এলোমেলো চুলে ভরা ব্যগ্র কপালের নিচে কালো, বিভ্রান্ত একজোড়া চোখ তার পেছনটা দেখার চেষ্টা করছে, আরো একটা অদেখা ভবিষ্যত দেখতে চাইছে যা কখনোই দেখতে পায়নি। তবু, ও-ই সেই ভবিষ্যৎ, যা সময়ের বাষ্পে জ্বলে পুড়ে লক্ষ প্রজন্ম পেরিয়ে পেরিয়ে উপনীত হয় বর্তমান-এ।
ঠিক সেখানেই ইতিহাসের শুরু; অন্তত ও এখন এটুকুই বুঝতে পারে। কিন্তু কীভাবে-আর সবচে বড় কথা, কেন-আজো তার কাছে এ রহস্যের ঢাকনা ঢাকা রয়ে গেল?
শেষ আর সবচে কঠিন কাজটা বাকি। ও এখনো যথেষ্ট মানুষ রয়ে গেছে, এটুকু না সরিয়ে দিতে পারলে এ রহস্যের শেষটা হয়ত অদেখাই থেকে যাবে।
.
এ মহিলা আবার কী করে? ডিউটি নার্স নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল টিভি মনিটরটা বৃদ্ধার দিকে ফিরিয়ে দিতে দিতে। ও অনেক চালাকি করেছে, তবু প্রথমবারের মতো আমি তাকে নিজের হিয়ারিং এইডের সাথে কথা বলতে দেখলাম। হায় খোদা…সে কী বলছে কে জানে?
মাইক্রোফোনে ফিসফিসানি তুলে আনার মতো সূক্ষ্ম না, তবু পাইয়ে দিচ্ছে ভাল ভয়। খুব কম সময়ই জেসি বোম্যানকে এত শান্ত দেখায়। চোখদুটো বন্ধ থাকলেও ফিসফিসানির সময় চেহারা স্বর্গীয় প্রশান্তিতে ভরে উঠছে।
এরপরই দেখতে থাকা মেয়েটা এমন কিছু দেখল যা ভোলার জন্য অনেক চেষ্টা করবে পরে। কারণ এ রিপোর্ট করলে সাথে সাথে তার নার্সিং পেশার যোগ্যতা কেড়ে নেয়া হবে। একটু দুলে ধীরে ধীরে চিরুণীটা ভেসে উঠল বিছানা থেকে। যেন কোনো অদৃশ্য আঙুল তুলে এনেছে। প্রথমবার সফল হয়নি, দ্বিতীয়বার বহু কষ্টেসৃষ্টে এটা লম্বা জট পাকানো চুলে বুলিয়ে গেল, আর জটগুলোয় থামল একটু।
এখন জেসি বোম্যান কথা বলছে না, শুধু মুচকি হাসি। আরো দক্ষতার সাথে চিরুণীটা বয়ে যাচ্ছে। এখন আর হঠাৎ হঠাৎ লাফাচ্ছে না।
নার্স কখনোই বলতে পারবে না কতক্ষণ এসব চলল, চিরুণীটা টেবিলে ফিরে গেলেও মেয়েটা অসাড়তার হাত থেকে মুক্তি পায়নি।
দশ বছরের ডেভ বোম্যান সেই চিরাচরিত কাজটা শেষ করেছে যা সব সময় নিজে পছন্দ না করলেও করতে হয় কারণ মা পছন্দ করে। অন্যদিকে একজন ডেভিড বোম্যান যে এখন বয়স হিসাবের বাইরে, সে প্রথমবারের মতো কজা করেছে জড় জিনিস। আর থাকতে না পেরে নার্স যখন এল তখনো জেসি বোম্যান হাসছে। নার্স হয়ত যত তাড়াতাড়ি পারা যায় আসার চেষ্টা করেছে, তবু এর কোনো মূল্য নেই।
৩৫. পুনরাবির্ভাব
