যতদূর সম্ভব করেছি আর এবার ফিরছি বাড়িতে।
হেউড ফ্লয়েড বলছি, যোগাযোগ বন্ধ করলাম।
আশপাশের সবাই একটা কৃত্রিম আওয়াজ তুলল। কিন্তু এ আওয়াজটাই লাখ-কোটি গুণ জোরালো হয়ে উঠবে; মেসেজটা পৃথিবীতে আগে পৌঁছাক। একটু লজ্জা পেয়ে ফ্লয়েড সবাইকে বলল, আমি তোমাদের সাথে কথা বলছি না। চাইনি তোমরা শোন। যাই হোক…।
ঠিক কাজটাই করেছ, হেউড। তানিয়া স্বাভাবিক সুরে বলে, আমাদের সবাই তোমার প্রত্যেক কথার সাথে একমত, যা পৃথিবীর মানুষকে শোনালে।
আমি পারছি না একমত হতে। চন্দ্রের মৃদু কণ্ঠ শুনে সবাই চুপ মেরে গেল, একটা সমস্যা রয়ে গেছে।
অবজার্ভেশন লাউঞ্জ হঠাৎ একেবারে শান্ত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রথমবারের মতো ফ্লয়েড বাতাস ডাক্টের মৃদু শব্দ শুনতে পেল। ওয়াল প্যানেলের পেছনে আরো একটা যান্ত্রিক আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আর সব স্পেস শিপের মতো লিওনডেও নানা ধরনের আওয়াজ সব সময় হতেই থাকে। কিছু কিছু একেবারে নিরব অবস্থায় শোনা যায়।
আমি কোনো সমস্যা দেখছি না, চন্দ্র। শান্তভাবে তাকিয়ে আছে তানিয়া, কী প্রব্লেম হতে পারে?
কয়েক সপ্তাহ ধরে আমি হাল-কে পৃথিবীর কক্ষপথের দিকে হাজার দিনের যাত্রার জন্য প্রস্তুত করছি। এখন সব প্রোগ্রাম নষ্ট করতে হবে।
স্যরি, আমরা সবাই এ ব্যাপারে দুঃখিত, তানিয়া বলল, কিন্তু পরিস্থিতি এত খারাপ যে…।
আমি এ কথা বলিনি, চন্দ্রকে চিন্তিত দেখাচ্ছে, কণ্ঠের ঢেউয়ে বিস্ময়। এর আগে কোনোদিন কাউকে ডক্টর চন্দ্রশেখর কথার মাঝে থামিয়ে দেয়নি, তানিয়াকে তো নয়ই।
মিশন টার্গেটের জন্য হাল কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমরা সবাই জানি। একটু নিরবতা নিয়ে বলে যাচ্ছে সে, এখন তোমরা এমন কোনো প্রোগ্রাম দিতে বলছ যা
ওর মৃত্যু ডেকে আনবে। এ পরিকল্পনা ডিসকভারিকে একটা স্থিত অর্বিটে নিয়ে যাবে এ কথা ঠিক, কিন্তু যদি সেই ওয়ার্নিংয়ের মানে শিপের উপর ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলে? আমরা জানি না। কিন্তু এ চিন্তাই আমাদের ভয় পাইয়ে দেবে। এ অবস্থায় হালের রিঅ্যাকশন কী হবে ভেবেছ কেউ?
তুমি কি সিরিয়াসলি বলছ যে, তানিয়া সেই ঠাণ্ডা সুরে বলে যাচ্ছে, হাল মিশনের আগ মুহূর্তে অর্ডার নাও মানতে পারে, গত মিশনের মতো?
