এটাই আমার ভয়। কুঁকড়ে গিয়ে বলল কার্নো। ফ্লয়েড একটু মুচকে না হেসে পারল না। কার্নো ব্যাপারটা উপভোগ করছে, কারণ ফ্লয়েড হাসছে, কার্নোর উপভোগের আরেক কারণ…
একটু পর লম্বা ফাঁদটা কাজে লাগল। এমন সরাসরি ফল পাওয়া যায় আর কোনো পদ্ধতিতে? ফ্লয়েডও এবার জোরে জোরে হাসছে। হাসছে কার্নো। অনিয়ন্ত্রিতভাবে হাসছে।
মহাকাশ অভিযানের জন্য ক্রু নির্বাচন করা হয় খুব সতর্কভাবে। শুধু যোগ্যদের। কার্নো তার প্রমাণ।
আর ভয় নেই। এটুকুই যথেষ্ট, আসল বন্ধুত্বের পথে প্রথম ধাপ পেরিয়ে এসেছে। নিরাপত্তাহীনতাকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছে ওরা।
৪০. ডেইজি, ডেইজি…
যে চেতনা তাকে ঘিরে ছিল সে বৃহস্পতির কোরটা সরিয়ে দিল সামনে থেকে। ও নিজের নতুন বোঝার ক্ষমতা দিয়ে একটু একটু বুঝছে যে ওর না। চারপাশের সবকিছু পরীক্ষা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। জড়ো হচ্ছে অসীম ডাটা। ঠিক জমা করার জন্য নয়, কাজের জন্য। বিরাট আর জটিল পরিকল্পনা আছে, সেটায় বিবর্তন চলছে; যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে তা হয়ত পৃথিবীর একটা পরিণতি আনার জন্যই। সে এখনো পরিকল্পনার অংশ নয়, তবে হয়ে যাবে মনে হয়।
এতক্ষণে তুমি বুঝতে শুরু করলে।
এটাই প্রথম সরাসরি মেসেজ। খবরটা দূর থেকে এল, যেন মেঘের ভিতর দিয়ে। তবু, বোঝা যায়, তার জন্যই। মাথায় চলা প্রশ্নগুলো করার কথা সে মাত্র ভাবছে, এমন সময় আবার একাকীত্বের ভাবটা ফিরে এল; আবার একা।
শুধু এক মুহূর্তের জন্য একাকীত্ব। আরো কাছ থেকে, আরো স্পষ্ট আরো একজনের চিন্তা চিনতে পারছে সে। এই প্রথম বুঝতে পারছে যে একাধিক অস্তিত্ব তাকে চালায়। সে বুদ্ধিমত্তার একটা সিঁড়িতে পড়ে গেছে। কেউ কেউ ওর ধাপের কাছাকাছি, যেন বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব তাদের। অথবা হয়ত তাদের আছে একক অস্তিত্বের সব অনুভূতি। অথবা, হয়ত এমন হিসাবের কোনো মানে নেই।
অন্তত একটা দিক নিশ্চিত, ও একটা ছোট যন্ত্র হিসেবে কাজ করছে এখন। একটা ভাল যন্ত্রকে ধারালো হতে হয়, হতে হয় পরিবর্তিত। আর সবচে ভাল যন্ত্র তারাই যারা জানে কী করতে হবে, কী করছে বর্তমানে।
সে এখন এটাই শিখে চলে। বিরাট বিস্তৃত আর কষ্টসাধ্য আইডিয়া। তাকে এর অংশ হওয়ার জন্যই গড়া হচ্ছে-যদিও পুরোটা নিয়ে শুধু খুব অস্পষ্ট একটা কিছু বুঝে নেয় সে। মেনে নেয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই-হয়ত প্রতি পলে মানতে হচ্ছে না, তবু, অদৃশ্য মাস্টারদের প্রতিরোধ করার মতো কিছু নেই।
