দেখার পর বোঝা যায় একেবারে নিখুঁত বৃত্ত! প্রান্তগুলো আশ্চর্যরকম অস্পষ্ট, যেন সেখানে ঠিকমতো ফোকাস করা হয়নি। এটা কি কল্পনা, নাকি যখন সে দেখছিল তখন এ জায়গাটা এমন হয়েছে? খুব দ্রুত হিসেব করে ফেলল, না, এখন-এ মুহূর্তে জিনিসটা দু হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত। এখন এটা ইউরোপার ছায়ার চেয়ে একটু ছোট। কিন্তু এত বেশি স্পষ্ট যে এটা নিয়ে অনিশ্চয়তার কোনো সুযোগই নেই।
একবার দেখি, বলল ভ্যাসিলি, কী পেলে তুমি খুঁজে…ও…হ…! কণ্ঠটা নিস্তব্ধতার মাঝে পথ খুঁজে নেয়।
এটাই সেটাবলল ফ্লয়েড মনে মনে। তার মনটাও যেন বরফ হয়ে যাচ্ছে। যাই হোক না কেন…
৪৭. শেষ উড্ডয়ন।
এখনো কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না বৃহস্পতির বুকে একটা বিস্তৃত হতে থাকা বিন্দু কীভাবে বিপদের কারণ হতে পারে? এটা অসাধারণ, ব্যাখ্যার অতীত হতে পারে কিন্তু তাদের জীবনে আসতে থাকা সাত ঘণ্টার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। আর মাত্র সাত ঘণ্টা সামনে যে প্রজ্বলন অপেক্ষা করছে তার পর পৃথিবীতে ফিরতে ফিরতে এ নিয়ে ভাবার অনেক সময় পাবে।
ঘুমাতে যাওয়ার আগে এ নিয়ে সব চিন্তা-ভাবনা ছেড়ে ছুঁড়ে দিল ফ্লয়েড, তাকে জেগে উঠে কাজ করতে হবে। এটাতো অজানা। তাদের জানা ভয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবার বৃহস্পতিতে আসার সময় তার ভয় ছিল, ছিল শিহরণ আর প্রথম দেখার মজা। এখন তার কিছুই নেই। ভয় আর ক্লান্তি শিহরণকে দূরে সরিয়ে দেয়। তার উপর অনিশ্চয়তা। ফ্লয়েড একটা নিয়ম মানে, যে ব্যাপারে তার বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ নেই সেটায় ভাবারও কোনো কারণ নেই; কোনো না কোনো সমাধান এসেই যাবে সময় মতো। তবু ভয় আছে কিছুটা, শিপের স-ব নিরাপত্তা ঠিকমতো দেখা হয়েছে তো?
যে কোনো শিপের যে কোনো সমস্যার বাইরেও আরো দুটা ভয় থাকে। এখনো টেপগুলো আলসেমি করেনি, তবে সামনে আসবে আসল গতি আর ঝাঁকি। আবার আছে সেই এক্সপ্লোসিভ, যেটা বিগ ব্রাদারের কাছে ফাটানো নিয়ে কথা উঠছে-সেরকম একটা দিয়েই টেপ বিচ্ছিন্ন করবে। উপরি পাওনা আছে হাল…
এখানে অর্বিটাল থেকে বেরুতে যে ধাক্কার দরকার সেরকম বিস্ফোরণ করার মতো প্রচুর বোমা আছে হাতে। ডিসকভারির শেষ জ্বালানিবিন্দু পর্যন্ত ডিসকভারিকে কাজে লাগানো গেছে আর কেউ আপত্তি করেনি। চন্দ্র সব ব্যাখ্যা করার পর হাল কি বুঝতে পারবে? মনে হয় না।
ফ্লয়েড আরো একটা সমস্যা নিয়ে পরল, গত কদিনে সেটাও কম ভোগাচ্ছে না। চূড়ান্ত সময় চলে আসবে, আকাশ জুড়ে দেখা দেবে বৃহস্পতি-মাত্র কয়েকশো কিলেমিটার নিচে, এমন সময় হালের ইলেক্ট্রিক গলা থেকে কথা বেরিয়ে আসবে যেন ঠাণ্ডা সুরে মন কেমন আছে জাতীয় প্রশ্ন করবে, ডক্টর চন্দ্র, একটা প্রশ্ন করলে কিছু কি মনে করবেন?
