ঐ আশাটা কী বোকামি! ও এখন বোঝে; একজনের পক্ষে অন্তত একজন মানুষের পক্ষে বাতাসকে দেখা বা আগুনের আয়তন অথবা ভর বোঝ কোনো কালেই সম্ভব না। তারপর শরীর আর মনের অবসন্নতা গ্রাস করে। তারপর ডেভিড বোম্যান ঘুমাতে যায় শেষ বারের মতো।
এ এক অদ্ভুত ঘুম। ও পুরোপুরি অসচেতন ছিল না। কুয়াশার চাদর দারুণ এক বনকে ঘিরে ছিল যেন। কিছু একটা অথবা কেউ একজন মনকে নিচ্ছিল দখল করে। খুব ক্ষীণভাবে বুঝতে পারে-কোনো আগুন চারধার থেকে ঘিরে ধরেছে। গ্রাস করছে দারুণ যত্নে গড়া শরীরটাকে; নিশ্চিতভাবে, দ্রুত। এর এমন নিরাবেগ ধ্বংসের নিচে থেকেও একবিন্দু ভয় বা আশা কিছুই পায়নি। মাত্র একবার মনে হয়েছিল প্রত্যেক মানুষকেই মরতে হয়। ও হয়ত মারা যাচ্ছে।
সেই লম্বা ঘুমের মাঝেই কিছু কিছু সময় স্বপ্নে মনে হয়েছে ও তখন জেগে। বছরগুলো উড়ে যায়। একবার দেখা গেল একটা আয়নায় দেখছে নিজেকে। এক ভেজা মুখমণ্ডলকে নিজের মুখ হিসেবে আবিষ্কার করল। শরীর হয়ে যাচ্ছে বিশ্লেষিত। জীববৈজ্ঞানিক ঘড়ির কাঁটাগুলো ঘুরছে বনবনিয়ে। ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন একটা রাত্রিতে যা কখনোই পৌঁছতে পারবে না। একেবারে শেষ মুহূর্তে থমকে দাঁড়ালো-আর ঘুরতে শুরু করল বিপরীতে।
সুখের স্মৃতিগুলোর সবই একে একে জমিয়ে রাখা হচ্ছিল। দারুণ নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় ফিরে ফিরে আসছিল অতীত। আস্তে আস্তে তার অতীত এগিয়ে এসে সব জ্ঞান, সব অভিজ্ঞতা ধুয়ে দিল। এগিয়ে এল ছেলেবেলা। কিন্তু কিছুই হারিয়ে যায়নি। জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তের প্রতিটি স্মৃতি আরো শক্ত হয়ে বসে যাচ্ছে মনের ভিতরে। একটা নিরাপদ সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। একজন ডেভিড বোম্যানের অস্তিত্ব ছিনিয়ে নেয়া হলেও আরেকজন হয়ে গেছে চিরঞ্জীব। চলে গেছে বস্তুকেন্দ্রিক সব চাহিদার বাইরে।
সে একজন নতুন দেবতা-যে এ জন্মের জন্য অপ্রস্তুত। প্রস্তুতির ধাপগুলিতে ভাসার সময় সে জানত সে কী ছিল এক সময়, শুধু জানত না একটা ব্যাপার। এখন কী হয়েছে। সে তখনো এক দোলচালে দুলছে-শুককীট আর প্রজাপতির মাঝামাঝি কোথাও। আরো স্পষ্ট করতে গেলে একটা লার্ভা আর শুয়োপোকার মাঝামাঝি…
এক সময় তন্দ্রা ভেঙে গেলে সময় আবার প্রবেশ করল তার ছোট্ট জগতে। সেই কালো চতুষ্কোণ রহস্যময় জিনিসটাই অবশেষে দেখা দেয় বন্ধু হিসেবে।
এটাকে চাঁদের বুকে দেখেছে। মুখোমুখি হয়েছে বৃহস্পতির অর্বিটে। জানত, কোনো না কোনোভাবে ওর পূর্ব পুরুষেরাও এর মুখোমুখি হয়েছিল। আজো এর অপরিমেয় রহস্য লুকিয়ে থাকলেও আর তা পুরোপুরি রহস্যময় নয়। এর কিছু কিছু ক্ষমতা এখন ও বোঝে।
অনুভব করেছে এটা একা নয়, বরং অনেক অনেকের মধ্যে একটা। কিন্তু পরিমাপের যন্ত্রগুলো একটা কথা ঠিকই বলবে, এ রহস্যময় জিনিস সব সময় এক আকৃতির। যতটুকু বড় হওয়া প্রয়োজন-ততটুকু।
