ঐ প্রক্রিয়াটা শেষ হতে হতেই শতাব্দীর বাকি দিনগুলো গেল কেটে, এখন এই আবাসিক এলাকায় বিশ হাজার মানুষ থাকে। আর এটাই অপ্রতিরোধ্যভাবে পরিণত ও জনপ্রিয় হয়েছে মহান কার্টুনিস্টের নামে, এপকট ডিজনিভিল। ডিজনির গ্রাম।
এখানকার অধিবাসীরা ডব্লিউ ই ডি আইনবিদদের কড়া পাহারা বসানো এক প্রাসাদের ভিতর দিয়েই শুধু বেরুতে পারে। এ এলাকার মানুষের গড় আয়ু যে যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো শহরের মানুষের চেয়ে বেশি তার কারণ এও হতে পারে, আবার সারা পৃথিবীর সেরা মেডিক্যাল সার্ভিসের জন্যও হতে পারে। আর এ এলাকার মানুষজনের মধ্যে খুব কমই গর্ভধারণ করতে পারে, আরো কম মহিলা পারে জন্ম দিতে। তাই জনসংখ্যা কোনো চাপ নয়।
.
অ্যাপার্টমেন্টটাকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে কোনোমতেই হাসপাতালের কোনো স্যুটের মতো না দেখায়। হয়ত মাত্র কয়েকটা অস্বাভাবিক ফিটিং এ রুমের আসল উদ্দেশ্যটাকে বের করে ফেলে। বিছানাগুলো হাঁটুরও নিচে, যাতে রোগী পড়ে গেলেও বেশি ক্ষতি না হয়। এসব দুর্ঘটনা ঘটতে পারে আর ঘটলে তা নার্সদের জন্য কাজের সুযোগ। গোসলখানার টাবও একই পদ্ধতির। ফ্লোরে ডুবে থাকে। এর ভিতরেই সিট বসানো, চারধারে থাকে রেলিং। এসবের জন্য অতিবৃদ্ধ অসুস্থ মানুষও উঠে আসতে পারে সহজে। আর ফ্লোরে পুরু করে কার্পেট বিছানো। কিন্তু কোনো ছোট কার্পেট অথবা র্যাগ নেই যেটার উপর দিয়ে কেউ যেতে পারবে। এমনকি ইনজুরিতে ফেলার জন্য কার্পেটের কোনো তীক্ষ্ণ কোণা বেরিয়ে থাকে না। অন্যান্য বিষয় এত সহজে বোঝা যায় না। টিভি ক্যামেরাগুলো এমনভাবে বসানো যে কেউ এর অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহও করবে না।
ওটার ভিতরে মাত্র কয়েকটা ব্যক্তিগত চিহ্ন আছে-এক কোণায় পুরনো বইয়ের একটা তৃপ, নিউ ইয়র্ক টাইমসের শেষ কয়েকটা প্রিন্ট কপির একটার প্রথম পাতা ফ্রেমে বাঁধানো যেটা ঘোষণা করছে: ইউ এস স্পেসশিপ রওনা দিচ্ছে বৃহস্পতির দিকে লেখার কাছাকাছিই দুটো ছবি, প্রথমটায় এক ছেলে-বয়েস টিন এজের শেষের দিকে; অন্যজন বোঝাই যায় বেশি বয়স। পরনে একটা মহাকাশচারী-ইউনিফর্ম।
দুর্বল, ধূসর চুলওয়ালা মহিলা টিভি প্যানেলে একটা হাসির প্রোগ্রাম দেখছে। বয়েস সত্ত্বর না হলেও আরো বেশি দেখায়। বারবার স্ক্রিনে দেখানো কৌতুকগুলোর প্রতি প্রশ্রয়ের হালকা হাসি দিচ্ছে, একটা চোখ প্রায়ই নেচে যায় দরজার দিকে, হয়ত কোনো ভিজিটরের আশায়। প্রতিবার এমন করার সময় শক্ত হাতে চেয়ারের পাশে উঠিয়ে রাখা ওয়াকিং স্টিক ধরে ফেলে।
এখনো ডুবে আছে একটা টিভি নাটকে। অবশেষে দরজাটা খুলে গেলে একটু অপরাধী চোখ করে দরজার দিকে তাকায়। ছোট সার্ভিস ট্রলি ঘরে ঢুকল, এর পরপরই একজন পোশাকধারী নার্স, খাবার সময় হয়েছে, জেসি। বলল নার্স, আজকে তোমার জন্য এনেছি এক দারুণ জিনিস।
কোনো লাঞ্চ চাই না।
এটা খেলে তোমার আরো অনেক বেশি ভাল্লাগবে।
কী আছে বলার আগে আমি খাচ্ছি না।
কেন খাবে না?
