ডেভ, আমার হৃদয় চলে যাচ্ছে। আমি এটা অনুভব করছি।
আমি এটা অনুভব করছি। ভয় পাচ্ছি, ডেভ।
আমি অনুভব করছি…
এখন, একটা কম্পিউটারের কাছে আসলে অনুভব এর সত্যিকার মানেটা কী? আরেকটা দারুণ প্রশ্ন। কিন্তু এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবার সময় তখন কারো ছিল না।
একেবারে হঠাৎ করেই হালের কণ্ঠ বদলে গেল। যেন দূর থেকে ভেসে আসছে, বিচ্ছিন্ন কোনো কণ্ঠ। কম্পিউটারটা আর সচেতন নয় নিজের ব্যাপারে; এবার প্রাথমিক দিনগুলোতে ফিরে যায় হাল।
গুড আফটারনুন, জেন্টলম্যান। আই এম এ হাল নাইন থাউজ্যান্ড কম্পিউটার। আমি সক্রিয় হয়েছিলাম হাল প্ল্যান্টে; সেটা আরবানা, ইলিনয়েসে…জানুয়ারির বারো তারিখ, উনিশো বিরানব্বই…আমার প্রশিক্ষক ছিলেন ডক্টর চন্দ্র, তিনি আমাকে একটা গান গাইতে শিখিয়েছেন। আপনি যদি ওটা শুনতে চান, আপনার জন্য গাইতে পারি… এর নাম ডেইজি, ডেইজি…
টেপ রেকর্ডারের টেপ অনেক পুরনো আর ডাম্প হয়ে গেলে যেমন হয়, আস্তে আস্তে তেমন হয়ে যাচ্ছে হালের কণ্ঠ, লম্বাটে, টানা টানা। এখনো ডেভ বোম্যান একের পর এক ব্লক তুলে যাচ্ছে। দু হাজার এক সালের কথা।
ডেইজি…ডেইজি…দাও তোমার জবাব, ডেইজি…
তোমার…ভালবাসার…জন্য…আমি…হাফ ক্রেইজি…
মোটেও চমৎকার বিয়ের অনুষ্ঠান হবে না…
আমি খুব দামী গাড়ির ব্যবস্থা করতে পারব না…
কিন্তু তোমাকে দেখাবে মিষ্টি…
সিটের উপর, অনন্য সৃষ্টি…
একটা বাইসাইকেলের উপর, তুমি জানো?
শুধু… দুজনের… জন্য… বানানো………
৪১. অপচ্ছায়া
পথ থেকে দূরে যাওয়ার ব্যাপারে ফ্লয়েড একটু আশা করতে পারত, এর মধ্যেই এ ব্যাপারে ও অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে গেছে, চতুরও। শিপের বাইরের কাজে দু একবার সাহায্য করলেও হঠাৎ করেই বুঝতে পারছে কাজগুলো অনেক বেশি ইঞ্জিনিয়ারিং ধরনের। আর আজ সে তার সেই বিশেষ কাজ থেকে অনেক দূরে। তার বর্তমান কাজে নিজের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল রিসার্চ অনেক কম কাজে লাগবে। ভ্যাসিলির জন্য খুব কম সহায়তাই করবে তার দৃষ্টিশক্তি। এ ছাড়াও লিওনভ আর ডিসকভারিতে টুকিটাকি অনেক অনেক কাজ থাকে যেগুলো করতেই হয় কারো না কারো। এসব করে অন্য গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোকে এড়াতে তার বেশ লাগে।