গতবার কিন্তু তা হয়নি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ও মনে রেখেছে নিজের মিশনের কথা। অর্ডার মানার চেষ্টা করেছে।
তাহলে এবার আর কোনো সমস্যা হবে না। সব ঠিকঠাক।
আমাদের কাছে পরিস্থিতি ঠিক হতে পারে, কিন্তু হালের সবচে জরুরি মিশনের একটা হল ডিসকভারিকে বিপদের বাইরে রাখা। ও সেটাই মানার চেষ্টা করবে। আর হালের মতো জটিল সিস্টেমের কোনো একটা নীতিকে বদলে দেয়া বা অগ্রাহ্য করা খুব কঠিন।
আমি খুব বেশি বাস্তব সমস্যা দেখি না। শাসা নাক গলায়, আমরা তাকে কোনো ঝুঁকির কথা বলব না। তখন সে…তার প্রোগ্রাম চালানোর সময় কোনো রিজার্ভেশন রাখবে না। এটাকে অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখবে না।
একটা পাগলা কম্পিউটারকে বাচ্চার খেলনা দিয়ে বুঝ দেবে? মুখ ভেঙুচাচ্ছে কার্নো, আমার মনে হয় কোনো দ্বিতীয় স্তরের সায়েন্স ফিকশন নাটকে কাজ করছি। ডক্টর চন্দ্র তার দিকে চেয়ে আছে শত্রু-শত্রু ভাব নিয়ে।
চন্দ্র, হঠাৎ যেন তানিয়া ভয় পেয়েছে, এ নিয়ে হালের সাথে কথা বলেছ?
না।
এক বিন্দু ইতস্তত ছিল কি কথাটায়? ফ্লয়েড সন্দেহ করছে। হয়ত হাল পুরোপুরি নিষ্পাপ, চন্দ্র এর মেমরি পুরোপুরি চেক করে থাকতে পারে। নাকি মিথ্যা কথা? কেউ প্রমাণ করতে পারবে না।
তাহলে শাসার কথামতো নতুন একটা প্রোগ্রাম লোড করতে দিয়ে বাকিটা তার হাতেই ছেড়ে দেব।
যখন সে আমাকে প্ল্যান পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন করবে তখন?
তোমার উস্কানি ছাড়া ও কি তা করবে?
অবশ্যই। প্লিজ, মনে করে দেখ, ওর ডিজাইন ছিল আগ্রহ আর জানতে চাওয়ার জন্য বানানো। কুরা যদি নিহত হয়েও থাকে, সে অবশ্যই মিশন চালানোর ক্ষমতা রেখেই করেছে বাকিটা।
কথাটা নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল তানিয়া, এখনো এটা এক সাধারণ সমস্যা। সে তোমাকে মানবে। বিশ্বাস করবে। তাই না?
অবশ্যই।
তাহলে তুমি অবশ্যই তাকে বলবে যে ডিসকভারির কোনো ভয় নেই। এ মিশনটা সম্মিলিত, এর মাধ্যমেই ডিসকভারিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে নেয়া হবে, কদিন পরে।
কখাটাতো মিথ্যা।
আমরা জানি না এটা মিথ্যা কিনা। এবার জবাব দিল তানিয়া একটু অধৈর্যের সাথেই।
আমরা ধরেই নিয়েছি সামনে মহাবিপদ। নাহলে শিডিউলের বাইরে এভাবে দৌড়াতাম না।
তাহলে তুমি কী করতে বল? এবার কথায় স্পষ্ট বিরক্তি।
যতটা জানি তাকে সব সত্যি কথাই বলতে হবে। কোনো আধা সত্যি বা মিথ্যা। পুরো সত্যি। তার পর তার সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দাও।
ইস, খোদা! চন্দ্র! ও শুধুই একটা মেশিন।
চন্দ্র এমন একটা দৃষ্টিতে তাকালো ম্যাক্সের দিকে যে তরুণ ছেলেটা সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেলে, আমরা সবাই তা, ডক্টর ব্রেইলোভস্কি। এখানে শুধুই উপাধির ব্যাপার, আর কিছু না। আমরা কার্বনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছি আর ও সিলিকন। কোনো পার্থক্যই নেই। আমাদের প্রত্যেককে যথেষ্ট সম্মানের সাথে দেখা উচিত।
অবাক ব্যাপার! ফ্লয়েড ভাবছে, কীভাবে-ঘরের সবচে খাট লোকটাকেই এখন মনে হচ্ছে সবচে বড়। কিন্তু সংঘাত এগিয়েছে অনেকদূর। যে কোনো মুহূর্তে তানিয়া সরাসরি অর্ডার ইস্যু করা শুরু করে দিবে। পরিস্থিতি হয়ে যাবে একেবারে বিশ্রী।
