সে নড়াচড়া করে, কিন্তু কীভাবে তা জানে না। আসলে যখন একটা শরীর ছিল তখন কি ও জানত কীভাবে নড়াচড়া করে? ব্রেন থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে যে অদৃশ্য চেইন অফ কমান্ড কাজ করে সেটা নিয়ে কোনোকালে উচ্চবাচ্য করল নাতো!
ও চাইলেই ধারেকাছে থাকা নক্ষত্রের বর্ণালী নীলচে হয়ে যায়; ঠিক যতটুকু চায় ততটুকু। আলোর গতির চেয়েও অনেক কমে ও যাচ্ছে, যদিও চাইলে এ গতি আরো বাড়ানো যায়…আরো…আরো; তবু কোনো তাড়া নেই। আরো অনেক অনেক তথ্য প্রসেস করতে হবে, অনেক পড়ে আছে বিবেচনায় আসার পথে…আর জয় করতেও অনেক বাকি। সামনে আরো অনেক বড় কাজ বাকি থাকলেও এটাই প্রাথমিক লক্ষ্য।
পেছনে দ্রুত সরে যেতে থাকা জগতের দুয়ার অথবা সামনের প্রাথমিক সভ্যতার দু স্পেসশিপ-কোনো দিকেই ওর নজর যায়নি। এগুলো ওর স্মৃতির অংশ, কিন্তু ডেকে ফিরছে অন্য কিছু, এমন এক জগৎ ডাকছে যেটাকে দ্বিতীয়বার দেখার আশাও করেনি।
নক্ষত্রশিশু শুনতে পায় ঐ জগতের একেবারে অসীম কণ্ঠস্বরের প্রতিটাকে, আস্তে আস্তে যেগুলোর শব্দ বাড়ছে। এখনো এগিয়ে আসছে চিকণ চাঁদের রূপ নিয়ে সূর্যের দুর্দান্ত করোনার পেছন থেকে সেই পুরনো বিশ্ব। এরপর নীলচে সাদাটে চাকতি হয়ে বেরিয়ে এল পৃথিবী।
ওর আসার খবর জানতে পেরেছে সবাই। নিচের লোকারণ্যের প্রতিটা রাডারের অ্যালার্ম হয়ত বাজছে, আকাশগুলো হয়ত ছত্রখান হয়ে পড়েছে বিশাল বিশাল টেলিস্কোপের কারণে-আর হয়তো, হয়ত মানুষ যে ইতিহাস জানত, বিশ্বাস করত সে নাটকের যবনিকা পড়বে এবার।
হাজার কিলোমিটার নিচে অর্বিটে অর্বিটে ঘুরতে থাকা মরা কার্গোগুলো হঠাৎ যেন সচেতন হয়ে গেল। এগিয়ে আসছে একটা গোলা। এ কার্গোর দুর্বল শক্তির কোনো দামই নেই ওর কাছে, নয়তো কাজে লাগাতে পারত।
সার্কিটের গোলক ধাঁধায় ঢুকে ও দ্রুত এটার মরণ কেন্দ্র খুঁজে বের করে। বেশিরভাগ শাখাপ্রশাখাই বাদ দেয়া যায়, এগুলো শুধু নিরাপত্তার জন্য বানানো অন্ধপথ। ওর পর্যবেক্ষণের নিচে ওদের সব উদ্দেশ্যই একেবারে ছেলেখেলার মতো লাগে, যে কোনো পরিস্থিতিতে সে ওদের প্রত্যেকের ভিতর দিয়েই চলে যেতে পারে।
এখন সামনে শুধু একটা ছোট বাঁধা-এক অপরিণত কিন্তু প্রভাবশালী যান্ত্রিক সমন্বয় যা দুটো ভিন্ন যোগাযোগকে ধরে রেখেছে। আসল অধ্যায়টা শুরু করার জন্য এদের কাছাকাছি আসতে হবে। ইচ্ছা শক্তিকে সামনে ঠেলে দিয়ে প্রথম বারের মতো ব্যর্থ হতে দেখল তারকা সন্তান। কয়েক গ্রাম ওজনের মাইক্রো সুইচ নড়ছে না। ও এখনো আঁটি এনার্জির একটা সৃষ্টি; এ কারণেই বস্তুগত পৃথিবীর পুরোটা আওতার বাইরে। একটা সুইচও চাপতে পারবে না। তবু এর এক সহজ উত্ত আছে।
