স্টক এক্সচেঞ্জের এ দালালের কোনো মানসিক সমস্যার রেকর্ড নেই। কিন্তু যারা পরের রিপোর্ট পাওয়ার পরও দালালের কথা বিশ্বাস করে তাদের ব্যাপারে ঢালাও মত দেয়া হয় যে তারা সবাই মানসিক রোগী। এবার বাস্ক শেফার্ড নেমে পড়েছে সেই পুরনো মিশনে। হাতাকাটা লম্বা জামা পড়া অন্তর্ভেদী দৃষ্টির দুজন মানুষ সীমান্ত এলাকায় তাকে জিজ্ঞেস করেছিল জাতিসংঘের হেডকোয়ার্টারের ঠিকানা।
ওরা পুরোপুরি বাস্ক লোকটার মতোই কথা বলে। ভাষাটা বেদনাদায়ক, জটিল, এমনকি মানবজাতির আর কোনো ভাষার সাথে এর মিল নেই। বোঝাই যায় এ স্পেস ভিজিটররা ভয়াবহ ভাষাবিদ, যদিও তাদের পরিবেশ এ বিশ্বের থেকে হাজার তফাৎ ওয়ালা।
এভাবেই চলতে লাগল, একের পর এক। তাদের মধ্যে খুব কম মানুষই জেনে শুনে মিথ্যা বলেছে-কেউ কেউ অসচেতনও ছিল না। বেশিরভাগই নিজের কাহিনীকে বেদবাক্যের মতো বিশ্বাস করে। এমনকি এ বিশ্বাসটা সম্মোহনের মাধ্যমে প্রচারেরও চেষ্টা করে অনেকে। কেউ আবার নিজেই সম্মোহিত হয় ঐ সময়। আর তাদের এক বিরাট অংশ ঠাট্টা-মশকরার শিকার। অনেকে কোনো হঠাৎ দুর্ঘটনায় পড়ে যায় সেসব অপেশাদার আর্কিওলজিস্টের মতো যারা চার দশক আগে একজন সায়েন্স ফিকশন চিত্র পরিচালকের ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র আর সেট (দোষ দিয়ে লাভ কী, দেখতে একেবারে অপার্থিব এগুলো, তার উপর পুরনো!) পেয়ে তিউনিশিয়ার মরুভূমিতে চিৎকার করে ফাটিয়ে ফেলেছে গলা।
এত সবে শুরু, শেষমেষ প্রত্যেকেই নিজের উপস্থিতি আর চারপাশের উপর এত বেশি সচেতন হয়ে ওঠা শুরু করে যে এমন কিছু না কিছু দেখছেই, কোনো না কোনো এক সময়ে, কারণ তাদের অবচেতন মন এসবই খুঁজে ফেরে।
.
খুব দ্রুত এ বিশ্বটাকে এফোড় ওফোড় করে তার পরীক্ষা করা এখনো বাকি। কোনো দেয়াল ওকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারবে না, ওর সচেতনতার বাইরে কোনো পথ লুকিয়ে থাকতে পারে না। প্রথম প্রথম বিশ্বাস করে আগের জনের না দেখা জায়গাগুলোই শুধু দেখে চলেছে। পরে বুঝতে খুব বেশি দেরি হয়নি যে, সামরিক অভিযানের মতো গ্রহটার চারপাশে ছুঁড়ে বেড়ানোর পেছনে আছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য।
কোন না কোনো অবাক করা উপায়ে সে ব্যবহৃত হচ্ছে একটা প্রোবের মতো, একটা সর্বদ্রষ্টা রাডারের মতো-যা একবার করে দেখে নিচ্ছে মানব জাতির প্রত্যেক পল-অনুপল, অণু-পরমাণু, অলিগলিকে। নিয়ন্ত্রণ এত বেশি হালকা যে সে খুব কম সময়ই এ নিয়ে সচেতন হওয়ার সুযোগ পায়। ও একটা শিকারী কুকুরের মতো যেটাকে গলায় শিকল পরিয়ে দিয়ে নিজের মতো চলতে ফিরতে দেয়া হচ্ছে; যদি নিজের প্রভুর ইচ্ছাকেই নিজের ইচ্ছা হিসেবে ধরে নিয়ে থাকে।
