ডেভের ঠোঁটগুলো নড়লেও সে কোনো কথা শুনছে না। এরপর চেহারা মিশে গেল রঙের চৌকোণা বাক্সের মতো। একবার ফিরে এসে আবারও মিলিয়ে যাচ্ছে। এবার আরো স্থির, কিন্তু কোনো শব্দ নেই।
ছবিগুলো তারা কোত্থেকে পেল? আরে, ডেভকে পূর্ণ মানুষের মতো লাগছে না, বরং যেন সেই ছেলেবেলার প্রথম দেখা ডেভ! ও স্ক্রিনের বাইরে বেরিয়ে এসে যেন বহু বছরের সাগর পাড় থেকে ওকে খুঁজে ফিরছে।
ডেভ বোম্যান হাসল, ওর ঠোঁট নড়ছে…
হ্যালো, বিটি! বলছে ও।
শব্দগুলোকে নিজের মতো সাজিয়ে নিয়ে অডিও সার্কিটে বইতে থাকা বিদ্যুৎ তরঙ্গ পাল্টে দেয়াটা কোনো কাজই না ওর জন্য। মূল সমস্যা হল, মানুষের ব্রেনের মতো ধীর লয়ে নিজের দ্ভিাকে প্রবাহিত করা। আরো সমস্যা হচ্ছে, একটা অসীম সময় ধরে উত্তরের আশায় বসে থাকা…
বিটি ফার্নান্দেজ একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গেছে। তবু, সে যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। এক যুগ ধরে গৃহিণী হলেও নিজের ইলেক্ট্রিক সার্ভিসম্যানের পুরনো পদবীটা ভুলতে পারেনি। মিডিয়ামের গ্রাফিক্সের অসাধারণ এবং অচিন্তনীয় সাফল্যের একটা নিশ্চই এ ঘটনা। এ ব্যাখ্যা সে গ্রহণ করলেও পরের ব্যাপারের সাথে কিছুতেই খাপ খাওয়াতে পারবে না। ডেভ, ও জবাব দিল, ডেভ আসলেই তুমি?
আমি শিওর না। জবাব দিল টিভি স্ক্রিনের ইমেজ, একটা মৃত কণ্ঠে, কিন্তু আমি ডেভ বোম্যান আর তার সব কথা মনে করতে পারি।
ও কি মারা গেছে?
আরো একটা কঠিনতম প্রশ্ন, তার দেহ-হ্যাঁ। কিন্তু শারীরিক ব্যাপারটার কোনো মূল্যই আর নেই। ডেভ বোম্যানের যা ছিল তার সবই এখন আমার অংশ।
বিটি নিজের দেহে ক্রুশ কাটল, কাজটা হোসের কাছ থেকে শিখেছে। ফিসফিসিয়ে বলল, তুমি বলতে চাও যে, তুমি একটা স্পিরিট…আত্মা?
আমি তোমার মতো কোনো শব্দ জানি না যা দিয়ে এরচে ভালভাবে বোঝাতে পারব।
কেন তুমি ফিরে এলে?
