গ্ল্যামারাস, সুদর্শনা আইওকে বিদায় জানাও সবাই। এরা হল রিয়েল এস্টেট ব্যবসার স্বপ্নপুরী। চিৎকার করছে কার্নো, আমরা সবাই তোমাকে মিস করতে পছন্দ করি, ডিয়ার আইও!
এতদিনে ফিরে এল পুরনো ওয়াল্টারের সুর! ভাবছে ফ্লয়েড। এমন একটা ভাব নিয়ে শেষ কয়েক সপ্তাহ সে কাটিয়েছে, যেন তার মনে খুব চিন্তার কিছু একটা আছে! (কার ছিল না!) তার বেশিরভাগ অবসর সময় কাটত ক্যাথেরিনার সাথে গল্প করে, ফ্লয়েড মনে করে তার কোনো মেডিক্যাল সমস্যা নেই।
এই একটা ব্যাপারে তারা যথেষ্ট ভাগ্যবান। এতদিনে মেডিক্যাল কমান্ডারের করার মতো কঠিন একটা কাজ পাওয়া গেল আর এতদিনে কার্নোর তার সাথে গল্পের একটা সুযোগ চলে এল।
তোমার দয়ামায়া নেই, ওয়াল্টার? বলেছিল ব্ৰেইলোভস্কি।
আরে, আছে মানে? আমিতো আইওসুন্দরীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। ঐ লাভা লেকগুলো নৌকা বাওয়ার জন্য চমৎকার হত। লাল গলা ধাতুর উপর দাঁড় টানতে একটু কষ্ট হত-থকথকে, কিন্তু কী সুন্দর!
আর আগ্নেয়গিরির মধ্যে গ্রিল্ড খাবার গ্রিল করে বার্বিকিউ পার্টি আর জেনুইন গলা সালফারে সালফার বাথ?
প্রত্যেকেই অনেকটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কারো কারো মন আবার ইতিহাসের পাতা খুঁড়ে বের করছে অতীতকে। অথচ সামনে সবচে কঠিন সময়, এর মধ্যে প্রথম পদক্ষেপটাই শুধু ঠিকমতো নেয়া হল তাতেই এত আনন্দ।
বাড়তি খুশিটাকে তানিয়া বেশিদূর এগুতে না দিয়ে সবাইকে যার যার কাজে যেতে বলল, মানে কাজে যারা আছে, বকবক করছে তারাই, বাকিদের নির্দেশ দেয়া হল নিজের কেবিনে গিয়ে ঘুম দিতে। কারণ বৃহস্পতি-দোলন আর মাত্র নয় ঘণ্টা সামনে। যখন বাকিরা আস্তে ধীরে নড়ছিল, যেতে চাচ্ছিল না, তখন শাসা চিৎকার করে উঠল, তোমাদের সবাইকে কাজে এবং ঘুমে ফাঁকি দেয়ার জন্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আমরণ মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, মিউটিনির কুকুরেরা!
মাত্র দু রাত আগে একটা বিরল বিশ্রাম হিসেবে তারা মিউটিনি অন দ্য বাউন্টির চার নম্বর পর্ব দেখে। এর মধ্যে ক্যাপ্টেন নিয়ে হাস্যকর কিছু ব্যাপার ছিল। তারপরই সব গড়বড়। এমন কিছু হয়েছে শিপে যা আগে তানিয়া কল্পনাও করেনি। কাপ্তানকে নিয়ে ঠাট্টা!
