থ্যাঙ্ক ইউ, আমি যদি এখনি প্রস্তুতি নেয়া শুরু করি তাহলে কি তুমি কিছু মনে করবে?
উ…একদম না। বর্তমান প্ল্যানের কোনো ক্ষতি না হলেই হল। মনে রেখ কিন্তু, মিশন কন্ট্রোলই আসল সিদ্ধান্ত নিবে। আর আমি ভালমতোই জানি মিশন কন্ট্রোল কী বলবে। একজন মানুষের মহাশূন্যে একা একা বেঁচে থাকার আশা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না।
কিন্তু ও কখনো ভাবেনি, সব সময় ডক্টর চন্দ্র একজন একলা মানুষ।
৩৬. গভীরে আগুন
এখন পৃথিবী অনেক দূরে। বৃহস্পতি জগতের ভয়াল বিস্ময় খুব দ্রুত খুলে যাচ্ছে চোখের সামনে। নবজন্মের পর। কীভাবে ও এত অন্ধ, এত বোকা হতে পারল? যেন হাঁটছে ঘুমের মধ্যে। এখনি জাগতে শুরু করল যেন।
কে তুমি? চিৎকার করল সে। কী চাও? কেন…কেন আমাকে এমন করলে…কেন?
কোনো জবাব নেই। তবু মনে হল যেন উত্তর পেয়ে গেল। একটা…অস্তিত্বের উপস্থিতি টের পাচ্ছে। অন্তত একজন মানুষ এভাবেই কথাটা বলে। চোখদুটো জোর করে বন্ধ করলেও সে বুঝছে কোনো এক বদ্ধ ঘর ওর চারপাশে, আর সেখানে আছে আরো একটা কিছু, হয়ত একটা খোলা মহাশূন্য আছে ঘরটায়। চারপাশে একটা ক্ষীণ, সর্বব্যাপী মনের প্রতিধ্বনি-একটা চির অশান্ত দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
আবার অসীম নিরবতার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, এবারো কোনো সরাসরি উত্তর নেই-শুধু ঐ পরীক্ষা করতে থাকা সাথীর অনুভূতি। তবু কীভাবে যেন নিজের জন্য উত্তরটা খুঁজে পেয়েছে বলে মনে হল তার। সহজেই কারো উপস্থিতি টের পাওয়া যায় সে অথবা তারা যাই হোক না কেন।
বোঝা যাচ্ছে… বোঝা যাচ্ছে… তারা মানবজাতির ব্যাপারে উৎসুক। তারাই ওর স্মৃতিকে তুলে নিয়ে সংরক্ষণ করে রেখেছে, শুধু নিজেদের রহস্যময় উদ্দেশ্য পূরণের জন্য। আর এবার সেই উদ্দেশ্যের কাজ করে চলছে তারার শিশুর একান্ত নিজের গভীরতম আবেগকে ধরে নিয়ে। কখনো নক্ষত্র শিশুর সহায়তায়, কখনো সাহায্যের ধার না ধেরে।
এজন্য সে ভেঙে পড়েনি, ঠিক দুঃখ পায়নি, রেগেও যায়নি। যে পরীক্ষা নিরীক্ষা ফরে স্টার চাইল্ড এই অসীম অভিজ্ঞতা অর্জন করল- অন্তত পৃথিবীর বুকে, সে অভিজ্ঞতার সামনে এসব চিন্তাও ছেলেমানুষী। ভালবাসা-ঘৃণা-প্রত্যাশা-ভয় অনেক অনেক দূরে আজ। কিন্তু তবু কাউকে ভুলতে পারেনি। আর শুধু এখনি বুঝতে পারছে ওর ছেড়ে আসা জগৎটাকে তারা কীভাবে পরিচালনা করেছে এত লক্ষ বছর ধরে! এটা কি এক্সারসাইজের এক অংশ মাত্র? যদি তা হয়েও থাকে, শেষ লক্ষ্য কী, গন্তব্য কোথায়?