একটুও খিদে নেই। তুমি কি সারা জীবনই ক্ষুধায় থাক? তীক্ষ্ণভাবে যুক্ত হয় কথাটা।
খাবার ট্রলিটা রোবট। থামল চেয়ারের পাশে। ট্রান্সপোর্ট কভারগুলো খুলে গিয়ে বের করল সবটুকু খাবার। নার্স কখনোই কিছু স্পর্শ করে না-এমনকি ট্রলির কন্ট্রোল বারও না। ও এখন স্থির দাঁড়িয়ে, মুখে একটা সর্বকালীন হাসি আর দৃষ্টি তার জটিল রোগীর দিকে।
পঞ্চাশ মিটার দূরের মেডিক্যাল মনিটর রুমের মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান ডাক্তারকে বলল, দেখ, ব্যাপারটা দেখ।
জেসির প্যাচানো হাত দ্রুত ওয়াকিং স্টিকের সাথে খাপে খাপে মিলে গিয়েই দারুণ দ্রুততার সাথে জিনিসটা ছুঁড়ে দিল নার্সের পায়ের দিকে।
নার্স বুঝতেই পারেনি কী হচ্ছে-এমনকি ওর উপর স্টিকটা চলে আসার পরও। এর পরও সত্য বলার সুরে নার্স বলল, এখন? এমন কাজ ভাল দেখায়, না? খেয়ে ফেল, ডিয়ার।
একটা কুটিল হাসি ছড়িয়ে গেল জেসির মুখে, তবু আদেশ মানতে দ্বিধা করে। এক মুহূর্তের মধ্যেই খেতে লাগল ক্ষুধাতের মতো।
দেখলে? বলল টেকনিশিয়ান, ভালমতোই জানে কী হচ্ছে। দেখে যা মনে হয় তারচে অনেক বেশি মেধাবী। প্রায়ই এমন সব কাণ্ড দেখি।
ও-ই প্রথম বুঝল?
হু। আর সবাই বিশ্বাস করে সত্যি সত্যি নার্স উইলিয়ামস তাদের খাবার দিয়ে যায়।
যাই হোক, আমার মনে হয় না এতে কিছু এসে যায়। দেখ সে কী সম্ভষ্ট। একটা কারণেই-টেক্কা মেরেছে আমাদের উপর। ও খাবার খাচ্ছে এক্সারসাইজের উদ্দেশ্যে। কিন্তু আমাদেরকে অবশ্যই সব নার্সকে জানাতে হবে, শুধু উইলিয়ামসকে না।
কেন…ও অবশ্যই! পরের বার একটা হলোগ্রামকে নাও পাঠাতে পারি। তখন বোধ হয় আমাদের রেগে যাওয়া স্টাফদের পক্ষ থেকে কোনো আইনি জটিলতায় পড়তে হবে।
৩২. স্বচ্ছ ঝর্না
লুসিয়ানা থেকে এখানে আসা ইন্ডিয়ান আর ক্যাজুয়ানেরা বলে স্বচ্ছ ঝর্ণা Tএকেবারে অতল। অবশ্যই একেবারে বোকার মতো কথা-তারাও বোধহয় বিশ্বাস করেনি কথাটা। একজনের শুধু একটা মাস্ক পরে কয়েক স্ট্রোক সাঁতরে আসতে হয়–আর ওখানেই পরিষ্কার দেখা যায় ছোট এক গুহা যেটা থেকে অবিশ্বাস্য খাঁটি পানি বের হয়; চারধারের দুলতে থাকা চিকন চিকন সবুজ এবং অপ্রত্যাশিত গাছগুলোকে আরো একটু নাড়িয়ে দিয়ে যায়। আর এগুলোর ভিতর দিয়ে দানোর চোখগুলো উঁকি দেয় মাঝে মধ্যে।