কিন্তু ঠিক এ পথে ব্যাপারটা হয়নি।
সেই বাড়তে থাকা গ্রেট ব্ল্যাক স্পট বৃহস্পতির দ্রুত ঘূর্ণনের কারণে আড়ালে চলে গেছে। কয়েক ঘণ্টা পর এই শিপ দুটো খুব কাছাকাছি হয়ে যাবে সেই স্পটের। কিন্তু তখন রাত। দিনের আলোয় সেটাকে দেখার শেষ সুযোগ চলে গেছে।
এখনো বাড়ছে খুব দ্রুত। গত দু ঘণ্টায় আয়তন হয়ে গেছে দ্বিগুণ। এর ছড়িয়ে পড়া যেন পানিতে ঘন কালির ছড়িয়ে পড়ার মতোই। এখন বৃহস্পতির এলাকায় প্রসারিত হচ্ছে শব্দের গতিতে। এর গঠন বোঝা যায় না স্পেসশিপের সবচে শক্তিশালী টেলিস্কোপ দিয়েও।
গ্রেট রেড স্পটের মতো গ্রেট ব্ল্যাক স্পট কোনো চলমান গঠন নয়। অসংখ্য ছোট ডট দিয়ে ভিতরটা গঠিত, ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে কোনো প্রিন্টকে যেমন দেখায়। এর বেশিরভাগ এলাকায় ডটগুলো এমনভাবে ছড়ানো যেন একটা আরেকটার সাথে মিশেই গেছে। কিন্তু প্রান্তের দিকের ডটগুলো অনেক অনেক বিস্তৃত, তাই এর শেষটা স্পষ্ট কালো না হয়ে বরং মিশেছে ধূসর হয়ে।
লাখ লাখ ডট আছেই। অনেকটাই যেন লম্বাটে, ডিম্বাকার। ক্যাথেরিনাকে বলা হয় শিপের সবচে কম চিন্তা করা কু-সে একটা কথা বলে সবাইকে অবাক করে দেয়। কেউ কালচে ভাত ঢেলে দিয়েছে বৃহস্পতির বুকে।
এখন সূর্যটা ঢলে পড়ছে বিরাট বৃহস্পতির পেছনে। আর লিওনভ উঠে এসেছে বৃহস্পতির রাতের আকাশে। আর ত্রিশ মিনিটের মধ্যে ফাইনাল বার্ন। এবার ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে খুব তাড়াতাড়ি। ফ্লয়েড যদি চন্দ্র আর কার্নোর সাথে ডিসকভারিতে থাকতে পারত! তার অবশ্য কিছুই করার নেই, চরম মুহূর্তে শুধু কাট আউট করে দিতে পারত। কাট অফ সুইচ কার্নোর পকেটে আর ফ্লয়েড জানে যে তরুণ ছেলেটা তার চেয়ে অনেক দ্রুত কাজ করতে পারে। হাল যদি এক বিন্দুও নষ্ট হওয়ার লক্ষণ দেখায় তাহলে সবার আগে কার্নো এক সেকেন্ডের মধ্যেই কাজ সেরে ফেলবে। কিন্তু হঠাৎ ফ্লয়েড বুঝতে পারছে, এমন কিছুর দরকার পড়বে না। চন্দ্র সহায়তা করবে, যদি ম্যানুয়াল কন্ট্রোল নিতেই হয়। ফ্লয়েড এটুকু বিশ্বাস করে যে চন্দ্র যা বলে তা ঠিকই করে।
