তখনো কি অনুমতি দিবে, তানিয়া? ক্যাপ্টেন অর্লোভা একটু হাসল, কিন্তু রসবোধ নেই তাতে, জানো, হেউড, আমি শিওর না। তাকে খুবই প্রভাব ফেলতে হবে আমার উপর। সে যদি তা পারে, তাহলে ভাবব।
৪৪. পালানোর কৌশল
এক ভয়ংকর খেলায় সবাই অংশ নিয়েছে, কিন্তু শুধু অফ ডিউটির সময়। এমনকি তানিয়া সেই থট এক্সপেরিমেন্ট-এ আইডিয়া দেয়। সে এখন কার্নো-ফ্লয়েড তত্ত্বকে এ নামেই ডাকে।
কিন্তু ফ্লয়েড ঠিকই জানে, এ কাজে কেউ তার মতো করে ভিন্ন কোনো প্রাণী বা অস্তিত্বের কথা ভেবে ভয় পেয়ে অংশ নিচ্ছে না। তারা সবাই আনন্দ নিয়েই এ কাজ করছে আর সেটা শুধু পৃথিবীতে ফেরার উত্তেজনায়। তারা মনে করে আর মাসখানেক পরে সেখানে পৌঁছবে। যা ভেবেই করুক না কেন, সে সন্তুষ্ট। নিজের শ্রেষ্ঠ কাজটা করেছে ফ্লয়েড, বাকিরা করবে কিনা তা ভাগ্যের উপর।
একটু ভাগ্য আছে ব্যাপারটায়। তা না হলে পুরো আশাই দুমড়ে-মুচড়ে যেত। লিওনভকে তৈরি করা হয়েছে শুধুই বৃহস্পতির জগতে আসার জন্য। এর গতি দ্রুত করে তুলতেই আকার করা হয়েছে অনেক ছোট-প্রায় ডিসকভারির অর্ধেক। সেই বিরাট লম্বা জিনিসটা হয়ত লিওনভকে কাঁধে করে সত্যি সত্যি এগিয়ে দিতে পারবে। শিপের মাঝখানের অ্যান্টেনার জায়গাটা পুরোপুরি নোঙরের কাজ দিবে। আশার কথা হল, এটা লিওনভের ভার ভালভাবেই নিতে পারবে, কারণ এখানে মাধ্যাকর্ষণ নেই।
পরের কয়েকদিন পৃথিবীতে যেসব অনুবোধ পাঠানো হয়েছে তা দেখে মিশন কন্ট্রোল যারপরনাই অবাক। শিপ দুটোরই অদ্ভুত ভার বহনের সময় কেমন আচরণ হয়; লম্ব-বিপরীত বলের ফলাফল; শিপ বডির কোনো কোনো জায়গা খুব দুর্বল অথবা শক্ত…এগুলো হল মাত্র কয়েকটা প্রশ্ন। আরো অনেক প্রশ্ন নিয়ে কাজ করছে। ইঞ্জিনিয়াররা, পাঠাচ্ছে পৃথিবীতে।
কোনো সমস্যা? হল মিশন কন্ট্রোলের প্রধান প্রশ্ন।
না। আমরা খুব খতিয়ে দেখছি সব ধরনের সম্ভাবনাকে। জবাব দিয়েছে তানিয়া। প্রতিবার বলেছে, আপনাদের সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ। ট্রান্সমিশন শেষ।
আর প্রোগ্রাম এদিকে চলছে ঠিকই। দু শিপের সব সিস্টেম সতর্কভাবে চেক করা হয়। প্রত্যেক যন্ত্রকেই আলাদাভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে অভিযানের জন্য। ফেরার কোর্সের উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে ভ্যাসিলি। চন্দ্র হালকে আরো শিখাচ্ছে যখন অন্য মেশিনগুলো ডিবাগিং ১৩৯ করা যায়। হালকে ফাইনাল চেক করার মতো করে তুলছে। ওদিকে তানিয়া আর ফ্লয়েড দুজনে বিগ ব্রাদার নিয়ে এমন পর্যবেক্ষণে মেতে গেছে, যুদ্ধ শুরুর আগে সারা জীবনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বুড়ো জেনারেলরা যেভাবে পর্যবেক্ষণ আর আক্রমণ পরিকল্পনা করে।
শুধু এটুকুই করতে চেয়েছিল সে। ব্যাপারটায় কোনো মজা পাচ্ছে না ফ্লয়েড। সে এমন একটা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে যার অনুভূতি বিশ্বাসীদেরও বোঝাতে পারবে না। কাজগুলো ঠিকই করেছে, বেশিরভাগ সময় মন ছিল অন্য কোথাও।
তানিয়া ঠিক ঠিক বুঝতে পারে তার আনমনা ভাবকে, তুমি এখনো সেই জাদু আশা করছ, যাতে আমি রাজি হই, না?