আহ! বিটি-কেন! আসলেই কেন…যদি আমাকে বলতে পারতে…এখন তার একটা জবাব জানা আছে টিভি স্ক্রিনে তুলে ধরা যায়। শরীর আর মনের ছাড়াছাড়ি পূর্ণ হতে তোমাদের যুগ থেকে আরো অনেক অনেক সামনে এগুতে হবে। এবার দেখানো নির্লজ্জ সেক্সয়াল ইমেজ আর বহন করার ক্ষমতা নেই যেন এ টিভির ক্যাবল নেটওয়ার্কের।
এক মুহূর্তের জন্য বিটি দেখল, কখনো হেসে হেসে, কখনো আঘাত পেয়ে। এরপর ও অন্যদিকে ঘুরে গেল-লজ্জায় না, বরং কষ্টে। হারিয়ে যাওয়া আনন্দের জন্য কষ্ট।
তো, এটা সত্যি হতে পারে না- ও বলছে, এ কথাই সবাই আমাদেরকে বলেছে, অ্যাঞ্জেল সম্পর্কে। কোনো যৌন প্রভেদ নেই। পুরুষত্ব নেই, নেই নারীত্ব।
আমি একজন অ্যাঞ্জেল? ও অবাক হল। তবু অন্তত এটুকু বুঝতে পারছে এখানে ওর কাজ কী। দুঃখের জোয়ারে ভেসে গিয়ে অতীতের সাথে কোনো না কোনোভাবে একটা সেতু জুড়ে দিতে চাইছে নক্ষত্র শিশু। ওর সবচে শক্তিমান আবেগ ধরা দিয়েছে বিটির জন্যই; এ আবেগটুকু তার অপরাধবোধ আর হতাশাকে বাড়িয়ে তুলছে আরো।
ও ববির চেয়ে ভাল প্রেমিক কিনা তা একবারের জন্যও মেয়েটা বলেনি। এ একটা প্রশ্ন করেনি কখনো। হয়ত এজন্য সম্পর্কটাই ভেঙে যেত। এ মিথ্যা বিশ্বাস নিয়েই ওরা একে অন্যের হাত জাপ্টে ধরে একই ধরনের অসুস্থতার ওষুধ খুঁজত। (আর ও কী তরুণই না ছিল, যখন শুরু হয় তখন মাত্র সতেরো বছর বয়স। শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মাত্র দু বছর পরই!)
স্বভাবতই এ সম্পর্কটা বেশিদিন টেকেনি। কিন্তু এ অভিজ্ঞতা তাকে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মুখে এনে দাঁড় করায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তার সব কিশোরসুলভ অতি কল্পনার কেন্দ্র ছিল বিটি। আর কোনোদিনই ওর সাথে তুলনা করার মতো কোনো মেয়ে খুঁজে পায়নি সে; বহুদিন আগেই বুঝতে পেরেছে যে কোনোদিন পাবেও না। যত অবহেলাই করা হোক না কেন, কৈশোরের প্রেম সারা জীবনের জন্যই মনের কোণে ঘাপটি মেরে থাকে। বারেবারে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে। আর কেউ হয়ত এমন ভালবাসার ভূতের তাড়া খেয়ে ফেরে না।
কামনার ইমেজগুলো স্ক্রিন থেকে মিলিয়ে গেলে এক সেকেন্ডের জন্য মূল অনুষ্ঠান ফিরে আসার সুযোগ পেল। লিওনভ আর আইওর একটা চিত্র টিভিতে। তারপর আবার ডেভ বোম্যানের চেহারা। ওকে দেখে মনে হয় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বসছে। কখনো দশ বছরের ছবি-কখনো বিশ, তারপর ত্রিশ-তারপর অবিশ্বাস্যভাবে এককালে চেনা চেহারার কোনো এক বিকৃত রূপ, হয়ত মমিই, হয়ত শুকনো এক বৃদ্ধ শরীর…
যাওয়ার আগে আর একটা প্রশ্ন। কার্লোসের ব্যাপারে। তুমি সবসময় বলেছ ও হোসের সন্তান, আর আমি প্রতিবারই আশ্চর্য হয়েছি। সত্যিটা বল।
বিটি ফার্নান্দেজ শেষ বারের মতো একটা দীর্ঘ দৃষ্টি ফেলল এক সময় ভালবাসা চেহারার দিকে (ও আবার আঠারোয় ফিরে এসেছে হঠাৎ। আর এক মুহূর্তের জন্য হলেও বিটি চাইছে যেন ওর চিরচেনা শরীরটা দেখা যায়, শুধু চেহারা নয়।)
ও তোমার সন্তান, ডেভ। সে ফিসফিস করে ওঠে।
হারিয়ে গেছে ইমেজটা। আবার ফিরে এসেছে সেই স্বাভাবিক সম্প্রচার। প্রায় একঘণ্টা পরে হোসে ফার্নান্দেজ ফিরে আসার পরও বিটি স্থির বসে রইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। গলার পেছনে চুমুর স্পর্শ পেয়েও ও পেছন ফিরল না, তুমি কোনোদিন বিশ্বাস করবে না, হোসে…।
আমাকে বিশ্বাস করার চেষ্টা কর; তোমাকেই বিশ্বাস করি আমি।
