পাশাপাশি দুটো কালো চক্র। যদিও কোনোদিন ওগুলো নড়েনি-তবু চোখ ছাড়া আর কী হতে পারে? ঘাপটি মেরে থাকাটার ব্যাপারটাই প্রত্যেক সাঁতারে আরেকটু চমক এনে দেয়। একদিন হয়ত দৈত্যটা তার জান্তব বিশ্রাম থেকে জেগে উঠবে, ভয় পাইয়ে দেবে আশপাশের সব মাছকে, শিকার করবে ওদের। কোনোদিনই ডেভিড অথবা ববি জানতে পারবে না যে, ওটা এক পরিত্যক্ত, চুরি যাওয়া বাই সাইকেল যা একশো মিটার গভীরে পানির আগাছার ভিতরে আধা কবর দেয়া অবস্থায় আছে।
এত গভীরতা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, কিন্তু লাইন আর সিংকার এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে। বড় ভাই আর দক্ষ ডাইভার ববি দশ ভাগের এক ভাগ গিয়ে জানালো যে তলাটা আগের মতোই দূরে দেখায়।
কিন্তু এখন হয়ত এ স্বচ্ছ ঝর্না তার সমস্ত রহস্য খুলে দেবে। হয়ত গুপ্তধনের সেসব কিংবদন্তিই সত্যি। সব স্থানীয় ইতিহাসবিদের নাক সিঁটকানো বন্ধ করে দেবে তাল তাল সম্পদ। যাই হোক না কেন, অন্ততপক্ষে ওরা স্থানীয় পুলিশ চিফকে খুশি করতে পারবে-সব সময়ই এ এক দারুণ পথ-কিছু যদি নাও পায় তো কোনো না কোনো অপরাধের পর ফেলে দেয়া কিছু পুরনো হ্যান্ডগান থাকবেই সেখানে।
ববির গ্যারেজের আবর্জনার স্তূপে পাওয়া ছোট এয়ার কম্প্রেসারটা শুরুর দিকের সমস্যা শেষ করে এখন শব্দ করছে জোরে জোরে। কয়েক সেকেন্ড পর পরই কেশে কেশে একটু নীল ধোয়ার মেঘ ছড়াবে। তবু ভাল, থামার কোনো লক্ষণ দেখায়নি।
আর যদি এটা বন্ধও হয়, বলল ববি, তাতে কী? যদি আন্ডার ওয়াটার থিয়েটারের মেয়েরা কোনো এয়ার হোস ছাড়াই পঞ্চাশ মিটার সাঁতরে উঠতে পারে তাহলে আমরাও পারব। আমরা পুরোপুরি নিরাপদ।
তাই যদি হয়, ভাসতে ভাসতে ভাবল ডেভ, কেন আমরা মাকে বলিনি কী। করতে যাচ্ছি? এজন্যেই বাবার পরবর্তী শাটল ওড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম না? কিন্তু ওর আসলেই কোনো আফসোস নেই; ববি ভাল বোঝে। সতেরো বছরের হওয়াটা সব সময়ই চমৎকার, আরো দারুণ হয় যদি এ বয়েসেই সব জানা যায়। তারা আশা করে সে এখন খুব বেশি সময় নষ্ট করবে না বোকা মেয়ে বিটি সুলৎজের সাথে। সত্যি, খুব সুন্দর-কিন্তু…ধ্যাৎ! ও একটা ছোট্ট মেয়ে। আজকের সকালে ওর হাত থেকে ছাড়া পাওয়াটাই ওদের সবচে বড় মুসিবত হয়েছিল।
ডেভ ব্যবহৃত হয়েছে গিনিপিগ হিসেবে। কিন্তু তা শুধু ভাইয়ের জন্য। প্রথমে ফেস মাস্কটা ঠিক করে নিয়ে ফ্লিপারগুলো পরেই ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্ফটিক স্বচ্ছ পানিতে। ববি নিজেকে এয়ার হোসের সাথে ধরে রাখে। এটাকে মাউথ পিসের সাথে জুড়ে দিয়েছিল আগেই। একটা দম নিয়েই ডেভ মুখ বিকৃত করল, এর স্বাদ ভয়াবহ!