অথবা আমি নিজেই ভেগে যাবার ধান্ধা ছেড়ে দেই এমন একটা কিছু হোক। এই অবস্থা অসহ্য।
আমিও। হাতে সময় কম। ঝুলে না থেকে যে কোনো একদিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ভালভাবে তানিয়া পরিস্থিতি ডিসপ্লের উপর চোখ বুলালো। জ্বলছে ২০ সংখ্যাটা। এটা সবচে বেশি অপ্রয়োজনীয় ইনফরমেশন। সবাই জানে আর কদিন পর লঞ্চ উইন্ডো খুলবে।
জাগাদকার অভিযানের সময়ও এসেছে এগিয়ে।
.
দ্বিতীয়বারের মতো ফ্লয়েড কী হয়েছে তা খোঁজা শুরু করল। অন্যপথে। কিন্তু এত কিছু করেও কোনো ফারাক দেখা দেয় না। জরুরি মনিটর ক্যামেরা শুধু একটা ক্ষীণ চিহ্ন দেখাচ্ছে একটা ভর্তি আরেকটা খালি ফ্রেমের মাঝখানে।
এখনো ফ্লয়েড ডিসকভারিতে রাত-দুপুরে ডিউটি করে। তার জেগে থাকা সাথী একমাত্র শাসা, তাও সে লিওনভে বসে। নিয়মমতো রাতটা কাটে একেবারেই অলস। অটোমেটিক যন্ত্রগুলি তাদের কাজ ঠিকই চালিয়ে যায়। এক বছর আগেও সে কল্পনা করেনি যে বৃহস্পতির অর্বিটে, গ্রহ থেকে মাত্র কয়েক লাখ কিলোমিটার দূরে থেকে ফ্লয়েড ক্রোজার সোনাটা পড়তে পারবে। শাসার মতে এটা এখনো পুরো রাশিয়ান সাহিত্যের সবচে যৌনোদ্দীপক কিন্তু শ্রদ্ধা পাবার যোগ্য উপন্যাস। কিন্তু এ কথাটা প্রমাণ করার মতো যথেষ্ট এগোয়নি ফ্লয়েড। এখন সে কিছুতেই শেষ করবে না বইটা।
০১২৫টায় বিরক্ত হয়েছিল একটা কিম্ভুত ব্যাপার দেখে। অবশ্য অস্বাভাবিক বলা যায় না…আইওর আলো আর আঁধারের মাঝামাঝি এলাকায় এক বিরাট ছাতা আকৃতির মেঘ স্পেসে হারিয়ে গেল। এর অবশিষ্টটা নিচের জ্বলন্ত ভূমিতে পড়ে গেল আবার। ফ্লয়েড এমন বহু ঘটনা দেখেছে, কিন্তু কোনোটাই তার মনোযোগ কেড়ে নেয়নি। এখন মনে হচ্ছে এত ছোট কোনো দুনিয়ায় এত বড় এনার্জি থাকতেই পারে না।
একটু ভালভাবে দেখতে আরেক অবজার্ভেশন উইন্ডোর দিকে গেল ফ্লয়েড। এরপর এমন একটা কিছু সে দেখল, যা তাকে আইওর কথা ভুলিয়ে দিয়েছে, ভুলিয়ে দিয়েছে আর সবকিছুর কথা। যখন সে নিজেকে নতুন করে সন্তুষ্ট করছে আবার শুধু তার কপালেই ভোগান্তি নেই…এমন সময়ে! সে অন্য শিপকে কল করল।
গুড মর্নিং, উডি। হাই তুলল শাসা, না…আমি কিন্তু ঘুমাচ্ছিলাম না। বুড়ো টলস্টয়ের সাথে সময়টা কেমন কাটছে?
