আমাকে ভিতরে টেনে তোল। ই ভি এ তে কড়ায়গায় এক কেজি প্রোপ্যাল্যান্ট আছে, নিনাকে শেষবারের মতো বিদায় দেয়ার জন্য।
সাধারণত কোনো জিনিসকে স্পেসে স্টার্ট করার মধ্যে ছোট এক নাটকীয়তা লুকিয়ে থাকে। ব্যাপারটা সাধারণ আগুন আর বজ্রের মতো না। সব সময়ই কিছুটা ঝুঁকি থেকে যায়। অন্তত যখন একটা গ্রহের এলাকায় কাজটা করা হয়। একটু এদিক-সেদিক হলে, একটা যন্ত্র সর্বোচ্চ মানের কাজ না দিতে পারলে-হয়ত মূল যন্ত্র কাটিয়ে উঠতে পারে। হয়ত সঠিক অর্বিটের জন্য অপেক্ষাও করতে পারে কেউ কেউ। আর নাহলে…
কিন্তু এখন, কাউন্ট ডাউন শুরুর পর, দু শিপেই টেনশনের কাঁপন বোঝা যায়। প্রত্যেকেই জানে-এটা হালের প্রথম পরীক্ষা। শুধু ফ্লয়েড, কার্নো আর অর্লোভ জানে বিকল্পের কথা। কিন্তু কেউ জানে না সেটা কাজ করবে কিনা।
গুডলাক, লিওনভ বলল মিশন কন্ট্রোল। এটা ইগনিশনের পাঁচ মিনিট আগে শুনতে পাবে কুরা, আশা করি সব ঠিকমতো চলছে আর যদি সমস্যা না হয় তো অক্ষরেখার কাছাকাছি বৃহস্পতির কয়েকটা ছবি তুললে ভাল হয়। অক্ষাংশ হবে একশো পনের। একটা রহস্যময় কালো দাগ দেখা যায় সেখানে। কোনো আগ্নেয়গিরি বা অন্য কিছু হবে হয়ত। কমপক্ষে হাজার কিলোমিটার, নিখুঁত, গোলাকার। একটা উপগ্রহের ছায়ার মতো লাগবে দেখতে। কিন্তু তা হতে পারে না।
তানিয়া প্রায় ভদ্র কথায় ছোট একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে সাথে সাথে। এ মুহূর্তে তাদের কারোই বৃহস্পতির ভূগোল নিয়ে আগ্রহ নেই। ভাটা পড়েছে। মিশন কন্ট্রোল প্রায়ই দক্ষতা আর সময় কৌশলের দিক দিয়ে গাধামি করে। এখন বৃহস্পতি গবেষণার সময়।
সব সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করছে। বলল হাল, ইগনিশনের দু মিনিট বাকি।
অবাক ব্যাপার। ভাবছে ফ্লয়েড, কীভাবে জন্মের এত পরেও সায়েন্সের ব্যাপারগুলো মেশিনে আসন গেড়ে বসে থাকে! ইগনিশন শব্দটা শুধু কেমিক্যাল রকেটের ক্ষেত্রে বাস্তব। এমনকি যদি হাইড্রোজেন কোনো পারমাণবিক বা প্লাজমা ড্রাইভের মধ্যে অক্সিজেনের কাছাকাছি আসে, তাহলেই পোড়ার জন্য যেটুকু দরকার তারচে অনেক অনেক বেশি তাপ উৎপন্ন হবে। এ তাপমাত্রায় সব যৌগ তাদের মৌলে বিভাজিত হয়ে যায়। পোড়া বা ইগনিশনের মতো স্কুল ব্যাপার নেই।
তার মন আরো উদাহরণ খোঁজায় ব্যস্ত। আজো মানুষ-বিশেষ করে বুড়োরা বলে, ক্যামেরায় ফিল্ম বা গাড়িতে গ্যাস ইগনিশন! এমনকি রেকর্ডিং স্টুডিওগুলোতে এখনো শোনা যায়, টেপ কাটা শব্দটা। অথচ সেই টেপ আর তা কেটে কাজ করার পর পুরো দু প্রজন্ম চলে গেছে।
ইগনিশন আর এক মিনিট পর।
তার মন এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়। তাও…এই দীর্ঘতম মিনিটটা কাটছে না। গত শত বছরের মধ্যে এটাই যেন সবচে লম্বা মিনিট। এখন কাউন্ট ডাউনের কারণেই এত লম্বা লাগে। এর পর তাদের কী হবে?