পিরামিড, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, এভারেস্ট চূড়ার চাঁদ থোয়া তুষার-এগুলো তার নিজের পছন্দ। একই ভাবে কিছু আর্ট গ্যালারি আর কয়েকটা কনসার্ট হল রুম। যদিও তার নিজের পদক্ষেপ নিজেই নিতে পারে তবু একবারের জন্যও সম্পূর্ণ পৃথিবীবৃত্তটার মাঝ দিয়ে যাওয়ার কথা ভাবেনি।
হয়ত নিজে থেকে ও দেখত না এত এত ফ্যাক্টরি, জেলখানা, হাসপাতাল, এশিয়ার একটা নোংরা ছোট যুদ্ধ, রেসকোর্স মাঠ, বেভারলি হিলের একটা যৌনতার বিশাল-জটিল পার্টি, হোয়াইট হাউসের বিখ্যাত ওভাল রুম-৪৩, ক্রেমলিনের১৪৪ আর্কাইভ, পোপের দেশ ভ্যাটিকানের সুবিশাল আর পুরনো লাইব্রেরি, মক্কার কাবার সেই গোপন, রহস্যময় কালো পাথর…
এমনো কিছু কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যা নিজেই বুঝে উঠতে পারেনি ঠিকমতো। যেমন তাদেরকে সরিয়ে দিয়েছে-অথবা ওকেই রক্ষা করেছে কোনো অভিভাবক অ্যাঞ্জেল দল। উদাহরণ হিসেবে বুঝতে পারে
ওলদুভি জর্জের লিকি স্মৃতি জাদুঘরে কী করছিল সে? মানব জাতির উদ্ভব সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই যেমনটা হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির আর কোনো বুদ্ধিমান সদস্যের থাকতে পারে। আর ওর কাছে ফসিলের কোনো অর্থতো নেইই, দামও নেই। ডিসপ্লে কেসে রত্নখচিত মুকুটের মতো সাজিয়ে রাখা দামি পুরনো খুলিগুলো তার স্মৃতিতে অদ্ভুতুড়ে শব্দের জন্ম দিয়েছে শুধু। জন্ম দিয়েছে এমন এক বিমোহিত অবস্থার যার কারণে নড়তেও পারেনি। এক অসাধারণ দ্যিজে ভু দেখা দিয়েছে ওর মনে। এত শক্তিময় দ্যিজে ভু এর আগে কখনো হয়নি; জায়গাটা যেন খুব আপন, কিন্তু কোথায় যেন একটু খটকা…অনেকটা মনে হচ্ছে যেন বহু বছর পরে বাড়ি ফিরে এসেছে কেউ, দেখতে পাচ্ছে সব আসবাবের পরিবর্তন, দেয়ালগুলো নেই আগের জায়গায়, এমনকি সিঁড়ির পথও নতুন করে তৈরি।
এ জায়গাটা গরম, শুকনো বিরূপ একটা ভূখণ্ড যেন। ঐ জমকালো বিশাল সমতল এলাকা আর অসীম তৃণভোজী প্রাণী কোথায় যেগুলো এখানে চড়ে বেড়াত বহুদিন আগে…ত্রিশ লাখ বছর আগে?
এখন আর মানুষ নয় সে, হলে হয়ত কেঁপে উঠত শিহরণে…ত্রিশ লাখ বছর! সে কীভাবে জানল ত্রিশ লাখ বছর আগের কথা? কেন সেই টাইকো মনোলিথেরই ত্রিশ লাখ বছর?
যেদিকে ও প্রশ্নটা ছুঁড়ে মেরেছে সেই প্রতিধ্বনিত হতে থাকা নিরবতা থেকে কোনো জবাবই আসে না। আর আবারো তার চোখের সামনে নিভু নিভু হয়ে ভেসে উঠতে দেখল সেই পরিচিত, কালো একটা রূপ, আয়তাকার পাথুরে দেহ। আরো চেষ্টা করায় এর ভিতর থেকে এক ছায়াময় ছবি দেখতে পাচ্ছে, যেমন দেখা যাবে কালো কালির পুকুরে।
