না, আমার মনে হয় না এখানে আর কারো ব্যাপার জড়িত, অন্তত বিশ্বাস করি না। কেউ থাকলে ও আমাকে বলতই…কিন্তু আগে হোক আর পরে…যাই হোক…ও এক আকর্ষণীয় মেয়ে।
ক্রিস ভাল আছে। আর অবশ্যই কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র জানে। অন্তত ওকে কোনো আঘাত দেয়া যাবে না। বোঝার ক্ষেত্রে ও একেবারে হোট। অবশ্য শিশুরা চমৎকার…মানিয়ে নিতে পারে, না?-এক মিনিট, আমার গুপ্তধনে চাবি দিতে হবে-মনে করে নিই- ওহ, পেয়েছি।
এখন, যতটুকু আমি দেখলাম, তাতে তোমার কাছে কোনোটার গুরুত্বই কম নয়। প্রত্যেকে ঐ বোমা বিস্ফোরণটাকে দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিতে চাইছে। অবশ্যই কেউ বিশ্বাস করেনি। স্বাভাবিক হিস্টিরিয়া ছাড়া আর কিছুই হয়নি, তারপর মরেছে লোকজন; আর আমরা পড়ে আছি এমনভাবে যাকে তোমাদের ঐ ধারাভাষ্যকার বলে, ঘাড়-ঘুরিয়ে-দেখে-নিচ্ছি মরণ লক্ষণ।
কেউ বোধহয় খুঁজে পেয়েছে এর সাথে মিল খাওয়া একটা শতবছরের পুরনো কবিতা। এত বেশি মিল যে, সবাই সেটার উদ্ধৃতি দিচ্ছে। রোমান সাম্রাজ্যের শেষ দিনগুলো নিয়ে রচিত; সিংহ দরজায় অসহায় অপেক্ষা করছে লোকজন বিজয়ী দখলদারের জন্য। সম্রাট আর সব আমলা-অভিজাত নিজেদের দামী ভোলা জামাকাপড়ের স্তূপ নিয়ে মনে মনে আউড়ে যাচ্ছে শুভেচ্ছা বাণী। রাজদরবার বন্ধ, বন্ধ হয়ে গেছে আইন বিভাগ আর আদালত, কারণ নতুন শাসকের সামনে কোনো নিয়মের মূল্য নেই। নেই কোনো আইন।
তখনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আগাম খবর এল। কোনো শত্রু নেই। রিসিপশন কমিটি দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছে, প্রত্যেকেই হতাশভাবে ফিসফিসিয়ে বাড়ি ফিরে গেল, এখন আমাদের কী হবে? ঐসব মানুষ আসলে এক ধরনের সমাধান হিসেবেই আসছিল।
কবিতাটায় ছোট একটা পরিবর্তন আনলেই চলবে। এখানে নাম বলা হয়েছিল, বারবারিয়ানদের জন্য অপেক্ষা; আর এক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই বারবারিয়ান। আমরা জানি না কী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু হঠাৎ করেই এর উদয় হয়নি।
আরেক ব্যাপার। তুমি কি শুনেছ জিনিসটা পৃথিবীতে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই ক্যাপ্টেন ডেভিড বোম্যানের মা মারা গেছেন? কেমন যেন বেমানান মিল। কিন্তু নার্সিং হোমের সবাই বলেছে তিনি এ খবরে এক বিন্দুও কান দেননি। সুতরাং এ খবরের কোনো প্রভাবই পড়েনি তাঁর উপর।
.
