মানুষের আগমনের অনেক অনেক আগে আরেক জগতে এরই মতো নাটক হয়েছিল। অন্য প্রাণীর দ্বারা। তখন নীলনদ এ উপত্যকার মতোই বয়ে যেত নির্জীব মরুর মাঝদিয়ে টেনে আনত জীবন। এ নদীর তীর কোনো কালেই দু কিলোমিটারের চেয়ে চওড়া নয়, তবু শতাব্দীর পর শতাব্দীও বিবর্তিত করেছে হাজারো জাতের প্রাণ, করেছে উন্নত, দিয়েছে ধ্বংস করে। তবু পেছনে অন্তত একটা বিবর্তন গড়ে দিয়েছে যুগান্তকারী সৌধ।
প্রথমে সে ভেবেছিল এটা প্রাকৃতিক লবণের খোলস যেগুলো সব তাপীয় দরজা বন্ধ করে রাখতে পারে। কাছাকাছি এসেই বুঝতে পারে কোনো প্রাকৃতিক ক্ষরণ নয় বরং আর্টিফ্যাক্ট, এখানকার প্রাকৃতিক কোনো ঘটনাও হতে পারে; পৃথিবীর বুকেও সমাপনকারীরা একই রকম দুর্গ দেখতে পেয়েছে, আর পৃথিবীর ঐ মাকড়সার জাল বিছানো ছিল আরো দারুণভাবে।
লবণের মতো দেখতে অংশের সৃষ্টি অবশ্যই আরো অনেক ছোট ছোট-একটা বড়জোর আধ মিটার চওড়া। প্রবেশপথটা এক থিকথিকে গুহার দেয়াল। গাদাগাদি করে রাখা পাথরের টুকরোয় তৈরি-এটা ঐ স্রষ্টাদের উদ্দেশ্য জানার সূত্র হতে পারে। ঐ আস্তে চলা শিখাহীন আগুনে ভরা নীলনদের তীর থেকে খুব বেশি দূরে নয় এগুলো, বরং যেন নদীর পেছনে লুকিয়েছে। আর তারপরই সব শেষ।
গুহাটা হয়ত মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে তৈরি। অমানুষিক পরিশ্রমে যোগাড় করা ঐ পাথরের টুকরাগুলো ঢেকে দেয়া হয়েছে পাতলা খনিজের পর্দা দিয়ে। এ নিরাপদ জায়গা পরিত্যক্ত হওয়ার একটা কারণ পাওয়া যায়, ছাদের এক অংশ ভেঙে পড়েছিল-হয়ত সার্বক্ষণিক ভূমিকম্পের জন্যই। পানির তলার রাজ্যে ছাদ ছাড়া দুর্গ প্রায় সব শক্রর জন্যই উন্মুক্ত।
লাভা নদীর পাড়ে বুদ্ধিমত্তার আর কোনো প্রমাণ নেই। একবার অপার্থিবভাবেই একজন ক্রলিং করতে থাকা মানুষের মতো কিছু একটা দেখতে পেল। কোনো চোখ বা নাক নেই। শুধু এক বিরাট দাঁতহীন মুখ যেটা অনবরত গলা বেয়ে নামিয়ে দিচ্ছে আশপাশের পুষ্টিকর খাবার।
গভীর মরুর সরু উর্বর ব্যান্ডের সাথে সাথে পুরো একটা সংস্কৃতি এমনকি সভ্যতাও হয়ত উঠে এসে আবার নেমে গেছে অতলে। কোনো কালে সেনাবাহিনী মার্চ করে থাকতে পারে (অথবা সাঁতার) ইউরোপান নেপোলিয়ান অথবা ট্যাম্বারলেনের আদেশে। হয়ত তাদের বাকি দুনিয়া এটা জানতেও পারেনি। কারণ এসব মরুদ্যান গাছের মতো একে অন্যের চেয়ে দূরে দূরে জন্মায়। যেসব জীব এ লাভাস্রোতে তাপ পোহায়, খাদ্য পায় জ্বালামুখ থেকে-সেসব কোনোদিনই একটু সময়ের জন্য যে কোনো দু সমুদ্ৰোদ্যানের মাঝে হিংস্র এলাকা পেরুতে পারে না। এমনকি তারা যদি কখনো ইতিহাসবিদ আর দার্শনিক উৎপাদন করেও থাকে, তবু প্রত্যেক সংস্কৃতি দাবী করত যে, সৃষ্টিজগতে তাদেরটাই একমাত্র সভ্যতা, সৃজনশীলতা।
