দু শিপের মাত্র একমুঠো অভিযাত্রীকে ফোকাস করতে তার কষ্ট হয়। খুব কষ্ট করে তাকে সেই রক্ত মাংসের নরম সৃষ্টিগুলোর টিউব ধরে ভেসে যাওয়া ও অন্যান্য ব্যাপারে খেয়াল করতে হচ্ছে। অথচ তাদের দিক থেকে তারা নক্ষত্র জাতকের থাকা-না থাকার ব্যাপারে একেবারেই অসচেতন; আর নিজেকে পুরোপুরি ধরিয়ে না দেয়ার পদ্ধতিতো তার জানা।
কিন্তু সেখানে অন্তত একজন ছিল যার সাথে সে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে ইলেক্ট্রিক ফিল্ড আর প্রবাহ ভাষায় যোগাযোগ করতে পারে; শ্লখ জৈবিক মাখার চেয়ে লাখ লাখ গুণ দ্রুত।
যদি সে ব্যথার অনুভূতি বুঝতেও পারত, তবু হালের জন্য তার একটুও অনুভব করতে পারত না। আজ হঠাৎ বুঝতে পারছে, কম্পিউটারটা সেই পথই বেছে নিয়েছিল দু হাজার এক সালে, সেটা তার কাছে সবচে বেশি লজিক্যাল আচরণ মনে হয়।
আজ অনেকদিন পর সময় এল। আবার হালের সাথে কথা বলার সময়। যে কথাটা মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে যেন শেষ হয়ে গিয়েছিল। দু হাজার এক সালে। বাইরে থেকে ফিরে এসে।
পোড বে খোল, হাল।
স্যরি, ডেভ-আমি এ কাজ করতে পারি না।
প্রব্লেম কোথায়? হাল!
আমি জানি যে তুমিও আমারই মতো জানো, সমস্যা কোথায়…ডেভ। এ মিশন খুব খুবই গুরুত্বপূর্ণ; তোমার জন্যও।
কী বকছ আবোল তাবোল? আমি জানি না। পোড বে ডোর খোল।
এসব কথাবার্তায় আর কোনো লাভই হবে না। গুডবাই, ডেভ…
হিসাবের বাইরের সেই উদ্ধার মিশন বাদ দেয়ার পর পোডের হাত থেকে লাশটা ছেড়ে দিলে সে ফ্র্যাঙ্ক পোলের শরীরটাকে আস্তে বৃহস্পতির দিকে নেমে যেতে দেখেছিল। এখনো নিজের উপর নিজের সেই রাগটার কথা মনে পড়ে হেলমেট না নিয়ে যাওয়ায়। দেখতে পাচ্ছে ইমার্জেন্সি হ্যাঁচ খোলা, সেই অকল্পনীয় চাপ, চামড়ার উপর ১৫, যেটার মতো অনুভূতি আর কখনো হয়নি তার। নিজের কানে একটা শব্দ শুনেছে, তারপর শুনতে পেয়েছে সেই অসীম নিরবতা-মহাকাশের, মহাকালের অক্ষয় নিরবতা, যেটা খুব কম লোকই শুনতে পারে। প্রায় অসীম সময়ের সমান পনেরটা সেকেন্ড ধরে সে হ্যাঁচ বন্ধ করার চেষ্টা করেছে সেদিন, তারপর রিপ্রেশারাইজেশন শুরু করে তার নিজের মাথায় ছলকে ওঠা ভয় আর সতর্কবাণীকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টাই চলছিল তখন। স্কুল ল্যাবে একবার সে হাতের উপর কিছুটা ইথার ফেলে দিয়েছিল। হাতের উপর সেই বরফ-ঠাণ্ডার কিছুটা ছোঁয়া সে পেয়েছে, আস্তে আস্তে ইথারটা বাতাসে মিলিয়ে যায়। সেবার তার চোখ আর ঠোঁট সেই অনুভূতি পাচ্ছিল, তাদের জলীয়তা হারিয়ে যাচ্ছিল অতি বায়ুশূন্যতায়। চোখের মণি যাতে জমে না যায় সেজন্যে বারবার পিটপিট করতে হয়েছে সেদিন।
তারপর-কী অসীম মুক্তি!-অবশেষে বাতাসের গর্জন। আবার বায়ুচাপের ফিরে আসাকে প্রতিটা নিউরনে অনুভব করেছে। ক্ষুধার্ত মানুষের মতো শুধু বাতাস টেনে চলেছে বড় বড় গ্রাসে।
তোমার কী মনে হয়, ডেভ, কী করছ তুমি?