ফ্লয়েড বন্ধ করে দিল রেকর্ডিংটা। দিমিত্রির কথাই ঠিক, দিমিত্রির কথাকে অবাকভাবে নেয়া হয়নি। কিন্তু তাতে সত্যির একটুও হেরফের নেই, আঘাতটা একই রকম।
এর মধ্যে ও আর কী করতে পারত? ক্যারোলিনের কথা মতো যদি মিশনে না যেত তাহলে বাকি জীবনের জন্য পচতে হত নিজেই নিজেকে দোষ দিয়ে। এমনকি সারা জীবনের শান্তি যেত উবে। কী আর ওর বিবাহিত জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারত-বরং পরিষ্কার বিচ্ছেদই ভাল। কারণ এতদিনের শারীরিক দূরত্ব মানসিক দিক দিয়েও প্রভাব ফেলেছে। সম্পর্ক হয়েছে দুর্বল। (আসলেই? কিছু কিছু ক্ষেত্রে দূরত্বতো বিপরীত হয়।) না। দায়িত্বই বেশি দামী। ও এক দলের সদস্য যারা একটা বিরাট লক্ষ্যের জন্য একত্র হয়েছে, উঠেছে গড়ে।
আর, জেসি বোম্যান শেষ। হয়ত তার দোষের আরেক কারণ। ফ্লয়েড সাহায্য করেছে মহিলার একমাত্র সন্তান চুরির কাজে। এ ঘটনা জেসির মানসিক ভারসাম্যহীনতার আরেক কারণ। অপরিহার্যভাবেই তার ওয়াল্টার কার্নোর সাথে এ নিয়ে কথা বলার ব্যাপারটা মনে পড়ে গেল। কেন তোমরা ডেভ বোম্যানকে বেছে নিয়েছিলে? ও সব সময় আমাকে একটা ঠাণ্ডা মাছের মতো আঘাত করত-আসলে ঠিক অ-বন্ধুসুলভ নয়, তবু যতবার ও ঘরে ঢুকত ততবার তাপমাত্রা দশ ডিগ্রি নেমে যেত-বিশ্বাস কর, আমি থার্মোমিটারে মেপেছি শেষদিকে।
ওকে বেছে নেয়ার এ-ও এক কারণ। আরেক কারণ-তেমন কঠিন পারিবারিক বন্ধন ছিল না। প্রেম কাজে আসেনি। শুধু এক মা, যাকে সব সময় দেখার সুযোগ হত না। সুতরাং একটা লম্বা, অনির্দিষ্ট আর স্নায়ুক্ষয়ী মিশনের জন্য ওকে আমরা বেছে নিয়েছিলাম।
ও ঐ পথে কীভাবে গেল?
হয়ত মনোবিজ্ঞানীরাই তোমাকে ঠিক জবাব দিতে পারবে। আমি ওর রিপোর্টগুলো দেখেছিলাম ঠিকই-অনেকদিন আগের কথা। রিপোর্টে খুন হওয়া ভাইয়ের কথা বোধহয় ছিল, পরপরই বাবা মারা যায় প্রথমদিকের মহাকাশ শাটলের অ্যাকসিডেন্টে। এসব কথা তোমাকে বলা হয়ত ঠিক না, কিন্তু অনেকদিন পেরিয়ে যাওয়ার পর আজ আর এসবে কিছুই যায় আসে না।
আসলেই এতে কিছু এসে যায়নি; তবু এসব কথা মানুষকে টানে। আজ হঠাৎ ফ্লয়েড হিংসা করছে ডেভিড বোম্যানকে যে পৃথিবীর সব আবেগ-বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়তে পেরেছিল কালো মহাকাশের বুকে।
না-ও ভুল বোঝাচ্ছে নিজেকেই। খবর শুনে যখন ওর হৃদৃপিণ্ড চাপ দেয় ব্যথাময় চাপ, তখন ডেভিড বোম্যানকে নিয়ে ও মোটেও হিংসা অনুভব করেনি ভিতর থেকে, বরং উঠে আসে মমতা, অক্ষয় মায়া।
৩৮. তুষার-রাজ্য
ইউরোপার সাগরগুলো ছেড়ে আসার আগে শেষ যে জন্তুটাকে ও দেখেছে ওটাই সবচে বড়-পৃথিবীর বুকের বটগাছগুলোর মতো। যেমন তেমন বট না, যেগুলোর একমাত্র কাণ্ড একটামাত্র গাছকেই ছোটখাট বন তৈরি করতে অনুমতি দেয়, এমনকি মাঝে মাঝে শত বর্গমিটার জুড়ে-তেমন। জীবটা হাঁটছিল এক মরুদ্যান থেকে অন্য মরুদ্যানের দিকে। মরুদ্যানের মাঝে রাস্তাও দেখা দেয়। জিয়াংকে ধ্বংস করা জীব যদি এ প্রজাতির না ও হয়, তবু কাছাকাছি হবেই।