এটাকে ব্যবহার করতে শুরু কর। ভিতরে গেলে-ঐ লিজের৩৮ দিকে পৌঁছুলেই আমি প্রেসার ভাল্বটা এডজাস্ট করা শুরু করব যাতে বেশি বাতাস নষ্ট না করতে হয়। হোসটা টানলেই উঠে এসো।
পানির নিচে ডেভ ধীরে নড়তে শুরু করল, অথবা ওয়ান্ডারল্যান্ডে। শান্তিতে ভরা একরঙা এক জগৎ। আর সব প্রবাল প্রাচীরের চেয়ে ভিন্ন। সামুদ্রিক পরিবেশের রঙচঙা কোনো চিত্র নেই। এখানে জীবন নিজেকে প্রকাশিত করে না রঙধনুর সবগুলো রঙে। এখানে শুধু সবুজ আর নীল ছায়ার অভিজাত প্রদর্শনী আর চারদিকের মাছগুলো মাছেরই মতন, প্রজাপতি নয়।
ও ফ্লিপার নাড়িয়ে নাড়িয়ে আস্তে নেমে যাচ্ছে। পেছনে টেনে নিচ্ছে হোসটা আর থামছে শুধু প্রয়োজন পড়লে, হোস থেকে বাষ্প টেনে নিতে। স্বাধীনতার রোমাঞ্চ এত বেশি যে তার মুখের তেলতেলে স্বাদটাও গেছে ভুলে। ও যখন লিজের কাছে পৌঁছল তখনি বুঝতে পারে আসলে পুরনো পানিতে ঘেরা এক গাছের গোড়া এটা; সামুদ্রিক আগাছা এত বেশি ঘিরে ধরেছে যে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। ও বসে পড়ে নিজের চারদিক দেখতে লাগল। প্রথমবার দেখার, সবার আগে দেখার একটা আলাদা আনন্দ আছে।
ও ঝর্নাটার ঠিক ওপাশ দেখতে পাচ্ছে। সবুজ, অসম প্রান্ত, ভেসে যেতে থাকা জ্বালামুখের দূরপ্রান্ত ও দেখছে, কমসে কম একশো মিটার হবে দূরত্বে। চারদিকে বেশি মাছ নেই, তবু পানির উপর থেকে নিচে পড়তে থাকা একতাল রূপালী পয়সার মতো এক দঙ্গল ছোট মাছ সূর্যের আলোতে ঝলসে ঝলসে একদিক থেকে আরেকদিকে চলে গেল।
আরেক পুরনো বন্ধুও বসে আছে, যেমন থাকে আরকী, ঝর্নাটার সাগরের দিকে যাত্রার মুখে। একটা ছোট অ্যালিগেটর (কিন্তু যথেষ্ট বড় পরে একবার আনন্দ নিয়ে ববি বলেছিল, ও অন্তত আমার চেয়ে বেশ বড়।) সমান্তরালে ঝুলে আছে, কোনো দৃশ্যমান কিছুর উপর ভর না করেই। শুধু নাকটা ভেসে আছে উপরিতলে। কোনোক্রমেই এটাকে চটানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করল না। আর এই লক্ষ্মী জীবটাও ওদের এক বিন্দু বিরক্ত করেনি।
হঠাৎ করেই এয়ার হোসে টান পড়ে। ডেভ যেতে একটুও আপত্তি করবে না। ও বুঝতে পারছে না এ সময়ের মধ্যে অ্যালিগেটরটা কতটুকু ঠাণ্ডা হয়েছে অতি গভীরতায় নেমে-এমনকি নিজেও অসুস্থ বোধ করছে এখন। কিন্তু উঠে এলে গরম সূর্যালোক ওকে দ্রুত নতুন জীবন দিল।
নো প্রব্লেম। দাম দেখিয়ে ববি বলে, ভাটার প্রু খুলতে থাক সাবধানে যেন প্রেসারের মাপটা লাল দাগের নিচে নেমে না যায়।
কতটুকু নিচে নামবে?
পুরোটাই, যদি এখনকার মতো অনুভব করি।
ডেভ সিরিয়াসলি নেয়নি। ওরা গভীরতার আনন্দ আর নাইট্রোজেনের ক্ষরণ দু ব্যাপারেই সজাগ। আর পুরোনো বাগানের পানির পাইপটা মাত্র ত্রিশ মিটার লম্বা। প্রথম অভিজ্ঞতার জন্য অবশ্য এই অনেক। আগে বহুবার করেছে বড় ভাই। তাই একটা হিংসা মেশানো শ্রদ্ধার সাথে ভাইয়ের এই নতুন চ্যালেঞ্জ নেয়াটাকে দেখছে। সে। চারদিকের মাছের মতোই সচ্ছন্দে ববি নিচের রহস্যময় নীল জগতের দিকে গ্লাইডিং করে নেমে যায়। একবার ঘুরে কষ্টেসৃষ্টে এয়ারহোেসটায় এক টোকা দিয়ে পুরোপুরি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল যে, একটু বেশি বায়ু প্রবাহ ওর দরকার।