এখনো পুরো মানবীয় অনুভূতিটা চলে যায়নি; গেলে বোধ হয় এ কাজের ক্ষেত্রে তার কোনো দামই থাকত না। ডেভিড বোম্যানের আত্মা ভালবাসার বাধন ছাড়িয়ে গেলেও এখনো অনুভব করে তার পুরনো সহকর্মীদের অভাব।
ভাল, ঠিক আছে। জবাব এল ওর আকুতির। ঠিক বলতে পারবে না আসা ভাবনাগুলোয় একটু হেয় করা আর একটু ঠাট্টা জড়িয়ে ছিল নাকি পুরোটাই মনের ভুল; কিন্তু যখন ভাবনাটা আসতেই থাকল তখন আর এর অকল্পনীয় কর্তৃত্ব নিয়ে কোনো প্রশ্নই নেই, অসম্ভব এক কথা আসে এবার, তারা কখনোই জানতে পারবে না যে তাদের পরিচালনা করা হচ্ছে। তাহলে পরীক্ষার উদ্দেশ্যই নষ্ট হবে।
এরপর আবার নিরবতা। এটা সে আশা করে না। সে এখনো ভীত-কম্পিত। যেন একটা…মাত্র একটা মুহূর্তের জন্য সে শুনতে পেয়েছে ঈশ্বরের কণ্ঠ।
এবার সে চলতে পারছে পুরোপুরি নিজের ইচ্ছায়; নিজের চাওয়া একটা দিকে। বৃহস্পতির স্ফটিক-স্বচ্ছ হৃদয় নিচে পড়ে রইল। স্তরের পরে স্তর হিলিয়াম, হাইড্রোজেন আর কার্বন যৌগ মুহূর্তে পেরিয়ে যাচ্ছে। একপলের জন্য বিরাট কোনো জেলিফিশের মতো কিছুতে চোখ পড়ল তার। পঞ্চাশ কিলোমিটারের মতো হবে ওটার ব্যাস। চারধারে একটা ঘুরন্ত চাকতি। বৃহস্পতির আকাশে ঐ চাকতির মতো দ্রুত আর কোনো কিছুই ঘোরেনি। জেলিফিশটা নিজেকে রক্ষা করতে সাথে করে রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে এসেছিল; সময়ের পর সময় ধরে এটা নিঃসরণ করবে বর্ণচ্ছটাময় গ্যাস আর সেই বাষ্পের ছোঁয়া পেয়ে চাকতিটা আরো মাতালের মতো ঘুরবে, তারপর হয়ত ঝরা পাতার মতো নিচের দিকে ঝরে পড়বে অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত। সে ফলাফল দেখা বন্ধ করল না; এখন জানে, কে জেতে আর কে হারে তাতে কিছু যায় আসে না।
বিদ্যুৎ চমকের ফ্লাক্স টিউবের মধ্যদিয়ে ঝর্নায় স্যামনের ১৫৬ লাফের মতো সে চলে গেল বৃহস্পতি থেকে আইওর দিকে। চাঁদটা আজ অন্যদিনের চেয়ে ঠাণ্ডা। মাত্র কয়েকটা পার্থিব বিজলী চমকের মতো করে শক্তি পরিবাহিত হচ্ছে জগৎটাতে, গ্রহ আর উপগ্রহের মধ্যে। যে কালো পথ দিয়ে সে ফিরেছে সেটা এখনো বিদ্যুৎ প্রবাহে ভেসে আছে। খোলা। মানব উষালগ্ন থেকে আজো সে দরজা বিদ্যুৎ চলনটাকে ঠেলে রেখেছে একদিকে।
আর সেখানেই মহা-প্রযুক্তির মিনারের সামনে যেন অতি সংকুচিত হয়ে আছে সেই পথ-পাত্র, সেই ডিসকভারি, যেটা তাকে নিয়ে গেছে ছোট্ট পৃথিবী থেকে তার বর্তমান জগতে।
কী সাধারণ-কী নিষ্ঠুর! আবার ডিসকভারিকে দেখা যায়। একটা ছোেট স্ক্যান করেই সে এর ডিজাইনে দেখতে পায় অসংখ্য-অসংখ্য প্রবাহ, অগুনতি অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার। ঠিক একই রকম জটিল, সেই কম প্রাচীন তরীর মতো যেটার সাথে ডিসকভারি লেগে রয়েছে এক স্থিতিস্থাপক টিউবের মধ্যদিয়ে।