কী অবশ্যম্ভাবী এর গাণিতিক অনুপাত! তিন সংখ্যার বর্গ, ১:৪:৯! ভাবনার বিস্ময় ঠেকে গেছে তিন সংখ্যার বর্গতে, প্রথম তিন সংখ্যা-ত্রিমাত্রিকতার প্রতিনিধি। তার মন শুধু তিন মাত্রার রহস্যতেই শেষ হয় কিন্তু এ বিশাল খালি জিনিসটার ভেতর তো আরো বিস্ময়ের, তারায় তারায় ভরা। হোটেল স্যুটটার বাস্তব অস্তিত্ব ছিল না কোনোকালে। এক সময় মিশে যায় স্রষ্টার মনেই। তারপর সামনে ছিল গ্যালাক্সির আঘো আলো ছায়ায় ঘেরা ঘূর্ণি।
গ্যালাক্সিকে মনে হয়েছে কালো প্লাস্টিকের খণ্ডতে বসানো বিশাল, বিবশ করা সুন্দর কোনো মডেল। কিন্তু এই বাস্তব। এ বাস্তবটাকে চোখে দেখে কখনোই বুঝতে পারত না, চোখে না দেখে যেমন এক পলকেই অনুভব করছে, দেখছে। শুধু চেষ্টা করলেই মনোযোগ দিতে পারত এই গ্যালাক্সির দশ হাজার কোটি নক্ষত্রের যে কোনোটায়।
ভাসছিল সূর্য সমুদ্রে। জ্বলন্ত, হিবিজিবি গ্যালাকটিক কোর ১৩২ থেকে শুরু করে অনেক অনেক দূরে ছড়ানো একা, ভীত সব দানব তারা পর্যন্ত বিস্তৃত এ নক্ষত্র মহানদী। ঘুরতে থাকা গ্যালাক্সির সর্পিল, কালচে বিজন ঐ প্রান্তেই ওর উৎপত্তি। আকৃতিহীন ক্যাওস ১৩৩ আজো আছে, মাঝেমধ্যে একটু আলোকিত হয়ে ওঠে অকল্পনীয় দূরে থাকা কোটি তারকার নিভু নিভু আলোয়। ও জানে, এটাই সৃষ্টির মূল পদার্থ। আজো ব্যবহার করা হয়ে ওঠেনি। আজো গঠিত না হওয়া এক দলা বিবর্তন-সন্তান। সময় আসলে কী? এই এখানে, কালো এক অকল্পনীয় বিশাল অংশ অব্যবহৃত, যেখানে আজো সময়ের জন্মই হল না! যেদিন এ শুন্যতা ভরে উঠবে, পাবে নতুন আকার জীবনে জীবনে, সৃষ্টিতে সৃষ্টিতে, আলোতে আলোতে-সেদিক আজকের সব নক্ষত্র থাকবে কোথায়?
খেয়াল না করে একবার একটা ক্যাওস এলাকা পেরিয়েছিল। এবার আরো অনেক প্রস্তুত, যদিও জানতেই পারেনি কোনো অস্তিত্ব ওকে পরিণত করেছে নক্ষত্র সন্তানে। আবারো পেরুতে হবে ওই জায়গাটা…
মনের ফ্রেম থেকে গ্যালাক্সি বিস্ফোরিত হয়ে ছড়িয়ে গেল সরাতে চাওয়ার সাথে সাথে। নক্ষত্র আর নেবুলার ১৩৪ দল উড়ে চলল এক অসীম গতিতে। ভৌতিক সূর্যগুলো ছিন্নভিন্ন করে ও চলে যায় প্রতিটার কোরের ভিতর দিয়ে।
সূর্যগুলো এক সময় ছোট থেকে আরো ছোট হয়ে যায়। সামনে আরেক আলোর ঝলকানি; মিল্কি ওয়ে আসছে, একটা ভৌতিক আলোকে পুঁজি করে-হয়ত কোনোদিন একে ও চিনত, হয়ত চিনে বসবে আবারো। মানুষেরা যে এলাকাটাকে সত্যিবলে, ও সেখানেই ফিরে এসেছে। ঠিক সে জায়গাটায় যেটা ও ছেড়ে এসেছে কয়েক সেকেণ্ড অথবা কয়েক শতাব্দী আগে। ও চারদিক সম্পর্কে সচেতন। এমনকি আগের বহু সেন্সর লাগানো বাহ্যিক দুনিয়া থেকে অনেক বেশি সজাগ। যে কোনোটার দিকে মনোনিবেশ করলেই তা বিশ্লেষণ করতে পারে একেবারে অসীম ভাগ-উপভাগে, যে পর্যন্ত টাইম স্পেসের একেবারে শেষ প্রান্তে মুখোমুখি না হয়, যার পেছনে শুধুই ক্যাওস।