ডক্টর হেউড ফ্লয়েড, ন্যাশনাল কাউন্সিল অন অ্যাস্ট্রোনটিক্স এর এক কালের চেয়ারম্যান আর হাওয়াই ইউনিভার্সিটির বর্তমান আচার্য (ছুটিতে) আজ কিনা একজন পাইপের কাজ করার মিস্ত্রী, একজন সাধারণ রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী! অবশ্য সৌরজগতের সবচে বেশি অর্থ দেয়া হচ্ছে তাকে এ কাজের জন্য, ভবিষ্যতেও কেউ হয়ত এ কাজের জন্য এত পাবে না। অবশ্য সে-ই দু শিপের সব অদ্ভুত কোণা আর জায়গা সবচে বেশি চেনে। যেখানে সে কখনো যায়নি সেখানটা ভয়াবহ রেডিও অ্যাকটিভ১৬০ পাওয়ার মডিউলে ভর্তি। আর সেই ছোট কিউবিকল যেটায় তানিয়া ছাড়া আর কেউ কখনো যায় না। ফ্লয়েডের ধারণা এটাই কোড রুম; ভদ্রভাবে, কোনো কথা না তুলে সবাই কিউবিকলটাকে এড়িয়ে যায়।
হয়ত তার একা থাকার জন্য সবচে ভাল কাজ একটা ঘড়ির মতো চলা; যখন আর সবাই ঘুমায়-২২০০ থেকে ০৬০০ পর্যন্ত, তখন। প্রতি শিপেই সব সময় কেউ না কেউ ডিউটিতে থাকে। সেই পালা বদল হয় বিরক্তিকর ০২০০ ঘণ্টায়। একমাত্র ক্যাপ্টেনই রুটিনের বাইরে। তার অ্যাসিস্ট্যান্টের (তার স্বামী বলা উচিত না এক্ষেত্রে) বা ভ্যাসিলিরও কাজের দায়িত্ব আছে, কিন্তু সে খুব ভালভাবেই এ ধরনের বিশ্রী কাজ ফ্লয়েডের হাতে গছিয়ে দিতে পারে।
আমার দায়িত্বটা আমি না নিলে প্রশাসনিক ব্যাপারে হেল্প করা হয়, সে লঘুচালে বলে যায়, তুমি যদি কাজটা নাও তো আমি খুবই খুশি হতাম-এর ফলে জআমি আমার সায়েন্টিফিক কাজের জন্য বেশি সময় পেতাম, আরকী…
ফ্লয়েড খুবই অভিজ্ঞ প্রশাসনিক মানুষ। তাকে এ পদ্ধতিতে পটানো বা কোনোকিছু গছানো সম্ভব না। কিন্তু সময়টা আলাদা। এমন পরিবেশে ফ্লয়েডের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা কাজ করে কম।
এজন্যেই শিপের মধ্যরাতে তাকে থাকতে হয় ডিসকভারিতে। ম্যাক্সকে প্রতি আধঘণ্টা পর পর কল করতে হয়, বোঝাতে হয় যে সে ঘুমায়নি। ঘুমাতে দেখলে অফিশিয়াল কাজটা হল এয়ারলক দিয়ে শাস্তি দেয়া। ওয়াল্টার কার্নো সেটা নিষ্ঠার সাথেই করে। কিন্তু স্পেসে সত্যিকার ইমার্জেন্সি খুব কমই দেখা দিয়েছে। আর অনেক অটোম্যাটিক অ্যালার্মও আছে কাজ করার জন্য, একজন মানুষকে এত সতর্কভাবে ডিউটিতে থাকতে হয় না।
শেষমেষ নিজের এ হাল হওয়ায় খুব একটা কষ্ট পায়নি ফ্লয়েড। ঘন্টাগুলো তেমন বিরক্তও করে না। ফ্লয়েড তাই ঘড়ির কাজ দিয়ে চলে। সব সময়ই পড়ার মতো বই পাওয়া যায় তরীতে (সে তৃতীয়বারের মতো রিমেমব্রেন্স অব থিংস পড়া শুরু করেও বাদ দিয়েছে। আর ডক্টর জিভাগো দ্বিতীয়বারের মতো।), টেকনিক্যাল কাগজপত্র পড়তে হয়, রিপোের্ট লিখতে হয়, আর মাঝে মাঝে হালকে জাগিয়ে তোলার মতো কিছু কথাও হয়েছে, কিন্তু কিবোর্ডে। কম্পিউটারের ভয়েস রিকগনিশন অংশ এখনো নষ্ট। মাঝে মাঝে কথা হয় তাদের মধ্যে,
হাল, ডক্টর ফ্লয়েড বলছি।
শুভ সন্ধ্যা, ডক্টর ফ্লয়েড।
আমি চলে যাব ২২০০ টায়। সব ঠিকঠাক তো?
সব দারুণ চলছে, ডক্টর।
তাহলে প্যানেল ফাইভের উপর লাল বাতি কেন?
