নিচে ছড়িয়ে পড়ছে এন্টার্কটিকার চেয়ে অনেক অনেক ঠাণ্ডা এক জমাট ময়লার স্কৃপের অন্তহীন বরফ স্তর। একটা ছোট বিস্ময় ধাক্কা সামলাতে পারল না-নিচে ভাঙা স্পেসশিপ! সাথে সাথেই চিনেছে-দুর্ভাগা জিয়াং, ওর দেখা হাজার ভিডিওতে প্রচার করা হয় এর কথা। এখন না…এখন না…পরে আরো ভাল সুযোগ পাওয়া যাবে…
এরপর বরফ পেরিয়ে এমন এক এলাকায় সে প্রবেশ করে যেটাকে নিয়ন্ত্রণকারীদের চেয়ে নিজে কম চেনে না। এক সামুদ্রিক দুনিয়া, পানি ভ্যাকুয়াম থেকে একটা বরফের স্তর দিয়ে আলাদা করা। বেশিরভাগ জায়গায় বরফ কয়েক কিলোমিটার পুরু। তবু কয়েক জায়গায় দেখা দেয় পাতলা স্তরও। বোধহয় এগুলো কোনো না কোনো কারণে ভেঙে যায় মাঝে মাঝে। এরপর দুটো পুরোপুরি বিপরীত শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ হয় যারা আর কোনোদিন সৌরজগতের অন্য কোনো বিশ্বে মুখোমুখি হয়নি। কিছু পানি বাষ্প হয়ে যাওয়ায় পরিবেশের সহ্য হয় না। যথারীতি মহাশূন্য আর পানি একটা সন্ধি করে নিয়ে মাঝখানে বরফকে দেয় বসিয়ে।
বৃহস্পতির প্রভাব ছাড়াই হয়ত কোনোকালে ইউরোপার এ সাগরগুলো জমে বরফ হয়ে ছিল। সব সময় এর গ্র্যাভিটি উপগ্রহের কেন্দ্রকে দলাইমলাই করতে থাকে। আর আইওকে বেঁধে রাখা শক্তিও আছে আশপাশেই-প্রভাব অবশ্য সামান্য। একেবারে গভীরে যাওয়ার পথে প্রতিপদেই ও গ্রহ আর উপগ্রহের টানাপোড়েনের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছে।
মাটির নিচে-পানির নিচে ভূমিকম্প হয় সব সময়। শব্দ শুনতে-এমনকি অনুভব করতে পারছে সে। বুঝছে ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসের হিসহিসানি। বরফের গভীর খাদের উপর ধীরে চলতে থাকা হিমবাহ শ্ৰবণ সীমার নিচের প্রেসার ওয়েভ তৈরি করে। ইউরোপাকে ঢেকে রাখা শব্দময় বরফের স্তরের চিৎকারের কাছে ম্লান হয়ে যাবে পৃথিবীর সব সাগরের নিনাদ।
নিজের অবাক হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেনি যখন প্রথম মরুদ্যান ওকে অবাক করল। ভিতর থেকে উঠে আসে সামুদ্রিক পানির মিশ্রণের কঠিন চিমনি আর পাইপ। ছড়িয়ে আছে প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে। প্রাকৃতিক পরিহাসের ঐ অসাধারণ কেল্লা ছাড়াও কালচে তপ্ত তরল প্রবাহিত হয়ে চলে। যেন কোনো শক্তিময় বিশাল হৃদপিণ্ডের রক্ত সঞ্চালন। আর ঠিক রক্তেরই মতো এরা জীবনের একান্ত প্রমাণ।
ফুটন্ত তরলটা ফিরে আসছে উপর থেকে চুপসে পড়া মরণ শীতলতার উপর। সৃষ্টি করে চলেছে আরেকটা উষ্ণতার দ্বীপ। তরলটা ইউরোপার ভিতর থেকে জীবনের সব উপাদানকে টেনে তোলে। এও গুরুত্বপূর্ণ। এমন এক পরিবেশে কেউ আশা না করলেও এ ফোয়ারাই জীবনের জন্য খাদ্য এবং শক্তি হয়ে আসে।