দু ঘণ্টা কোকুনে শুয়ে ঘুমের চেষ্টার পর ফ্লয়েড অবজার্ভেশন ডেস্কে ফিরে এল। বৃহস্পতিকে আরও বড় লাগে। আস্তে আস্তে আঁধার ঘনিয়ে আসে, কারণ এবার অন্ধকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে জোড়া নৌকা। একটা বিশাল, মহাচাকতি-অসীম রহস্য বুকে নিয়ে অনেক বর্ণনা মাথায় তুলে থমকে আছে যেন। চোখ ধাঁধানো সাদা থেকে কটকটে লাল-সব রং খেলছে তার বুকে। কালো কালো উদগীরণ কোনো সে। দূরত্ব পার করে উপরে উঠছে! আবার আছে গ্রেট রেড স্পটের ডিমের মতন ঘূর্ণি। একটা গোলার মতো ছায়া পড়েছে, ইউরোপার হতে পারে। চোখ দেখে শেষ করতে পারবে না গ্রেট রেড স্পটের এলাকা। ফ্লয়েড ভাবল হয়ত ছায়াটা একটু পরই সরে যাবে। অবাক চোখে দেখছে বৃহস্পতিকে, শেষবারের মতো। যদিও ছটার সময় তাকে পুরো কোমর বেঁধে কাজে নামতে হবে-তবু এ সময় ঘুমিয়ে থেকে এ সৌন্দর্যকে না দেখার মাধ্যমে পাপ করার কোনো মানে হয় না।
মিশন কন্ট্রোল তাদের যে স্পটটা দেখতে বলেছে সেটা কোথায়? এর মধ্যেই দেখা যাওয়ার কথা। তবু ফ্লয়েড নিশ্চিত বলতে পারবে না খালি চোখে দেখা যাবে কিনা। ভ্যাসিলির এ সৌন্দর্য দেখার সময় নেই। কিন্তু ফ্লয়েডে এখন সৌখিন এস্ট্রোনট হওয়ার এক সুযোগ এসেছে। মাত্র ত্রিশ বছর আগেও সে একজন এস্ট্রোনট হিসেবেই নিজের পেট চালিয়েছিল।
মূল পঞ্চাশ সেন্টিমিটার টেলিস্কোপটাকে সক্রিয় করে দেশ ভাগ্য ভালই। সামনের সবটা জায়গা ডিসকভারি দখল করেনি। দেখা যাচ্ছে। মাঝারি পাওয়ারে সেট করে অক্ষরেখা দেখা শুরু হল। এবার উঠে আসছে পুরা বৃহস্পতি। পরিস্থিতির চাপেই বলতে গেলে, ফ্লয়েড পুরো সৌরজগতের সেরা দশ বৃহস্পতিবিদের মধ্যে একজন। বাকি নজন তার চারপাশে কাজ করছে নাহয় ঘুমাচ্ছে নাক ডেকে! দেখার সাথে সাথেই সে বুঝল, কিছু একটা মস্ত গণ্ডগোল আছে। ঐ গোল জায়গাটার মধ্যে। এটা এতই কালো যে মনে হচ্ছে মেঘও এর উপর নেই। তার মতে, এটা কোনো মসৃণ তলের পাহাড়-টাহাড় হবে। উপর থেকে দেখলে পুরো গোল দেখায়। এ অবস্থায় কয়েকটা ছবি তুলে পাওয়ার সবচে বেশি বাড়িয়ে দিল। এরই মধ্যে বৃহস্পতির দুত ঘোরার ফলে জিনিসটাকে আরো স্পষ্ট দেখাচ্ছে, আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে তারপর অস্ত যাবে অন্যদিকে।
ফ্লয়েড যত দেখে ততই অবাক হয়, ভ্যাসিলি, ইন্টারকম কথা বলে উঠল, একটা মিনিট নষ্ট করার মতো সময় থাকলে পঞ্চাশ সেন্টিমিটারের মনিটরে তাকাও।
দেখছ কী? জরুরি? আমি অর্বিট চেক করছিলাম।
তোমার তাহলে এখন দরকার নেই। মিশন কন্ট্রোলের বলা সেই স্পটের খোঁজ পেয়েছি। অদ্ভুত, অতি অদ্ভুত!
হায়রে! সব ভুলে যাওয়া উচিত ছিল আমার। মিশন কন্ট্রোলের লোকেরা অন্য সময় করতে পারত অনুরোধটা। দুনিয়ায় আরো লাখো লোক আছে এ কাজের জন্য। আমাকে আর পাঁচ মিনিট সময় দাও। এটা উবে যাবে না।
একেবারে সত্যি কথা, নিজেকেই বলছে ফ্লয়েড। এটা হাওয়ায় মিলিয়েতে যাবেই না বরং আরো স্পষ্ট হবে। দেখতে বলে কোনো ভুলই করেনি সেই পার্থিব..না, পার্থিব মানে পৃথিবীর, বলতে হবে চান্দ্র এস্ট্রোনোমাররা। ওরা খুবই ব্যস্ত ছিল। পৃথিবী আর চাঁদের সব মানুষের মতো টেলিস্কোপগুলোও তাকিয়ে ছিল বৃহস্পতির দিকে, হাঁ করে। তাই জিনিসটা চোখে পড়েছে। তাদের টেলিস্কোপ ফ্লয়েড যেটা ব্যবহার করছে তারচে হাজার গুণ বড় আর ভাল।