আরো অনেক জানতে হবে ওকে। সামান্য মনে করে এত বেশি শক্তি বইয়ে দিয়েছে এ যান্ত্রিক রিলের দিকে যে কয়েল গলে গেল ট্রিগার অংশটাকে অপারেট করার আগেই। মাইক্রো সেকেন্ডগুলি পালিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। বিস্ফোরক লেন্সগুলোর তাক করা দিক দেখতে মজাই লাগে। যেন কোনো নিভুনিভু ছোট্ট ম্যাচের কাঠি এক বিন্দু আগুন দিচ্ছে এক বিরাট বিস্ফোরক ভর্তি ট্রেনের গায়ে, ফলাফল…
একটা নীরব বিস্ফোরণ কয়েক মেগাটন বিস্ফোরক ছড়িয়ে দিয়ে ঘুমন্ত জগত্তার অর্ধেক ভরিয়ে দিয়েছে কৃত্রিম সূর্যাস্তের আলোয়। যেন আগুনের শিখাগুলোর ভিতর থেকে কোনো ফিনিক্স পাখি উঠে এসে যতটুকু দরকার অগ্নি-জীবন শুষে নিয়ে বাকিটা উগরে দিল। অনেক নিচের অ্যাটমোস্ফিয়ার-আবরণ অধিকাংশ রেডিয়েশন শুষে নিল। অ্যাটমোস্ফিয়ারটা সব সময়ই নীলচে সবুজ গ্রহকে উটকো ঝামেলা থেকে বাঁচায়। কিন্তু এ বিস্ফোরণের পর কিছু অভাগা মানুষ আর পশুপাখি থাকার কথা যারা আর কখনো কিছু দেখতে পাবে না।
মনে হচ্ছে ঘটনা দেখে পৃথিবী আঘাতে বোবা হয়ে গেছে। শর্ট আর মিডিয়াম ওয়েভের কথাবার্তাগুলো থেমে গেছে পুরোপুরি, হঠাৎ শক্তিমান হওয়া আয়োনোস্ফিয়ারই ওদের ফিরিয়ে দিয়েছে মাটিতে ৩৬। এখন শুধু মাইক্রোওয়েভগুলোই পৃথিবীকে ঘিরে থাকা কাঁচের স্তরটার গায়ে এসে পড়তে পারছে। এগুলোর বেশিরভাগই খুব সতর্কভাবে এ স্তরের জন্য পাঠানো, এবং বিচ্ছিন্ন হতে থাকা স্তরটা ধরতে পারল ঠিকই। এখনো মাত্র কয়েকটা শক্তিময় রাডার ওর দিকে তাক করা। এর কোনো গুরুত্বই নেই। এমনকি এগুলোকে সহজেই নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা থাকলেও সে তা করার কোনো চেষ্টাই করল না। যদি আরো বোমা এগিয়ে আসে, তাহলে একই নিস্পৃহতা নিয়ে তাকাবে। এখনকার জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় এনার্জিই ওর আছে।
আর এখন নক্ষত্র শিশু নেমে যাচ্ছে। দারুণ সর্পিল পথে নেমে যাচ্ছে। নেমে যাচ্ছে সেই কোনো ছোট্টবেলায় হারানো মানচিত্রের দিকে।
৩১. চাইনা মাগো রাজা হতে
একজন ফিন-ডি-সাইকল দার্শনিক একবার বলেছিলেন, এমনকি বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তাঁর ব্যথার কথা প্রকাশ করেছেন যে, ওয়াল্টার ইলিয়াস ডিজনি ইতিহাসের যে কোনো ধর্মনায়কের চেয়ে অনেক বেশি খাঁটি মানবিক আনন্দ দিতে পেরেছেন মানব জাতিকে। শিল্পীর মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পরেও ফ্লোরিডার মাটি কামড়ে তাঁর স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে।
উনিশো আশির প্রথমদিকে ডিজনিভিলটা শুরু হওয়ার পরে (লেখকের কল্পনা) তাঁর এক্সপেরিমেন্টাল প্রোটোটাইপ কমুনিটি অব টুমরো বা আগামী দিনের পরীক্ষামূলক সমাজের নমুনা এখন নতুন করে আজকের টেকনোলজি এবং সমাজ ব্যবস্থার শোকেস হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এর দর্শকরা বুঝতে পারে যে ই পি সি ও টি-একট এর উদ্দেশ্য তখনই সফল হবে যখন একরের পর একর জমি সত্যিকারার্থেই একটি জীবন্ত, বাস্তব নগর হয়ে উঠবে যাকে মানুষজন বলবে, আমার ঘর।
