আমি শিওর, তোমার ভাবনাটা ঠিক-ভাবল ফ্লয়েড। খুব ক্লান্ত লাগছে তার, যদিও ডিউটি নেই-ঘুমানো আসলে অসম্ভব। মনটা খুব বেশি ব্যস্ত। আজকের রাত, এর ঘটনা, পরে কী ঘটতে পারে, আগে কী হয়েছে…একদিক ভেবে অনেকটা মুক্তি পেল যেন; তারা যে যাচ্ছে, এটা নিশ্চিত। তানিয়ার আর অন্য সিদ্ধান্ত নেয়ার যো নেই।
কিন্তু বড় একটা অনিশ্চয়তা থেকেই যায়। হচ্ছেটা কী!
ফ্লয়েড তার জীবনে এমন আর মাত্র একটা ঘটনা মনে করতে পারে। অনেক আগে, টগবগে তরুণ ও। একটা ক্যানো নিয়ে অভিযানে বেরিয়েছিল। সাথে বন্ধুবান্ধব। কলোরাডো নদীর এক উষ্ণ প্রস্রবণের কাছাকাছি যাবার পর পথ হারিয়েছিল ওরা। ক্যানিয়নের দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খেয়েছে একের পর এক, বাদামের খোসার মতো। নিয়ন্ত্রণ ছিল এক বিন্দু। শুধু ভেঙে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পেরেছে খেয়াটাকে। সামনে অদেখা বিপদ। হয়ত কোনো ডুবো খাজ আছে, থাকতে পারে ডুবো পাথর, কিংবা স্বয়ং কোনো বিরাট ঝর্না; তারা জানত না। আর সে সময়টায় এই অনিশ্চয়তার পথে চলতেই হয়েছে, কারণ করার প্রায় কিছুই ছিল না।
আবারো ফ্লয়েড নিয়তির শক্ত হাতে আটকে গেল। টেনে হিঁচড়ে নিয়তি তাদের কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে, কোনো অজানা পরিণতির দেশে। এবারের ভয়গুলো শুধু অদেখা না, হয়ত ব্যাখ্যাতীত।
৪৫. মুক্তির ট্রেনিং
…হেউড ফ্লয়েড বলছি, সম্ভবত ল্যাগ্রেস থেকে এটাই আমার শেষ রিপোর্ট…
আমরা বাড়ি ফেরার জন্য গুছিয়ে নিচ্ছি সব। কয়েকদিনের মধ্যে এ অদ্ভুত জায়গা ছেড়ে যাব, এ জায়গা-আইও আর বৃহস্পতির মাঝখান, যেখানে আমরা সেই বিরাট, রহস্যময়, বর্তমানে অদৃশ্য আর্টিফ্যাক্টটার সাথে দেখা করেছিলাম…নাম দিয়েছি বিগ ব্রাদার। এখনো বিন্দুমাত্র সূত্র পাইনি যাতে বোঝা যায় কেন বা কোথায় সেটা গেল।
অনেক কারণে আমরা আর এখানে প্রয়োজনের চেয়ে এক মুহূর্ত বেশি সময় দিতে পারব না। পরিকল্পনার কমপক্ষে দু সপ্তাহ আগে রওনা দিচ্ছি আমরা। আমেরিকান স্পেসক্রাফট ডিসকভারিকে কাজে লাগিয়ে লিওনভ বেরিয়ে যাবে।
বেসিক আইডিয়া খুবই সরল, বড় শিপটার সাথে বোঝার মতো জুড়ে দিয়ে শুরু করা হবে। ঠিক পথে যাওয়া শুরু করলে ডিসকভারির সব জ্বালানি শেষ হওয়ার পর এটাকে ঠিক খালি ফার্স্ট স্টেজের মতো ফেলে দেয়া হবে-লিওনভ প্রথম স্পার্ক করবে ঠিক সে সময়। আগে লিওনভ জ্বলবে না, তাহলে মরা ডিসকভারির পেছনে শক্তি খরচ করা হবে। আমরা স্পেস ট্রাভেলের আরো একটা চালাকি কাজে লাগাব। আমাদের উদ্দেশ্য বৃহস্পতিকে ছাড়িয়ে যাওয়া হলেও, প্রথমে যত কাছে পারি যাব। আগে একবার আমাদের গতি কমিয়ে শিপটাকে অর্বিটে আটকে দেয়ার জন্য এ কাজ করেছি। এবার আর অত কাছে যাচ্ছি না।
