ভয় না পেয়ে, এবং বিন্দুমাত্র আশ্চর্য না হয়ে ফ্লয়েড দেখল যে সেটা এক মানুষের রূপ নিচ্ছে আস্তে ধীরে। সে এমন গড়ন জাদুঘরে দেখেছে, কাঁচ থেকে আলো দিয়ে করা হয়। কিন্তু এই ভুতুড়ে ধুলাবালির স্তর তেমন না। এটা কাজ করছে পুরোপুরি কাদার মতো। অথবা প্রাচীন কোনো আর্টের নিদর্শন যেমন হয়, অনেকটা গুহার চিত্রকর্ম-তেমন। আর চেহারা! অবশ্যই সেটা কমান্ডার ডেভিড বোম্যানের।
ফ্লয়েড শুনতে পায় তার পেছন থেকে একটা ক্ষীণ ফিসফিসানি আসছে ভেসে। হালের সুইচ ভিডিও থেকে অডিওতে চলে গেছে। এবার শোনা যাচ্ছে কণ্ঠস্বর, হ্যালো, ডক্টর ফ্লয়েড, এবার বিশ্বাস হয় আমার কথা?
সেই গড়নের ঠোঁটগুলো নড়েনি। মুখটা রয়ে গেছে ঠিক মুখোশের মতোই। কিন্তু ফ্লয়েড ঠিকই চিনতে পারে সেই কণ্ঠকে। ঠাট্টার আর সব সম্ভাবনা শেষ।
আমার জন্য এ কাজটা খুব কঠিন। হাতে সময়ও খুব কম। আমাকে…অনুমতি দেয়া হয়েছে যাতে তোমাদের সতর্ক করতে পারি। তোমাদের হাতে শুধু পনের দিন।
কিন্তু… কেন? তুমি কী? এতদিন কোথায় ছিলে?
লাখো প্রশ্ন ঘুরছে তার মনে-কিন্তু সেই ভৌতিক শরীর এর মধ্যেই মিলিয়ে যেতে শুরু করে। ফ্লয়েড তার মস্তিষ্কে অবয়বটার ছবি ধরে রাখার চেষ্টা করছে যাতে পরে একে ভুল না মনে হয়। যেন টি এম এ-১ এর সাথে সেই প্রথম দেখার মতো স্বপ্ন না মনে হয়।
কী অবাক ব্যাপার, শত কোটি মানুষের ভীড়ে শুধু সে-ই দু বার অন্য বুদ্ধিমত্তার সাথে যোগাযোগ করতে পারল! এটুকু বোঝা যায়-এই অস্তিত্ব ডেভিড বোম্যানের চেয়েও বেশি কিছু।
আরো কিছুর অভাব আছে ছবিতে। শুধু চোখটাই যেন জীবন্ত-একেই কি হৃদয়ের জানালা বলে? শরীরের বাকিটুকু শুধুই খোলস, কোনো বিস্তার নেই এর। এর মধ্যে কোনো যৌন অংশ বা বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় না। ওহ! বোঝাই যাচ্ছে ডেভিড বোম্যান তার মানবীয় বৈশিষ্ট্যগুলোকে ছাড়িয়ে চলে গেছে কতদূরে!
বিদায়, ডক্টর ফ্লয়েড, মনে রেখ-পনের দিন। আমাদের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ হবে না। কিন্তু সব ঠিকমতো চললে আরো একটা মেসেজ আসতে পারে।
সেই দৃশ্য মিলিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তারার দেশের সাথে যোগাযোগের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে গেল তারকা শিশু। তবু, ফ্লয়েড সেই পুরনো মহাকাশ বাণী শুনে না হেসে পারল না, সব ঠিকমতো চললে… কতবার স্পেস মিশন শুরুর আগে সে এ কথা শুনেছে? এ দিয়ে কি বোঝায় যে, এ বুদ্ধিমত্তারা যাই হোক না কেন, ভবিষ্যৎ তাদের কাছেও অনিশ্চিত? তা হয়ে থাকলে অনেক বেশি আশা যোগায়। তারা সর্বশক্তিমান নয়। তার মানে আজো আশা আছে-স্বপ্ন আছে-করার মতো কিছু আছে।
চলে গেছে ভূতটা। শুধু নাচতে থাকা ধূলা চারপাশে। তাদের সেই চারদিকে চলার নীতি বজায় রেখে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে ধূলিকণারা।
৬. ষষ্ঠ পর্ব : জগৎ-শিকারী
ষষ্ঠ পর্ব : জগৎ-শিকারী
৪২. মেশিনে ভূত
স্যরি, হেউড, আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। নিশ্চই কোনো বাস্তব ব্যাখ্যা আছে। মানব মন বুঝে উঠতে পারবে না এমন কিছুই নেই।
মানছি, তানিয়া। কিন্তু হালডনের সেই বিখ্যাত উক্তিটা মনে করিয়ে দিচ্ছি, ইউনিভার্স আমাদের কল্পনার মতো অদ্ভুত না-বরং কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি অদ্ভুত।
এবং হালডন ফোঁড়ন কাটল কার্নো, একজন দারুণ কমিউনিস্ট ছিলেন।
হয়ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর উক্তি সব ধরনের অদ্ভুত ব্যাপারকে প্রথমেই সমর্থন করে। হালের সেই অবাক করা আচরণ অবশ্যই কোনো না কোনো প্রোগ্রামিংয়ের ফল। যে…ব্যক্তিত্ব সে গড়ে তুলেছিল তা অবশ্যই কোনো না কোনো রকমের কৃত্রিম সৃষ্টি। আমার সাথে একমত তুমি, চন্দ্র?