ও ঈশ্বরদের খেলার একজন খেলোয়াড় (পরে জানতে পারার কারণে রাগ হচ্ছে না ওর, নক্ষত্রশিশুদের কোনো রাগ নেই, ঈশ্বরেরা স্বাধীনতা ঠিকই দেবেন। কাজের জন্য যা বাঁধা হতে পারে সেটুকু বাদ দিয়ে স্মৃতি দেবেন। স্মৃতির যন্ত্রণা দেবেন, আবেগ দেবেন না। খেলার জন্য স্মৃতি আর স্মৃতির যন্ত্রণার খুব দরকার, আবেগের দরকার নেই) না জেনেই সে এসে পড়েছে অনেক দূরে। প্রতিটা কানুন জেনে নিতে হবে এখন।
সাইনোপ, প্যাসিফা, ক্যারমে আর অ্যানাঙ্ক-ছোট ঘোঁট চার চাঁদের এবড়োথেবড়ো পাথর ওর সচেতনতার চারধারে একটু একটু করে আলো ছড়াচ্ছে। এবার ইলোরা, লিসিথিয়া, হিমালিয়া আর লিডা বৃহস্পতির দূরত্বের অর্ধেক পেরিয়ে এগিয়ে এল সামনে। তাদের সবাইকে অবহেলা করে সে। ক্যালিস্টোর ক্ষত বিক্ষত মুখ সামনে পড়ে এবার।
একবার, দুবার পাক খেল পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে বড় আটকে পড়া দুনিয়াটাকে ঘিরে। এতবড় জগৎটার বিশালত্বের সার্থকতা কোথায়-বৃহস্পতির আকর্ষণে চিরদিনের জন্য আটকে পড়ায় নিহিত? জানে না অসচেতন মন কাজ করে যাচ্ছে ঠিকই। মেপে নিচ্ছে এটার বহিঃস্তর, বরফ আর ধুলার রাশি। ওর কৌতূহল শেষ হয়ে গেছে হঠাৎ করেই। এটায় অনেক আগের কোনো সংঘর্ষের চিহ্ন বইছে। যেন এক জমাট ফসিল। হয়ত উপগ্রহটাকে গুঁড়িয়ে দিতে এসেছিল ঐ বিপদ। অর্ধগোলক দেখতে ঠিক দৈত্য-ষাঁড়ের চোখ, একটা এককেন্দ্রিক গর্তের সারি ঠিক আংটির মতো দেখাচ্ছে। কত শত বছর আগে কোনো এক মহাজাগতিক হাতুড়ি এ এলাকার পাথরগুলোকে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার উড়িয়ে নিয়ে গেছে, রেখে গেছে নিষ্ঠুরতার চিহ্ন।
কয়েক সেকেন্ড পর গ্যানিমিড কেন্দ্র করে ঘোরা শুরু। ক্যালিস্টোর এত কাছে, একই আকারের, তবু অনেক বেশি ভিন্ন। এ জগত্তা আরো বেশি জটিল, আরো বেশি আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। এখানেও অনেক অনেক জ্বালামুখ, মনে হয় যেন সবগুলোকেই চষে দেয়া হয়েছে। গ্যানিমিডীয় ভূ-চিত্রের সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হল এর ইতস্তত ছড়ানো স্ট্রাইপের উপস্থিতি। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে দূরে সমান্তরালে ছড়ানো এগুলো। কোনো এক বিষাক্ত চাষী এটার বুক চষে গেছে তার অদ্ভুতুড়ে যন্ত্র দিয়ে।
কয়েক পাক ঘোরার পরই সে গ্যানিমিডকে পৃথিবীর সব যুগের সবভাবে দেখার চেয়ে ভাল করে দেখে নিজের জ্ঞানের ভাণ্ডারে বসিয়ে দিল পাকাপাকিভাবে। সে নিশ্চিত একদিন এ ডাটা হয়ে উঠবে মূল্যবান; ঠিক জানে না কেন, শুধু জানে দরকার পড়বে। যেভাবে জানে ঐ অসীম ক্ষমতার কথা যেটা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশ্ব থেকে বিশ্বে তাড়িয়ে বেড়ায় তাকে, তেমনি।
এবার শক্তিটা টেনে আনল ইউরোপায়। সে এখনো এ খেলার কোনো দর্শক না। তবু একটা উঠতে থাকা আগ্রহ প্রতিজ্ঞার দিকে টেনে নেয়। সে একজন অদেখা, যোগাযোগ না করা পরিচালকের হাতের পুতুল হলেও ঐ কন্ট্রোলের প্রভাবের বাইরে দুয়েকটা চিতাধারা বেরোনোর সুযোগ পাচ্ছে অথবা বেরুনোর অনুমতি পাচ্ছে। এগিয়ে আসতে থাকা নতুন গোলকটা গ্যানিমিড অথবা ক্যালিস্টোর সাথে খুব বেশি মেলে না। দেখতে জৈবিক লাগে; প্রথমে এর বাইরের শাখাময় আকৃতি যেন একে আলাদা আলাদা আকার দিয়েছে একেক জায়গায়। এমনকি পুরো চাঁদটাকে শিরা আর ধমনীতে ঘেরা সজীব পিণ্ড মনে হয়।