আমাদের প্রথম প্রজ্বলন হবে আইওর সাড়ে তিন লাখ কিলোমিটার উপরের অর্বিটে। ফলে সরাসরি বৃহস্পতির দিকে পড়তে শুরু করব। বায়ুমণ্ডলে ঢুকে একেবারে কাছে চলে যাবার সাথে সাথে সব ফুয়েল জ্বলে উঠবে যাতে সাঁই করে লিওনভের স্পিড বেড়ে যায়, তারপরই পৃথিবীর অর্বিট।
এমন পাগলা পরিকল্পনার গাণিতিক ব্যাখ্যা একেবারে জটিলতম অঙ্কের কাজ ছাড়া এটা শেষ করা সম্ভব না। কিন্তু আমরা সাধারণ নিয়মগুলোকে এজন্যই কাজে লাগাব। যেহেতু বৃহস্পতির অসীম আকর্ষণে পড়তে দিচ্ছি আমাদের, গতি পাব, এটাই এনার্জি। আমরাটা হচ্ছে আমাদের দুনৌকা আর তাদের ফুয়েল। জানি, কী ভাবছেন, দুনৌকায় পা দিয়ে মরার অবস্থা হবে? আমরাতো মরেই আছি এখানে।
ফুয়েলটাকে ঠিক সেখানেই বার্ন করব যেটাকে লোকে বলে বৃহস্পতির আকর্ষণ কুয়া। উপরে ওঠার কোনো চেষ্টাই চলবে না। আমাদের রিয়্যাক্টরগুলো বাস্ট হলেই সেটার কাজে সরাসরি লাগবে এ কাইনেটিক এনার্জি গতিশক্তি। আমরা পৃথিবী ফেরার দোলনা বানাচ্ছি বৃহস্পতিকে…খুব একটা আরামদায়ক দোলনা না নিই। আর বিপরীতে কাজ করবে বায়ুমন্ডল। এর বাধার কারণে গতি কিছুটা কমবে, কুয়াতে পড়ে যাব না। শুধু ঠিকমতো হিসাব করতে হবে কৌণিক গতিশক্তির ব্যাপারগুলো। আর, এট খুব কমই হয়। মাতা প্রকৃতি দু-দিকেই সাফল্য খুব কম দেন, এই যা ভয়…
কাজ করবে এই তিন শক্তি, বৃহস্পতির আকর্ষণ, ডিসকভারির ফুয়েল আর ডিসকভারির বাড়তি ভরের কারণে বাড়তি গতি। আমরা পাঁচ মাস পর পৃথিবীতে আসছি। খুবই দ্রুত। অন্যভাবে চেষ্টা করলে অন্তত দু মাস বেশি লাগত।
আপনারা একেবারে চিন্তায় পড়ে যাবেন বুড়ো ডিসকভারির কী হবে তা ভেবে। পরিকল্পনা অনুসারে এটাকে আর অটোম্যাটিক যান হিসেবে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে পারছি না। ফুয়েল ছাড়া এর গতিই হবে না। কিন্তু ঠিক থাকবে। একের পর এক চক্কর মেরে যাবে বৃহস্পতির বিরাট এক অর্বিট ধরে। ফাঁদে পড়া ধূমকেতুগুলোর মতো ডিম্বাকার পথে ঘুরবে। পরের কোনো অভিযান মিলতেও পারে ওটার সাথে। কিন্তু তাদের অনেক বাড়তি ফুয়েল দরকার হবে এটাকে নিয়ে আসতে হলে। মনে হয় সামনের কয়েক বছরে সম্ভব না। এখন রওনার জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। অনেক কাজ বাকি। ফাইনাল বার্ন না হওয়া পর্যন্ত বিরাম নেই।
আমাদের সব কাজ করতে পারিনি, তবু গ্রহরাজকে ছেড়ে যেতে এক বিন্দু আফসোস নেই কারো। বিগ ব্রাদারের উবে যাওয়ার রহস্য…নাকি হুমকি, যাই হোক, আজো আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু সেটাকে নিয়ে করার মতো কিছুই নেই আমাদের।