এখনো আশা করা যায় তার মনে পড়বে যে মাত্র এক প্রজন্ম আগে ঠিক এমন উর্বর মরুদ্যান আবিষ্কৃত হয়েছে পৃথিবীর গভীর সব সাগরতলে। এ জায়গায় সেসব জীব আরো বিরাট আকৃতির, অনেক বৈচিত্র্যে ভরা।
দুর্গের আশেপাশের নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল সৌকর্যময়। নড়তে পারলেও চারদিকের মাকড়সা-আকৃতি দেখতে গাছের মতো। এগুলোই সব বিস্ময় কেড়ে নেয়নি। কতগুলি অদ্ভুতুড়ে শামুক আর কীট হচড়ে পাঁচড়ে নিজেদের খাবার খুঁজে নিচ্ছে। কিছু নির্ভর করে গাছপালার উপর, আর কিছু সরাসরি তরল থেকেই নিয়ে চলে জীবন সুধা। তাপের উৎস থেকে বহুদূরে পানির নিচের আগুনের পাশেই সব প্রাণী আর উদ্ভিদ নিজেদের তাতিয়ে নেয় যেখানে শক্তপোক্তভাবে বাস করে অন্যান্য জীবনও, দশফুট লম্বা শক্ত খোলকের জীব অথবা বড় বড় মাকড়সা থেকে খুব বেশি ব্যতিক্রমী নয়।
জীববিজ্ঞানীর দল এমন একটা সমুদ্ৰোদ্যান দেখে দেখে সারা জীবন পার করে দিতে পারবে। পেলিওজোয়িক ১৪৮ জগতের সমুদ্র থেকে অনেক ব্যতিক্রমী এটা। কোনো স্থিতিশীল পরিবেশ নয়-তাই বিবর্তন এখানে দ্রুত এগিয়েছে, তৈরি করেছে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য। এ জগতের সব প্রাণীই সব সময় মরণের অসংখ্য রূপের খুব কাছাকাছি বাস করে, কোনো না কোনো সময় সব জীবন-ঝর্না যাবে ফুরিয়ে। আর এ পরিবেশই তাদের অন্যদিকে চালিত করে।
বারবার ও ইউরোপান সাগরের উপর অবাক চোখ বুলিয়ে যায়। তেমন দুঃখজনক ঘটনার প্রমাণও মিলল কয়েকটা। অসংখ্য বৃত্তাকার এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অযুত মৃত প্রাণীর কঙ্কাল অথবা গলিত দেহ যেখানে বিবর্তনের প্রাথমিক অধ্যায়গুলোই ঠিকমতো খুলে যেতে পারছে না-পেছনে পড়ে আছে জীবন মহাগ্রন্থের বিশাল বই।
ও বিরাট বিরাট খোলস পায়, কুঁচকে-পাক খেয়ে পড়ে আছে। কোনো কোনোটা মানুষের সমান। বহু আকৃতির চিহ্ন, বাইভা, এমনকি ট্রাইভাল্ব। বহু মিটার জুড়ে ছড়ানো কতগুলো সর্পিল পাথুরে গঠন পাওয়া যায় যার মতো কিছু কিছু ছিল পথিবীতে। ক্রিটোকিয়াস ১৪৯ যুগের সেসব ইমোনাইট কোনো এক রহস্যময় কারণে পৃথিবীর সব সাগর থেকে হয়ে গেছে উধাও।
খুঁজতে খুঁজতে, দেখতে দেখতে সে গভীরতম খাদগুলোর সব চষে ফেলছে। সম্ভবত সবচে আশ্চর্যের ব্যাপার হল তপ্ত লাভার নদীটা। শত শত কিলোমিটার এলাকা ডুবিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক গিরিখাতের ভিতর দিয়ে। মজার ব্যাপার হল, লোহিততপ্ত ম্যাগমার ঢল বয়ে চলে পানিকে সাথে নিয়ে। নিচে পড়ে যাওয়া পানি মুহূর্তে তো দূরের কথা আদৌ বাস্প হতে পাবে না। কারণ ঐ লাভার চাপ। এই অতি অদ্ভুত অবস্থাও তারা পরিবেশের কারণে আপাতত মেনে চলে!