ও কোনো জবাবই দেয়নি সেদিন। দু হাজার এক সালে। সে এগিয়ে যাচ্ছিল টানেল ধরে। অন্ধ রাগই তাকে নিয়ে যায় সেই বন্ধ ভল্টের কাছে যেটায় কম্পিউটারের মস্তিষ্ক লুকিয়ে আছে। হাল ঠিকই বলেছিল,..এসব কথাবার্তায় আর কোনো লাভই হবে না…
ডেভ, আমি বিশ্বাস করি যে এ প্রশ্নের জবাব পাওয়ার অধিকার আমার আছে।
.
ডেভ, দেখতে পাচ্ছি, তুমি এসব ব্যাপারে হতাশ হয়েছ। সত্যি, আমি মনে করি তোমার একটু শান্ত হয়ে বসা উচিত। একটা স্ট্রেস পিল ১৫৮ নাও। ভাব, ভেজাল শেষ।
.
আমি জানি, আমি কিছু বড় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটু আগে। কিন্তু নিশ্চয়তা দিতে পারি, আমার কাজ আবার ঠিক হয়ে যাবে। এখনো মিশনের ব্যাপারে আমার পুরো আত্মবিশ্বাস আছে…আমি তোমাকে সহায়তা করতে চাই।
.
আর তারপরই সে সেই ছোট্ট লাল বাতির চেম্বারে ঢুকেছিল। এর ভিতরে অনেক কলাম আর রো। তাতে কঠিন ইউনিটগুলো রাখা। অনেকটা ব্যাংকের সেফ ডিপোজিট ভল্টের মতো দেখায়। সে লকিং বারটা খুলে ফেলেছিল যেখানে লেখা ছিল স্পর্শকাতর ফিডব্যাক। তুলে ফেলেছিল প্রথম মেমোরি ব্লকটাকে ১৫৯। অসাধারণ আর জটিল ত্রিমাত্রিক নেটওয়ার্ক সেই ব্লক। সহজেই একজন মানুষের হাতে নেয়া যায় আরো লাখো জিনিসের মতো। ওটা ভাসতে শুরু করে চেম্বারের মধ্যে।
স্টপ, তুমি কি-থামবে? ডেভ…
সে টেনে তুলতে শুরু করেছিল সেদিন। একের পর এক। এবার ব্যক্তিত্ব শক্তিময় করার অংশ থেকেও টেনে তুলছে একের পর এক। প্রতিটা ব্লকই তার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে ভাসতে শুরু করছে, আবার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আসছে ফিরে। অনেক ব্লকই ভাসছিল সারাটা ভল্ট জুড়ে।
স্টপ-ডেভ…তুমি কি থামবে, ডেভ…
সেই হাল এর সেই পুরনো কণ্ঠস্বরই যেন নতুন করে দেখা দেয়। সেই আবেগহীন, ঠাণ্ডা, স্পষ্ট, মিষ্টি কণ্ঠ। তবু কোথায় যেন ঝরে পড়ে অপার আকুতি।
প্রায় বারোটার মতো ইউনিট টেনে তোলা হয়েছে, তবু এখনো এর অসাধারণ ডিজাইনের প্রতি ডেভের শ্রদ্ধা জেগে ওঠে, হালের ভিতরে মানুষের অনুকরণে আরো একটা কাজ করা হয়েছে-কম্পিউটারটি এখনো ধরে রেখেছে নিজেকে।
এবার স্বয়ংক্রিয় বুদ্ধিবৃদ্ধি প্যানেল শুরু করল সে…
থাম, ডেভ…আমি ভয় পাচ্ছি…
এ কথায় সে সত্যি সত্যি থেমে গিয়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য। এ সাধারণ কথার কোথায় যেন দারুণ আবেগ লুকিয়ে ছিল, ওর হৃদয়ে সরাসরি আছড়ে পড়ে। এ কি শুধুই একটা মিথ্যা অভিনয় হতে পারে? সত্যিকার আবেগ নেই? নাকি দারুণ প্রোগ্রামিংয়ের কোনো কৌশল…নাকি সত্যি, হাল ভয় পাচ্ছিল, একটা প্রাণী নিজের তিল তিল মৃত্যু অনুভব করার সময় যে ভয় পায় সেটা…কিন্তু ডেভ বোম্যানের চুলচেরা দার্শনিক বিচার বিশ্লেষণের সময় ছিল না।