এ ব্যপারটা ভয়াবহ। একটা পাগলা ষাঁড়ের সামনে লাল পতাকা নাড়লে যা হয় আর কী! তানিয়ার হতাশ হতেই হবে। চন্দ্রের ব্যবহার কিন্তু খুবই শান্ত। যেন তাকে। দখল করে রাখা হয়েছে আগে থেকেই। যেন তার মনেও কম্পিউটারের নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
অবশ্যই কোনো বাহ্যিক ইনপুট থাকতে হবে, ক্যাপ্টেন অর্লোভা। হাল নিজে নিজে হাওয়া থেকে এমন অডিওভিজুয়ায় ব্যাপার করতে পারে না। যদি ডক্টর ফ্লয়েড সঠিকভাবে রিপোর্ট করে থাকে, তাহলে কেউ না কেউ হালকে কন্ট্রোল করছিল। এবং অবশ্যই করছিল সাথে সাথে, সে সময়েই। কারণ দু কথার মাঝে কোনো সময় পার্থক্য নেই।
তো, দোষটা আমার ঘাড়েই চাপবে, কারণ তখন আর কেউ জেগে ছিল না। বলল ম্যাক্স।
ঠাট্টা করোনা, ম্যাক্স। জবাব দিলো নিকোলাই, অডিও সাইড হয়ত সহজ, কিন্তু …অন্য ব্যাপারটার কথা বলছি। খুব বেশি শক্তিময় বেশকিছু যন্ত্র ছাড়া কীভাবে সম্ভব? লেসার বিম, ইলেক্ট্রিক ফিল্ড ছাড়া…আমি জানি না। একজন স্টেজ ম্যাজিশিয়ান হয়ত করতে পারত, কিন্তু তারও দরকার পড়বে ট্রাক বোঝাই যন্ত্রপাতি।
জাস্ট এ মোমেন্ট, উজ্জ্বল হয়ে বলল জেনিয়া, সত্যি সত্যি হয়ে থাকলে হালের মনে থাকবে। তাকে জিজ্ঞাসা করছ না কেন…
তার কথা বন্ধ হয়ে গেল চারপাশের গুমোট ভাব দেখে। ফ্লয়েড প্রথমবারে তার কথার উপর দয়া দেখায়, চেষ্টা করেছি, জেনিয়া; তার কিছুই মনে নেই। যেহেতু সবার কাছে এরিমধ্যে আমি বলে ফেলেছি, হালের বলা না বলায় কিছু যায় আসে না। চন্দ্র দেখিয়েছে কীভাবে হালের নির্দিষ্ট স্মৃতি বাদ দেয়া যায়। আর অক্সিলারি স্পিচ সিন্থেসাইজারের সাথে মূল মেইনফ্রেমের৬২ তেমন যোগাযোগ নেই। হালকে na জানিয়ে সিন্থেসাইজারকে অপারেট করা যায়… এক মুহূর্তের জন্য থেমেই সে তার আসল অধিকার নিয়ে কথা বলল, আমি বলতে চাই এখানে খুব বেশি অল্টারনেটিভ নেই। হয় আমি পুরো ব্যাপারটা কল্পনা করেছি, নাহয় সব সত্যি। স্বপ্ন যে না তা আমি জানি, কিন্তু নিশ্চিত করে বলতে পারব না সম্মোহন বা হেলুসিনেশন ছিল কিনা। ক্যাথেরিনা দেখেছে আমার মেডিক্যাল রিপোর্ট। সে জানে, এমন সমস্যা থাকলে আমার শিপে থাকার অধিকার নেই। এখন আমি বেরিয়ে যেতে পারি না। আর আমার ভুলকে তাদের এক নম্বর হাইপোথিসিস মনে করে নিলেও দোষ দেব না। আমিও হয়ত সেটাই ভাবতাম, যা অন্যে ভাবছে।