বার বার ফ্লয়েড হাত দিয়ে বসছে পকেটের উপর। যেন এক মুহূর্তের জন্য হাতটা সরালেই কাট-আউটটা হাওয়া হয়ে যাবে। যুক্তি বলছে হাল একটু এদিক সেদিক করতে নিলেও তাকে শেষ করে দেয়ার যথেষ্ট সময় থাকবে। আর হাল যদি না-ই মানে, সেটা…আর যাই হোক, দুর্ঘটনা হবে না। সবচে ভয়ংকর সময় আসবে বৃহস্পতি ছাড়ানোর সময়টায়।
ছয়…পাঁচ…চার…তিন…দুই…এক…ইগনিশন!
প্রথমে টানটাকে সহজেই কাটানো গেল। মাধ্যাকর্ষণের দশভাগের একভাগ করতে পুরো দশ সেকেন্ড চলে যায়। সবাই কথাবার্তা শুরু করে দিলে তানিয়া থামার ইশারা করল। অনেক কিছু চেক করে দেখা বাকি, এমনকি হাল যদি তার কাজগুলো ঠিকমতো করতে থাকে, তারপরও এমন অনেক কিছু আছে যেটা বাদ পড়ে যেতে পারে।
ডিসকভারির এন্টেনা মাউন্ট নিয়েছে লিওনভের বেশিরভাগ ভর। এটার কোনোদিনই এমন ভারবাহী হওয়ার কথা ছিল না। অবশ্য শিপের অবসরপ্রাপ্ত চিফ ইঞ্জিনিয়ার বলেছেন যে এটাকে যথেষ্ট কাজে লাগানো যাবে। কিন্তু তিনি ভুল করে থাকতে পারেন, দশটা বছর স্পেসে খোলা ছিল জায়গাটা, কী হয়েছে কে জানে…
হয়ত দু শিপের মাঝে বাধার ফিতাগুলো ঠিকমতো জুড়ে দেয়া যায়নি। ছিঁড়তে পারে, ফসকে যেতে পারে। অকেন্দ্রিক ভরের কারণে ডিসকভারি ঠিকমতো কাজ নাও করতে পারে। এর পিঠে এখন হাজার টনি বোঝা। ফ্লয়েড এমন ডজন ডজন কারণ বের করতে পারবে যার একটু এদিকসেদিক হলেই হল! একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে। যদি বারোটা সম্ভাবনা ঠিকমতো উতরে যায়, তো তের নম্বরটা ঘাপটি মেরে বসে আছে।
কিন্তু মনের ভিতরটাকে খুঁড়ে খুঁড়ে চলেছে একের পর এক মিনিট। ডিসকভারির ইঞ্জিন যে চলছে তার একমাত্র প্রমাণ হল এক বিন্দু গ্র্যাভিটি আর অতি সামান্য কম্পন-যা দু শিপের দেয়ালে বাঁধা পেয়ে আরো মৃদু হয়ে তাদের কাছে পৌঁছায়। আইও আর বৃহস্পতি গত কয়েক সপ্তাহ যেখানে ছিল সেখানেই বসে আছে, আকাশের প্রান্ত দুটোয়।
দশ সেকেন্ডের মধ্যে কাট অফ হবে। নয়… আট… সাত… ছয়… পচ… চার… তিন… দুই… এক… এখন!
ধন্যবাদ, হাল। বাটনের উপর হাত এখনো।
গত এক প্রজন্ম ধরে আরো একটা কথা প্রচলিত, টাচ প্যাডগুলো বাটনের জায়গা দখল করে বসেছে। কিন্তু সব কাজের ক্ষেত্রে না। জটিল সময়ে এমন একটা ডিভাইস খুবই জরুরি যেটা একটা মাত্র ক্লিকে কাজ সারে।
আমি নিশ্চিত, বলছে ভ্যাসিলি, পথের মাঝখানে যাওয়া পর্যন্ত কোনো সংশোধনের দরকার নেই।