মহাশূন্যের কোটি কিলোমিটারে ছড়িয়ে থাকা পৃথিবীর চিৎকার একেবারে বন্ধ। লিওনভের কুরা হঠাৎ এ বিচ্ছিন্নতা দেখল অবাক চোখে। জাতিসংঘের বিতর্ক, বিজ্ঞানীদের সাক্ষাৎকার, সংবাদ পাঠকদের পড়া-সবই হঠাৎ থেমে গেল ইউ এফ ওর আগমনে। হঠাৎ অসুস্থতার কোনো কারণ ওরা খুঁজে পেল না কারণ পরে আর কোনো অস্বাভাবিকত্ব ধরা পড়েনি। জাগাদকা ওরফে বিগ ব্রাদার আর সব সময়ের মতোই তাদের উপস্থিতির প্রতি উদাসীন। অবশ্যই পরিস্থিতি বিপরীত, ক্রুরা সেই দূরের গ্রহ থেকে এসেছে একটা রহস্যের জট খুলতে-আর বিগ ব্রাদার বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছে জবাব এখানে নেই। যে জায়গা ছেড়ে এসেছে, সেখানেই জবাব।
এই প্রথম ওরা আলোর ধীর গতির প্রতি কৃতজ্ঞ মনোভাব প্রকাশ করল কারণ এর ফলেই বৃহস্পতি আর পৃথিবীর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগে দু ঘণ্টা দেরি হয়ে যায়। তাই সাক্ষাৎকার দেয়াটা সম্ভব হয় না। তবু ফ্লয়েডকে মিডিয়া এত বেশি প্রশ্ন করেছে যে, ও বাধ্য হয়ে সবাইকে এড়িয়ে যাচ্ছে নিশাচর, গর্তবাসী শিয়ালের মতো। এরচে বেশি কিছু বলার না থাকলেও এক কথা বলতে হয়েছে কমপক্ষে বারেবার।
এছাড়াও বহু কাজ বাকি, লিওনভকে পৃথিবীর দিকে ফিরে যেতে হবে, তাই লঞ্চ উইন্ডো খুলে যাওয়ার আগে এ কাজটা সারতে হবে তড়িঘড়ি করে। অবশ্য তড়িঘড়িটা খুব বেশি না করলেও চলে, যদি একমাস দেরি করে রওনা দিতে, তাহলে একমাস পরে গিয়ে পৌঁছবে, ব্যস। চন্দ্র, কার্নো আর ফ্লয়েডের তেমন তাড়া নেই কারণ ওরা সারা পথ কাটিয়েছে ঘুমে। অন্যেরা এই লম্বা সফর থেকে বাঁচতে চায় যত তাড়াতাড়ি যন্ত্রগুলো মুক্তি দিতে পারে। কারণ সামনের ফিরে যাওয়ার সময়টাও জেগে জেগে কাটাতে হবে।
এখনো ডিসকভারির অনেক সমস্যা। শুধু পৃথিবীতে ফিরে যাবার মতো জ্বালানি ভর্তি ট্যাঙ্কে, কিন্তু সেই ফেরাটা হতে হবে লিওনভের অনেক পরে এবং ধীরে যেতে হবে। যেতে যেতে তিন বছর। তাও সম্ভব শুধু যদি চন্দ্র হালকে ঠিকমতো প্রোগ্রাম করতে পারে। কম্পিউটারটাকে সারা পথ একা একা পাড়ি দেয়ার মতো করে প্রস্তুত করার কাজ বাকি। এর সাহায্য না পেলে আবারও ডিসকভারি একটা পরিত্যক্ত স্পেসশিপ হিসেবে পরিচিতি পাবে।
হালকে নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে বেড়ে উঠতে দেখাটা আসলেই ভয়াবহ-কাজটা চলছে গভীরভাবে-এক মানসিক আঘাত পাওয়া শিশু থেকে অভিজ্ঞ মানুষে পরিণত হওয়ার পথে এগুচ্ছে কম্পিউটার। যদিও ফ্লয়েড জানে যে এভাবে মানবত্ব আরোপ এক বড় ভুল, তবু এটাকে পাশ কাটানোর কোনো পথ পায় না খুঁজে।
প্রায়ই ও খেয়াল করে এ অবস্থা একটা শিকারের রূপ নিচ্ছে। কিছু ভিডিও নাটক দেখেছে যেগুলোতে ব্যর্থ নতুন নায়কেরা সিমন্ড ফ্রয়েডের কারণে পুরোপুরি ডুবে গিয়েও সোজা হয়। জিতে যায় নাটকীয়ভাবে। একই কাহিনী আবার ঘটেছে বৃহস্পতির ছায়ায়।