তবু, যেকোন দুটো মরুদ্যানের মাঝখান একেবারে প্রাণহীন নয়, ওখানে আরো শক্ত জীবন আছে যেগুলো বরফের তাপমাত্রার তারতম্য আর হাড় জমানো শীতকে যমের মতো ভয় পায়। মাথা তুলে সাঁতার কাটে ইউরোপান মাছ জাতীয় প্রাণীগুলো। গতির জন্য সুবিধাজনক আকৃতির টর্পেডোর মতো জীবনও খুঁজে পাওয়া যায়। সেগুলো আড়াআড়ি পাখনার কারণে আরো বেশি গতিময়। দু পাশের ফিন আছে কোনো কোনোটার। ফিনগুলো কাজ করে হাল হিসেবে। তবে পৃথিবীর সমুদ্রজগতে সবচে দক্ষ যোদ্ধার কাছাকাছি থাকা প্রাণীটাকে মোটেও হেলা করা যায় না। বিবর্তন দারুণ ইঞ্জিনিয়ার-যতবার একই ধরনের সমস্যা দেখা দেবে, যোগ্যতমের জন্য ততবার একই উত্তর নিয়ে আসবে। ও দেখতে পেয়েছে জীবন বৃক্ষের অনেক নিচের শাখায় থাকা ডলফিন আর হাঙরের দলকে।
বিশেষ পার্থক্য আছে পার্থিব সাগর আর ইউরোপান সমুদ্রগুলোর মাছের মধ্যে; ওদের কোনো কানকো নেই-বড়জোর একবিন্দু অক্সিজেনের বুদ্বুদ দেখা যেতে পারে সাঁতারের পথে। পৃথিবীর তাপ-ভৌগোলিক পরিবেশের জীবের মতো এগুলোর অঙ্গ প্রত্যঙ্গও সালফার যৌগের ভিত্তিতে গঠিত। সালফার যৌগের কোনো অভাবই নেই অগ্নিগিরির আশপাশে।
চোখ আছে খুব কম প্রাণীরই। দুপ্রাপ্য লাভার উদগীরণে তৈরি হওয়া লাল আভা ছাড়াও আলো আছে ওখানে। কিছু কিছু জীব জৈবিক আলো ছড়ায় সাথী পাওয়ার জন্য, কিছু ছড়ায় শিকার ধরতে। কিন্তু জগৎটা অন্ধকার।
ধ্বংস হয়ে গেছে এ জগৎ। সৃষ্টির আগ থেকেই। এর শক্তি উৎস শুধু খেয়াল খুশিমতো ওঠেই না বরং ইচ্ছামতো জায়গা বদলায়। কিন্তু যে জলোচ্ছ্বাস তাদের উঠিয়ে এনেছে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। এতকিছুর পরেও, বুদ্ধিমত্তা জন্ম নেয় সবচে কঠিন পরিবেশেই, কারণ বিলুপ্তির পথে টিকে থাকে যোগ্যতম, শুধু তাই না-উন্নতিও করে শারীরিকভাবে। তাই এখানটায় দারুণ বুদ্ধিমত্তার উঁকি দেয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ইউরোপানদের উবে যেতেই হবে নিজ গ্রহ জমে যাবে যেদিন। এ গ্রহকেও জমতে হবে, কারণ এসব মরুদ্যানের উৎস ভেতরের আগুন।
ওরা পড়েছে আগুন আর বরফের ফাঁদে।
৩৭. বিয়োজন
… এমন খারাপ একটা খবর দিতে হচ্ছে…আই অ্যাম রিয়েলি স্যরি, ওল্ড ফ্রেন্ড-কিন্তু ক্যারোলিন প্রশ্ন করেছে আমাকে, আর তুমিতো জানই তোমাদের দুজনের জন্য আমার অনুভূতি যথেষ্ট গভীর।
মনে হয় না এটা কোনো হঠাৎ সারপ্রাইজ। তুমি আমাকে গত বছরের ব্যাপারে এমন কিছু কথা বলেছ যা এমন কোনো ইঙ্গিত দেয়…তুমি পৃথিবী ছাড়ার সময় ও কেমন তিক্ত হয়েছিল তাতো তুমি জানই।
